
চলতি বছরের দ্বিতীয় মাস ফেব্রুয়ারিতে ব্রয়লার মুরগির মূল্যবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়। এক মাসেই ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ১০০ টাকা বেড়ে যায়। মার্চে গিয়ে ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজির দাম সর্বোচ্চ ২৮০ টাকা পর্যন্ত ওঠে, যা জানুয়ারিতে ছিল ১৪০ টাকার আশপাশে।
গত সেপ্টেম্বর থেকে দেশে আলুর বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। আর বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে এসে পেঁয়াজের বাজারেও আগুন লাগে। দেশি পেঁয়াজের দাম প্রতি কেজি ২০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। এ ছাড়া দফায় দফায় ডিম, কাঁচা মরিচ ও চিনির মতো পণ্যের দাম বেড়েও নতুন রেকর্ড হয়েছে। সব মিলিয়ে বছরজুড়ে নিত্যপণ্যের বাজারে ব্যাপক অস্থিতিশীলতা দেখা গেছে।
গত এক বছরে দাম দ্বিগুণ বা এর বেশি বেড়েছে দেশি ও আমদানি করা পেঁয়াজ ও রসুনের। আলুর দাম তো আরও বেশি চড়েছে। বছরের শুরুতে আলুর দাম যা ছিল, এখন তার চেয়ে তিন গুণ বেশিতে বিক্রি হচ্ছে। কয়েকটি পণ্যের দাম বেড়ে দ্বিগুণের কাছাকাছি উঠেছে বা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। যেমন চিনি, আদা, শুকনা মরিচ, ব্রয়লার মুরগি, জিরা ইত্যাদি। সরকার দামের লাগাম টানতে একপর্যায়ে পাঁচটি নিত্যপণ্যের দাম বেঁধে দেয়। পণ্যগুলো হচ্ছে ডিম, সয়াবিন তেল, পেঁয়াজ, চিনি ও আলু। কিন্তু বাজারে সয়াবিন তেল ছাড়া আর কোনো পণ্যের বেঁধে দেওয়া দাম কার্যকর হয়নি।
পৃথিবীর নানা জায়গায় মূল্যস্ফীতি কমে আসছে। এখন শক্ত মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও ডলারের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে আমরাও সুফল পাব। তবে সে ক্ষেত্রে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আন্তরিকতা থাকতে হবে। তাহলে আগামী ছয় মাসে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব হবে।গোলাম রহমান, সভাপতি, ক্যাব
দেশের বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দামে অস্থিরতার এই চিত্র পাওয়া যায় সরকারের হিসাবেও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, জানুয়ারিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ ও খাদ্যের মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ ছিল। বছরের শেষের দিকে অক্টোবরে এসে খাদ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১২ দশমিক ৫৬ শতাংশে ওঠে, যা গত ১১ বছর ৯ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। বছরের বেশির ভাগ সময়ই সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে ছিল। মে মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি রেকর্ড ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে ওঠে, যা এর আগের ১৩৪ মাস বা ১১ বছর ২ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। অক্টোবরেও সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। তবে নভেম্বরে এসে তা খানিকটা কমেছে।
পবিত্র রমজান মাসের আগে গত মার্চে প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগির দাম ২৬০-২৮০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। সোনালি মুরগির দাম ৩৫০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে বসে। এই খাতে দেশের বড় চারটি কোম্পানি সেই বৈঠকে মুরগির দাম কমানোর ব্যাপারে একমত হয়। তাতে মার্চের শেষ দিকে বাজারে মুরগির দাম কেজিতে ১০০ টাকার মতো কমে। মাঝখানে আরও কিছুটা কমলেও বাজারে এখন প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২০০ টাকায়।
জুনের শেষ দিকে কাঁচা মরিচের ঝাঁজ এতটাই বেড়ে যায় যে ঢাকার বাজারে এটির প্রতি কেজির দাম ৭০০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। এখন অবশ্য মানভেদে ৮০-১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে, যা জানুয়ারিতে ছিল ১০০-১২০ টাকা।
আগস্টের দিকে নতুন করে আলোচনায় আসে ডিম। কারণ, তখন ডিমের প্রতি ডজনের দাম ১৫০ টাকা ছাড়িয়ে যায়। ফার্মের মুরগির বাদামি রঙের ডিমের ডজন ১৬০-১৬৫ টাকায় ওঠে। সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে একপর্যায়ে প্রতিটি ডিমের দাম বেঁধে দেয় ১২ টাকা, কিন্তু বাজারে সেই দাম কার্যকর হয়নি। পরে গত সেপ্টেম্বরে ভারত থেকে ডিম আমদানির অনুমতি দেয় সরকার। নানা জটিলতা শেষে সামান্যসংখ্যক ডিম আমদানি হয়। এরই মধ্যে বাজারে ডিমের দাম নেমে আসে।
প্রান্তিক খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে ডিম ও মুরগির বাজারে অস্থিরতার জন্য বড় ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটকে দায়ী করে। বড় কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ করে সংগঠনটির সভাপতি সুমন হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, যত দিন বাজারটা ক্ষুদ্র খামারিদের হাতে ছিল, তত দিন অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বড় কোম্পানিগুলো মুরগির বাচ্চা ও খাবার উৎপাদনের পাশাপাশি নিজেরা ডিম ও মাংস উৎপাদন করছে। তাতে বাজারে তাদের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
বছরজুড়ে টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হারে কোনো তাল ছিল না। এখনো ডলারের দাম বাড়তি। ফলে চিনির বাড়তি আমদানি খরচের প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারে।গোলাম রহমান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, দেশবন্ধু গ্রুপ
চলতি বছরের প্রায় পুরোটা সময় চিনির বাজারে অস্থিরতা ছিল। বছরের শেষ দিকে নভেম্বর মাসে এসে খোলা ও প্যাকেটজাত চিনি প্রতি কেজির দাম ১৫০ টাকায় ওঠে। সরকার দফায় দফায় চিনির দাম বেঁধে দিলেও একবারও বাজারে তা কার্যকর হয়নি। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে চিনি কিনতে বাধ্য হন ক্রেতারা। ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে দাম কিছুটা কমলেও দেশে এখনো চিনির বাজার চড়া। প্রতি কেজি খোলা ও প্যাকেটজাত চিনি বিক্রি হচ্ছে ১৪০-১৪৫ টাকায়।
চিনিকলের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সুগার রিফাইনার্স অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ও দেশবন্ধু গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম রহমান প্রথম আলোকে বলেন, বছরজুড়ে টাকার বিপরীতে মার্কিন ডলারের বিনিময় হারে কোনো তাল ছিল না। এখনো ডলারের দাম বাড়তি। ফলে চিনির বাড়তি আমদানি খরচের প্রভাব পড়েছে দেশের বাজারে।
সেপ্টেম্বর মাস থেকে আলুর বাজার চড়া হতে শুরু করে। প্রতি কেজি আলুর দাম ৫০ টাকা ছাড়িয়ে যায়, যা এখনো চলছে। দেশে সাধারণত বছরের এ সময়ে আলুর দাম কমে; কিন্তু এবার তা হয়নি। এখন নতুন-পুরোনো উভয় ধরনের আলু বিক্রি হচ্ছে ৭০-৮০ টাকা কেজি দরে। ভারত সরকার পেঁয়াজ রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দিলে চলতি ডিসেম্বরে দেশি পেঁয়াজের দাম প্রতি কেজি ২২০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। নতুন পেঁয়াজ আসতে শুরু করায় দাম কিছুটা কমেছে বটে; কিন্তু এখনো তা সহনীয় পর্যায়ে আসেনি। নতুন দেশি পেঁয়াজ ১০০-১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
বছরের শেষ দিকে এসে অবশ্য গরুর মাংসের দামে কিছুটা স্বস্তি পান ক্রেতারা। কারণ, গরুর মাংসের প্রতি কেজির দাম ৭৫০-৮০০ টাকা থেকে কমে ৬০০-৬৫০ টাকায় নেমে এসেছে।
বছরজুড়ে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা সম্পর্কে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘পৃথিবীর নানা জায়গায় মূল্যস্ফীতি কমে আসছে। এখন শক্ত মুদ্রানীতি প্রণয়ন ও ডলারের বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণ করা গেলে আমরাও সুফল পাব। তবে সে ক্ষেত্রে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে আন্তরিকতা থাকতে হবে। তাহলে আগামী ছয় মাসে মূল্যস্ফীতি কমানো সম্ভব হবে।’
বছরজুড়ে দ্রব্যের দাম নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি সরকার। এর মধ্যে জাতীয় সংসদে ও এর বাইরে দ্রব্যমূল্য নিয়ে সমালোচনার তির ছোড়া হয় বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির দিকে। চিনির দাম নিয়ে বাণিজ্যমন্ত্রীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়। ডিম ও মুরগির দাম নিয়ন্ত্রণে বাণিজ্যমন্ত্রীর তেমন ভূমিকা নেই। প্রাণিসম্পদমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিমকেও এসব বিষয়ে কথা বলতে কমই দেখা গেছে। খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার, কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বাজার নিয়ে সময়ে-সময়ে কথা বলেছেন। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বাজারে তদারকি অভিযান চালিয়েছে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সভা করেছে। সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে; কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। সাধারণ মানুষকে অস্বস্তির মধ্য দিয়ে বছর পার করতে হয়েছে।