অর্থবিলে নতুন বিধান

বিজ্ঞাপনী সংস্থার কর বাড়ল ৬ গুণ, পুনর্বিবেচনার দাবি উদ্যোক্তাদের

জনসংযোগ, বিজ্ঞাপন, ক্রিয়েটিভ মিডিয়া, ইভেন্ট ব্যবস্থাপনা ও প্রশিক্ষণ-কর্মশালা পরিচালনাসহ বিভিন্ন সেবা খাতে উৎসে করের হার বাড়ানো হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। নতুন বিধান অনুযায়ী, এসব সেবার বিপরীতে বিল পরিশোধের সময় মোট বিলের ৪ শতাংশ হারে কর কেটে রাখা হবে। বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই কর হার ২ শতাংশ। মিডিয়া এজেন্সির ক্ষেত্রে করহার বেড়েছে ৬ গুণেরও বেশি।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সম্প্রতি প্রকাশিত উৎসে কর বিধিমালায় এ–সংক্রান্ত নতুন বিধান অন্তর্ভুক্ত করেছে। নতুন নিয়মে সংশ্লিষ্ট সেবা খাতের ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগের চেয়ে বেশি হারে উৎসে কর দিতে হবে।

বিধিমালায় বলা হয়েছে, প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া এজেন্সি সেবার ক্ষেত্রে বিল পরিশোধের সময় মোট বিলের ৪ শতাংশ হারে উৎসে কর কেটে রাখতে হবে। বর্তমানে এ খাতে মোট বিলের শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ অথবা কমিশন ও ফি বাবদ প্রাপ্ত অর্থের ১০ শতাংশ—এই দুই হিসাবের মধ্যে যেটি বেশি, সেই হারে উৎসে কর কাটা হয়। নতুন বিধানের ফলে এ খাতের উৎসে কর বাড়ছে ৬ গুণের বেশি।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন করে এ খাতে করহার বাড়ানোর ফলে মিডিয়া এজেন্সি খাত সংকুচিত হতে পারে। এমনকি যারা নিয়ম মেনে কর দেয়, তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।

জানতে চাইলে গ্রে বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক (ক্রিয়েটিভ) নুরুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘নতুন কর হারের কারণে এজেন্সির আয় কমে যাবে। কর্মীর বেতন–ভাতায় তার প্রভাব পড়বে। ফলে মেধাবীরা এই ধরনের কাজে নিরুৎসাহিত হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশর ব্র্যান্ড ইমেজ তৈরির চেষ্টাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।’

কর বাড়ানোর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান অসৎ উপায় অবলম্বন করতে পারে বলেও মনে করছেন নুরুর রহমান। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ২ কোটি টাকার একটি কাজে ১০ শতাংশ কমিশন হিসাবে আমরা হয়তো ২০ লাখ টাকা পাব। সেখান থেকে এখন ৮ লাখ টাকা দিয়ে দিলে ১২ টাকায় কীভাবে বেতন দিয়ে আমরা টিকে থাকব? এতে অনেকে এজেন্সি এই কর পরিশোধে আগ্রহী হবে না।

শুধু মিডিয়া এজেন্সি নয়, আরও কয়েকটি সেবা খাতেও একইভাবে উৎসে করের হার ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৪ শতাংশ করা হয়েছে। এসব খাতের মধ্যে রয়েছে—ক্যাটারিং সেবা, জনসংযোগ সেবা, ইভেন্ট পরিচালনা, প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা আয়োজন, কুরিয়ার সার্ভিস, প্যাকিং ও শিফটিং সেবা এবং সংগ্রহ ও পুনরুদ্ধার (কালেকশন অ্যান্ড রিকভারি) এজেন্সি ।

এই বড় পরিবর্তন অবাস্তব। ৫ শতাংশের কম মার্জিনে চলা এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট বিলের ওপর ৪ শতাংশ কর ধরলে তাদের কার্যকর মূলধন ও লাভের হার বলে কিছু থাকবে না
স্নেহাশীষ বড়ুয়া, পরিচালক, এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিজ্ঞাপন নির্মাণ, ব্র্যান্ডিং, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিপণন ও অন্যান্য সৃজনশীল সেবার সঙ্গে যুক্ত তরুণ উদ্যোক্তাদের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে নতুন উদ্যোক্তা ও ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের নগদ অর্থপ্রবাহে বাড়তি চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

জানতে চাইলে বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর সংগঠন অ্যাডভারটাইজিং এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এএএবি) সভাপতি সানাউল আরেফিন প্রথম আলোকে বলেন, আমরা ২-৩ শতাংশ কমিশনে কাজ করি। এখন যদি মোট বিলের ওপর ৪ শতাংশ কর ধরা হয় তাহলে কাজই করা যাবে না। আমরা টিকতে পারব না। নিজের পকেট থেকে টাকা দিতে হবে। এটা নিয়ে আমরা এনবিআরে কথা বলছি।

সংগঠনটির যুগ্ম সম্পাদক এম এ মারুফ বলেন, নতুন এ সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা খুবই শঙ্কিত। এটার মাধ্যমে মিডিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কারণ ৭০ শতাংশ বিজ্ঞাপন আমাদের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ফলে এটা বাস্তবায়ন হলে এ শিল্প একদম শেষ হয়ে যাবে।

দেশে বিজ্ঞাপন ও মিডিয়া ব্যবস্থাপনা খাতে শতাধিক প্রতিষ্ঠান সক্রিয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সংবাদপত্র, টেলিভিশন, রেডিও, অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়। বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর সংগঠন এএএবির বর্তমান সদস্যসংখ্যা ৬০–এর বেশি। নতুন বিধান অনুযায়ী, এসব সেবার বিপরীতে বিল পরিশোধের সময় মোট বিলের ৪ শতাংশ উৎসে কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে।

বিজ্ঞাপনী সংস্থাগুলোর সংগঠন এএএবির পক্ষ থেকে প্রস্তাবিত করহার পুনরায় মূল্যায়ন করতে সরকারের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ১৪ জুন এনবিআরে পাঠানো চিঠিতে মিডিয়া এজেন্সির জন্য করহার মোট বিলের শূন্য দশমিক ৬৫ শতাংশ বহাল রাখার দাবি জানানো হয়। সংগঠনের সভাপতি সানাউল আরেফিন স্বাক্ষরিত চিঠিতে, ক্রিয়েটিভ মিডিয়া, ইভেন্ট এবং জনসংযোগের ওপর মোট বিলের ১ শতাংশ কর কর্তনের দাবিও জানানো হয়।

জানতে চাইলে কর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ‘এই বড় পরিবর্তন অবাস্তব। ৫ শতাংশের কম মার্জিনে চলা এই ধরনের প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট বিলের ওপর ৪ শতাংশ কর ধরলে তাদের কার্যকর মূলধন ও লাভের হার বলে কিছু থাকবে না। তাই ব্যবসা বন্ধ ও খেলাপি হওয়া ঠেকাতে নীতিনির্ধারকদের দ্রুত কমিশনভিত্তিক কর কাঠামো পুনর্বহাল করা উচিত।’