স্বপ্নে ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে এসিআই

সুপারশপ স্বপ্নে ৭০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে সুপারশপটির মূল মালিকানা কোম্পানি এসিআই। গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এসিআইয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভায় বিনিয়োগের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের পর এই বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে। প্রেফারেন্স শেয়ারের বিপরীতে মূলধন হিসেবে স্বপ্নে এই বিনিয়োগ করবে এসিআই। এসিআইয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এসিআই লজিস্টিকসের আওতায় স্বপ্ন ব্র্যান্ডের সুপারশপটি পরিচালিত হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, স্বপ্নকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে নতুন করে মূলধনি বিনিয়োগের এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে এসিআই। ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বিভিন্ন সময় স্বপ্নকে অর্থ ধার দিয়েছিল এসিআই। ধার দেওয়া এসব অর্থ আন্তকোম্পানি ঋণ হিসেবে স্বপ্নের হিসাবের খাতায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। দীর্ঘদিন ধরে স্বপ্ন লোকসানি প্রতিষ্ঠান হওয়ায় এই অর্থ ফেরত দিতে পারছিল না। এ অবস্থায় স্বপ্নকে লাভজনক করতে এসিআইয়ের দেওয়া ঋণের অর্থকে মূলধনি বিনিয়োগে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে মূল কোম্পানির ঋণ বা ধারের অর্থ হয়ে যাবে মূলধন। এ ছাড়া স্বপ্নে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে যুক্ত হয়েছে জাপানের শীর্ষস্থানীয় বহুজাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান মিতসুই অ্যান্ড কোং লিমিটেড। ফলে মূল কোম্পানি এসিআই ও জাপানি প্রতিষ্ঠান মিতসুইয়ের বিনিয়োগে দ্রুত স্বপ্ন লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত হবে বলে আশা করছেন কোম্পানি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এসিআই জানিয়েছে, এই বিনিয়োগের বিপরীতে এসিআই লজিস্টিকস ৭০ লাখ প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যু করবে। প্রতিটি প্রেফারেন্স শেয়ারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার টাকা। সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে এই বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে।

আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২ হাজার ৬৫০ কোটি টাকার রেকর্ড ব্যবসা করেছে সুপারশপ স্বপ্ন। তাতে অর্থবছর শেষে স্বপ্ন ২১ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফাও করেছিল। কিন্তু সুদ ব্যয় ও কর পরিশোধের পর প্রতিষ্ঠানটি শেষপর্যন্ত আর মুনাফা করতে পারেনি। উল্টো লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় পৌনে ৩০০ কোটি টাকায়। স্বপ্নের গত পাঁচ অর্থবছরের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছর বাদে বাকি চার অর্থবছরই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালন মুনাফা করেছে। তা সত্ত্বেও ব্যাংকঋণ ও সরকারের কর পরিশোধের পর পরিচালন মুনাফা বড় অঙ্কের লোকসানে পরিণত হয়। আর সেটি হয়েছে মূলত ব্যাংকঋণ বাবদ খরচ বেড়ে যাওয়ায়। এই পাঁচ অর্থবছরের প্রতিবছরই প্রতিষ্ঠানটির সুদ বাবদ খরচ বেড়েছে। এ কারণে লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। মূলত আন্তকোম্পানি ও ব্যাংকঋণের সুদ স্বপ্নের মুনাফার পথে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল এত দিন। এ কারণে ব্যবসায়িক মডেল পরিবর্তন করে আন্তকোম্পানি ঋণকে মূলধনে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা চূড়ান্ত হয়েছে মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এসিআইয়ের পর্ষদ সভায়।

এই বিনিয়োগ আমাদের ব্যবসার সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিবহন ও অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালীকরণ ও কৃষি ব্যবসার প্ল্যাটফর্ম শক্তিশালী করবে
সাব্বির হাসান নাসির, এমডি, স্বপ্ন

জানতে চাইলে এসিআই লজিস্টিকসের (স্বপ্ন) এমডি সাব্বির হাসান নাসির প্রথম আলোকে বলেন, ‘এসিআইয়ের বিনিয়োগ থেকে প্রাপ্ত অর্থ বিদ্যমান ঋণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমিয়ে দেবে। পাশাপাশি এই বিনিয়োগ আমাদের ব্যবসার সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিবহন ও অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তির আধুনিকায়ন, ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালীকরণ ও কৃষি ব্যবসার প্ল্যাটফর্ম শক্তিশালী করবে। তাই আশা করছি, আমরা দ্রুত লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারব।’

স্বপ্নের গত ৫ বছরের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০-২১ অর্থবছরে স্বপ্ন ১ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকার ব্যবসা করেছে। তার বিপরীতে অর্থবছর শেষে প্রতিষ্ঠানটি কর-পরবর্তী লোকসানের পরিমাণ ছিল ১৪২ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ১ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকার ব্যবসা করে। তার বিপরীতে ওই অর্থবছর শেষে প্রতিষ্ঠানটির কর-পরবর্তী লোকসানের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩৬ কোটি টাকা। তার পরের বছর অর্থাৎ ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা করেছে ১ হাজার ৮৩২ কোটি টাকার। তার বিপরীতে কর-পরবর্তী লোকসান দাঁড়ায় প্রায় ১৫৩ কোটি টাকা। আর ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা করেছে ২ হাজার ২৮৫ কোটি টাকার। তার বিপরীতে কর-পরবর্তী লোকসান ১৯৬ কোটি টাকা। আর সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা করেছে ২ হাজার ৬৫০ কোটি টাকার। তার বিপরীতে কর-পরবর্তী লোকসানের পরিমাণ ছিল ২৭৩ কোটি টাকা।

এদিকে স্বপ্নে বিনিয়োগের ঘোষণায় আজ বুধবার দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) এসিআইয়ের শেয়ারের দাম বেড়েছে। এদিন কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ৪ টাকা ৭০ পয়সা বা সোয়া ২ শতাংশের বেশি বেড়ে দাঁড়ায় ২০৮ টাকায়। ঢাকার বাজারে আজ এসিআইয়ের সাত কোটি টাকার সমমূল্যের প্রায় সাড়ে তিন লাখ শেয়ারের হাতবদল হয়।