জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভবন
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ভবন

রাজস্বঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়াল

প্রথমবারের মতো শুল্ক-কর আদায়ের ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেল। তাই চলতি অর্থবছরে রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতির মুখে পড়ছে দেশের প্রধান রাজস্ব আদায়কারী সংস্থা জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুসারে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) শুল্ক-কর আদায়ে ঘাটতি ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা, যা যেকোনো সময়ের বিবেচনায় এ যাবৎকালের রেকর্ড ঘাটতি।

কয়েক বছর ধরেই অর্থনীতি চাপের মুখে আছে। ব্যবসা–বাণিজ্যে শ্লথগতি। ফলে রাজস্ব আদায়ের গতিও ভালো নয়। এমন অবস্থায় সরকার অর্থনীতি চাঙা করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল দিচ্ছে, যা উদ্যোক্তারা ৭ শতাংশ সুদে এই ঋণ নিতে পারবেন, বাকি ৬ শতাংশ সুদ সরকার ভর্তুকি দেবে।

এমন প্রেক্ষাপটে এনবিআর রেকর্ড ঘাটতির মুখে পড়তে যাচ্ছে। রাজস্ব আদায় বাড়ানোই নতুন সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে এনবিআরের শুল্ক-কর আদায়ের লক্ষ্য ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা। এ সময়ে এনবিআর আদায় করতে পেরেছে ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি টাকা, ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়াল।

সংশোধিত বাজেট অনুসারে, চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে পাঁচ লাখ তিন হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে। এর মানে হলো লক্ষ্য অর্জনে চলতি মে ও জুন মাসে পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা আদায় করতে হবে। প্রতি মাসে আদায় করতে হবে গড়ে ৮৮ হাজার কোটি টাকা।

কোন খাতে কত আদায়

জুলাই-মার্চ সময়ে আমদানি শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ও আয়কর—এই তিন খাতের মধ্যে কোনো খাতেই লক্ষ্য অর্জিত হয়নি। গত জুলাই-এপ্রিলে সবচেয়ে বেশি ঘাটতি হয়েছে আয়কর খাতে। এ খাতে ঘাটতি ৪৪ হাজার কোটি টাকা। এরপর ভ্যাটে ঘাটতি ৩৫ হাজার ৩০৮ কোটি টাকা। আর শুল্ক আদায়ে ঘাটতি ২৫ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা।

এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, এ বছর নির্বাচন হয়েছে। নতুন সরকার এসেছে। একধরনের রাজনৈতিক উত্তরণ হয়েছে। এ ছাড়া অর্থনীতি চাপে থাকায় ব্যবসা–বাণিজ্য শ্লথ হয়েছে। এসব কারণে শুল্ক-কর আদায় তুলনামূলক কম হয়েছে।

রাজস্ব ঘাটতি হলে কী হয়

রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি হলে প্রথমেই সরকারের খরচে টান পড়ে। প্রতিবছর বাজেটের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের বেশি জোগান দেয় এনবিআর। কিন্তু সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন–ভাতা, দেশি–বিদেশি ঋণের সুদ খরচসহ পরিচালক খরচ হিসেবে বাজেটে বরাদ্দ থাকে। এসব খরচ করতেই হবে। সেখানে কমানোর সুযোগ নেই বললেই চলে। কিন্তু বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় সরকারে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। যেমন চলতি অর্থবছরের দুই লাখ কোটি টাকার এডিপি বাস্তবায়ন করছে।

যখনই অর্থের জোগানে টান পড়ে, তখন পরিচালন খরচ কমানোর সুযোগ থাকে না। এ সময় সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ কমায়। এ ছাড়া প্রকল্পের টাকা খরচ করার সক্ষমতাও কম। এডিপির টাকা কমানোই সরকারের হাতে সবচেয়ে ভালো বিকল্প হয়। এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বেশ কম। বর্তমানে তা ৬ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে নেমে এসেছে।

সংস্কার জরুরি

পুরোনো রাজস্ব প্রশাসন দিয়ে এত বিশাল লক্ষ্য অর্জন কঠিন। এ জন্য সংস্কার প্রয়োজন—এ কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা। রাজস্ব খাত সংস্কার করে অন্তর্বর্তী সরকার যে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, তা বিল আকারে জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেনি বিএনপি সরকার। ফলে অধ্যাদেশটি কার্যকারিতা হারিয়েছে। এখন নতুন করে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে নতুন সরকার। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা ইসমাইল জবিউল্লাহর নেতৃত্ব একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, কর ফাঁকি বন্ধ করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ, করজালের বাইরে থাকা করযোগ্য মানুষকে করের আওতায় আনা, রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো, ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া—এসব পুরোনো সমস্যার সমাধানে মনোযোগী হতে হবে।