রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সামনে একটি ভ্যান থেকে ডাব কিনে পানি খাচ্ছেন গ্রাহকেরা। কেউ কেউ সেখান থেকে রোগীদের জন্য পলিথিনে করে ডাবের পানি নিয়েও যাচ্ছেন
রাজধানীর জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সামনে একটি ভ্যান থেকে ডাব কিনে পানি খাচ্ছেন গ্রাহকেরা। কেউ কেউ সেখান থেকে রোগীদের জন্য পলিথিনে করে ডাবের পানি নিয়েও যাচ্ছেন

হঠাৎ ডাবের দাম চড়া, ২০০ টাকা ছুঁয়েছে

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের সড়কে দাঁড়ানো একটি ভ্যান থেকে গতকাল দুপুরে ডাব কিনছিলেন জহিরুল ইসলাম। বিক্রেতা এক পিস ডাবের দাম হাঁকলেন ২০০ টাকা। এটা নিয়ে কয়েকবার দর–কষাকষি শেষে ১৮০ টাকায় এক পিস ডাব কেনেন জহিরুল। হাসপাতালটিতে দুই দিন ধরে ভর্তি আছেন জহিরুলের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছেলে। তাঁর জন্যই এ ডাব কেনা।

ডাব কিনে ফেরার পথে ক্ষোভ প্রকাশ করে জহিরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘কিছুদিন আগেও এই আকারের ডাব ১৪০ টাকায় কিনেছি। এখন এক পিসেই দাম ৫০-৬০ টাকা বেড়েছে। অসুস্থ রোগীর জন্য ডাব কিনতেই হয়। কিন্তু দাম তো অনেক বেশি।’

বাজারে ডাবের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। বর্তমানে ঢাকায় ১৩০ টাকার নিচে কোনো ডাব পাওয়া যাচ্ছে না, আর একটু বড় আকারের ডাবের দাম ঠেকেছে ২০০ টাকায়। এক মাসের ব্যবধানে প্রতি পিস ডাবে ৩০ থেকে ৫০ টাকা দাম বেড়েছে। এর আগে আকারভেদে প্রতি পিস দাম ১০০ থেকে ১৫০ টাকার মধ্যে কেনা যেত।

গতকাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, আগারগাঁও ও কারওয়ান বাজার এলাকায় ঘুরে এবং পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিক্রেতারা জানিয়েছেন, বর্তমানে বাজারে ডাবের সরবরাহ কম। অন্যদিকে, গরম, ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বাড়ায় ডাবের চাহিদা বেড়েছে। এ কারণে ডাবের দাম বেড়ে গেছে। তবে ডাবের দাম ২০০ টাকা হওয়াকে অস্বাভাবিক বলছেন বিক্রেতারাই। তাঁদের ভাষ্য, চাহিদা বেশি থাকলেও ডাবের দাম ১৫০-১৬০ টাকার বেশি হওয়ার কথা না। কিন্তু এখন দাম অনেক বেশি।

গতকাল ঢাকায় দেখা যায়, সবচেয়ে ছোট যে ডাব, সেটির দামও ১২০–১৩০ টাকা। এই ডাবে বড়জোর ২৫০ গ্রাম পানি হবে। আধা লিটার পানি হবে এমন ডাবের দাম ১৮০ টাকা। এর চেয়ে বড় হলে ২০০ টাকা বা তার ওপরে।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় প্রতিদিন কমবেশি ৫ লাখ ডাব প্রবেশ করে। কিন্তু ডাবের চাহিদা এর তুলনায় অনেক বেশি। ডাবের সরবরাহ বাড়তে আরও মাসখানেক সময় লাগতে পারে। তার আগে ডাবের বাজারে স্বস্তি ফেরার তেমন সম্ভাবনা নেই।

কেন এত দাম বাড়ল

ডাবের বর্তমান মূল্যবৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণের কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। কোকো গ্রিনের সহপ্রতিষ্ঠাতা মো. সুজন আহমেদ বলেন, সাধারণত গুটি বা ‘কড়া’ থেকে ডাব পরিপক্ব হতে প্রায় ৯০ দিন বা তিন মাস সময় লাগে। বর্ষার আগে গ্রীষ্মকালে যে তীব্র খরা থাকে, তখন গাছে ‘কড়া’ কম আসে। এই প্রাকৃতিক কারণে বর্তমানে বাজারে ডাবের সরবরাহে একটি ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

তবে হঠাৎ চাহিদা বৃদ্ধিও মূল্যবৃদ্ধির একটি কারণ। বিক্রেতাদের ভাষ্য, গত এক-দেড় বছরে দেশে ডাবের চাহিদা অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে হাসপাতালকেন্দ্রিক ডাবের চাহিদা অনেক বেড়েছে। এ ছাড়া গরমের কারণেও ডাবের ভালো বিক্রি রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গতকালের তথ্য অনুসারে, আগের ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন ৮০৫ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। বরাবরের মতো এ বছরও ঢাকায় ডেঙ্গু রোগী বেশি দেখা যাচ্ছে। কীটতত্ত্ববিদেরা আগেই সতর্ক করে বলেছিলেন, চলতি বছর আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়বে। চলতি আগস্টের প্রথম ১৬ দিনে সারা দেশে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন ৮ হাজার ৬৬৮ জন। ডেঙ্গু রোগী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাবের দামও পাল্লা দিয়ে বেড়েছে।

রাজধানীর গ্রিন রোডে একটি ভ্যান থেকে গতকাল সকালে ডাব কিনছিলেন বেসরকারি চাকরিজীবী তানভীর হোসেন। তিনি তখন ছেলেকে স্কুল থেকে নিয়ে ফিরছিলেন। পথে ছেলেকে ডাবের পানি খাওয়াতে ওই ভ্যানের পাশে দাঁড়ান।

এ সময় জানতে চাইলে প্রথম আলোকে তানভীর হোসেন বলেন, ‘দু–তিনটা ডাবের ভ্যানে ঘুরে দাম দেখলাম। ১৩০ টাকার নিচে কেউ ডাব বিক্রি করছে না। এই ডাবে পানি এত কম হবে যে তা খাওয়া না–খাওয়া সমান কথা। একটু বড় ডাব নিলেই দাম ১৮০ টাকার বেশি হয়ে যায়। ভেবেছিলাম বাপ-ছেলে দুইটা ডাব খাব। এখন শুধু একটা কিনেছি।’

গাছ থেকে আড়ত: হাতবদলেই বাড়ে দাম

ঢাকায় পাইকারিতে ডাব বিক্রি করে কোকো গ্রিন নামের একটি প্রতিষ্ঠান। কোম্পানিটির সহপ্রতিষ্ঠাতা মো. সুজন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, একটি ডাবগাছ থেকে ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর আগে অন্তত ৪ থেকে ৫টি ধাপ অতিক্রম করে। প্রতি ধাপে যুক্ত হয় বাড়তি খরচ। যেমন, প্রথমেই গ্রামে গৃহস্থের গাছ থেকে গাছিরা ডাব সংগ্রহ করেন। বর্তমানে তাঁরা প্রতি পিস ডাব ৮০ টাকার কাছাকাছি দামে কিনছেন। তাঁরা এই ডাব স্থানীয় ব্যাপারী বা আড়তদারের হাতে বিক্রি করেন অন্তত ১০০ টাকায়।

দেশের প্রধান ডাব উৎপাদনকারী অঞ্চল ভোলা, নোয়াখালী, বরিশাল। এসব এলাকা থেকে ঢাকায় ৩ হাজার পিসের একটি ট্রাক আসতে ভাড়া পড়ে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। অর্থাৎ ঢাকায় পৌঁছাতেই প্রতিটি ডাবে অতিরিক্ত ১১-১২ টাকা পরিবহন খরচ যুক্ত হয়। ফলে আড়তে পৌঁছানোর আগেই খরচ দাঁড়ায় ১১২ টাকার মতো। এরপর আড়ত থেকে আরও প্রায় ২০-৩০ টাকা বেশি দামে খুচরা বিক্রেতারা ডাব কেনেন। তাতে প্রতি পিসের দাম পড়ে ১৩০-১৪০ টাকা। ডাবের মান ভালো হলে পাইকারিতে দাম আরও ১০-২০ টাকা বেশি হয়।

রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার খুচরা ডাব বিক্রেতা মো. আজিম জানান, আড়ত থেকে ডাব কেনার পরে সেগুলোকে তাঁরা আকার অনুযায়ী আলাদা করেন। কারণ, পাইকারি ব্যবসায়ীরা ১৩০-১৪০ টাকা সাধারণ দরে ডাব বিক্রি করেন। কিন্তু ছোট আকারের ডাব ১৪০ টাকায় বিক্রি করা যায় না। সেগুলো ১২০-১৩০ টাকায় বিক্রি করেন। আর বড় ডাব বিক্রি করেন ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়।

প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলতে বলতেই একজন গ্রাহক বিক্রেতা মো. আজিমের সঙ্গে দাম নিয়ে তর্কে জড়ালেন। একপর্যায়ে মো. আজিম ক্রেতাকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘দাম কি আমরা বাড়াইছি? আমাগো কেনা বেশি, বেচাও বেশি (দামে)। গত ১২ বছর ধরে ডাবের ব্যবসা করি। এবারের মতো বেশি দাম আগে দেহি নাই। দেড় শর (টাকার) ওপরে আমাগো কেনাই পড়ে যায়। তাইলে ১৮০-২০০ টাকার কমে কেমনে বেচি।’