
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ১৯ কোটি ৩২ লাখ ৫১ হাজার ২৩২। এর মধ্যে সঞ্চয়ী হিসাবের সংখ্যা ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৫টি এবং ঋণ হিসাবের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ৭৬৭টি।
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) দেওয়া বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। তবে বিষয়টি থেকে পিছু হটার সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার। অর্থাৎ চূড়ান্ত বাজেটে টিআইএনের বাধ্যবাধকতা থাকছে না।
বাজেট ঘোষণার পরই বিষয়টির পক্ষে-বিপক্ষে ব্যাপক আলোচনা হয়। কারণ, টিআইএন থাকলে রিটার্ন জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকে। তাই অনেক মানুষকে করযোগ্য আয় না থাকলেও রিটার্ন জমা দিতে হবে। এতে ব্যাংক খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় ‘ইউটার্ন’ নিতে যাচ্ছে সরকার। তবে এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে প্রধানমন্ত্রী চীন থেকে দেশে ফিরে আসার পর। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এমন আভাসই দিয়েছেন।
এনবিআর সূত্র জানায়, বাজেট ঘোষণার পর বেশ কিছু বিষয় সংশোধন করার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সামনে আনা হয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংক হিসাবে টিআইএন থাকার বিষয়টি অন্যতম। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের একজন কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংক খাতের বর্তমান অবস্থা বিবেচনায় কোনো ধরনের ভীতি বা ঝুঁকি তৈরি করতে চাচ্ছে না। তাই টিআইএনের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য তালিকায় রাখা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
এর আগে ঘোষিত বাজেটে এটি অন্যতম একটি বড় সিদ্ধান্ত ছিল। বাজেটের প্রস্তাব অনুসারে, যেকোনো ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন সনদ দেখাতে হবে। তবে এ ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দেওয়া হয়েছিল। যেমন শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব নেওয়ার সময় টিআইএন সনদ দেখাতে হবে না। আবার ‘ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট’, যেমন ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব ও সরকারি ভাতাসুবিধা নেওয়ার জন্য যত হিসাবসহ পেনশনভোগীদের হিসাবের ক্ষেত্রে টিআইএন দেখানোয় অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল।
এখনো সবার টিআইএন খোলার মতো সামাজিক অবস্থা তৈরি হয়নি বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা। তাই এ সিদ্ধান্ত বাতিল করাটাই যথার্থ হবে বলে মনে করেন তাঁরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ‘অনেক মানুষের টিআইএন নেই। এটা খোলাটাও একটি টেকনিক্যাল বিষয়। সমাজ এটার জন্য এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। ঘোষণাটি আসায় মানুষের মনে একটা ভয় তৈরি হয়। এটা করা হলে ব্যাংক হিসাব না খুলে অনেকেই সমবায় বা অন্যদিকে চলে যেতেন।’
তবে ভবিষ্যতে এটার প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন মোহাম্মদ আলী।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে মোট ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা ১৯ কোটি ৩২ লাখ ৫১ হাজার ২৩২। এর মধ্যে সঞ্চয়ী হিসাবের সংখ্যা ১৭ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৪৬৫ এবং ঋণ হিসাবের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ৭৬৭।
অনেক মানুষের টিআইএন নেই। এটা খোলাটাও একটি টেকনিক্যাল বিষয়। সমাজ এটার জন্য এখনো পুরোপুরি প্রস্তুত না। ঘোষণাটি আসায় মানুষের মনে একটা ভয় তৈরি হয়। এটি করা হলে ব্যাংক হিসাব না খুলে অনেকেই সমবায় বা অন্যদিকে চলে যেতেনমোহাম্মদ আলী, এমডি ও সিইও, পূবালী ব্যাংক
নতুন করে যাঁরা হিসাব খুলবেন, তাঁদের ওপর টিআইএন খড়্গ নেমে আসার ঘোষণায় ব্যাংক খাতে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। মূলত করের জাল বাড়ানোর জন্য এই উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার; কিন্তু নেতিবাচক প্রভাবের কথা চিন্তা করে সে অবস্থা থেকে এখন ফিরে আসতে চায় অর্থ মন্ত্রণালয়।
টিআইএন জমা বাধ্যতামূলক করার চেয়ে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত থেকে কর আহরণ করাটাই মূল বিষয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। জানতে চাইলে গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, ‘ব্যাংক থেকে অনানুষ্ঠানিক খাতে লেনদেন চলে যাওয়ার ভয় ছিল। তাই সরকার হয়তো সিদ্ধান্ত বদলাচ্ছে। আমাদের দেশে অনেক অপ্রাতিষ্ঠানিক খাত আছে, সেগুলোকে ভ্যাট ও করের আওতায় আনাটাই বড় বিষয়। নয়তো তারা হয়তো ব্যাংক হিসাব না খুলেও অনেক টাকার ব্যবসা ও লেনদেন চালিয়ে যাবে।’
কাজুবাদামে শুল্ক কমতে পারে
এদিকে বাজেটে কাজুবাদাম আমদানিতে আরোপ করা শুল্ককাঠামোতে পরিবর্তন আনার কথা বলছেন রাজস্ব কর্মকর্তারা। মূলত স্থানীয় প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানাগুলোর কথা চিন্তা করে আমদানিতে শুল্ক কমানো হতে পারে বলে জানান তাঁরা।
প্রস্তাবিত বাজেটে খোসাসহ কাঁচা কাজুবাদাম আমদানির ওপর ১৫ শতাংশ কাস্টমস শুল্ক ও ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়েছিল। ফলে কাঁচামাল আমদানিতে মোট করের হার ১৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশে উঠে যায়।
কিন্তু দেশে এখনো চাহিদার তুলনায় উৎপাদন না বাড়ায় এটার বিরোধিতা করেন উদ্যোক্তারা। তাঁরা আমদানি শুল্ক বাড়ানোর পরিবর্তে বিদেশ থেকে আনা খোসা ছাড়ানো প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপের দাবি জানান। এখন চূড়ান্ত বাজেটে খোসাসহ কাজুবাদাম আমদানিতে শুল্ক হ্রাসের কথা জানাচ্ছে এনবিআর। একই সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত কাজুবাদামের শুল্ক বাড়ানো হবে বলেও জানান তাঁরা।
বাজেটে বিজ্ঞাপনী সংস্থার ওপর কর ছয় গুণ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। বর্তমানে এ খাতে মোট বিলের শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ অথবা কমিশন ও ফি বাবদ প্রাপ্ত অর্থের ১০ শতাংশ—এই দুই হিসাবের মধ্যে যেটি বেশি, সেই হারে উৎসে কর কাটা হয়। প্রস্তাবিত বাজেটে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এজেন্সি সেবার ক্ষেত্রে বিল পরিশোধের সময় মোট বিলের ৪ শতাংশ হারে উৎসে কর আরোপ করা হয়। চূড়ান্ত বাজেটে এটি কমতে পারে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে।