আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও)
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও)

২০২৬ সালে অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করবেন ২১০ কোটি শ্রমিক: আইএলও

বৈশ্বিক শ্রমবাজারে উল্টো প্রবণতা দেখছে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)। সংস্থাটির নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক বেকারত্ব স্থিতিশীল থাকলেও শোভন কাজের গতি থমকে গেছে, যদিও একসময় তা বাড়ছিল।

অর্থাৎ অনানুষ্ঠানিক খাতে শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। চলতি বছর ২০০ কোটির বেশি শ্রমিক এই খাতে কাজ করবেন বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএলও।

প্রতিবেদনে আরও সতর্ক করা হয়েছে, তরুণদের জীবন এখনো সংগ্রামমুখর। সেই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও বাণিজ্য নীতির অনিশ্চয়তার কারণে শ্রমবাজার আরও দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

কর্মসংস্থান ও সামাজিক প্রবণতা ২০২৬ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৯ শতাংশে স্থির থাকতে পারে। সংখ্যাগত দিক থেকে যা প্রায় ১৮৬ মিলিয়ন বা ৮ কোটি ৬০ লাখ মানুষ। সেই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শ্রমিক এখনো মানসম্মত কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত।

আইএলওর মহাপরিচালক গিলবার্ট এফ হংবো বলেন, স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি ও বেকারত্বের হার দেখে বিভ্রান্ত হওয়া যাবে না। বাস্তবতা আরও গভীর—কোটি কোটি শ্রমিক এখনো দারিদ্র্য, অনানুষ্ঠানিকতা ও বঞ্চনার ফাঁদে আটকে আছেন।

চাকরির গুণগত মান কমছে

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ৩০ কোটি শ্রমিক এখনো চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছেন। তাঁদের দৈনিক আয় ৩ মার্কিন ডলার বা ৩৬৩ টাকার কম। একই সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থান বাড়ছে। ২০২৬ সালে প্রায় ২১০ কোটি শ্রমিক অনানুষ্ঠানিক কাজে নিয়োজিত থাকবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব কাজে সামাজিক সুরক্ষা, কর্ম অধিকার ও চাকরির নিরাপত্তা কম। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে অনানুষ্ঠানিক খাতের আকার বড়। এ ধরনের পরিবেশে কাজ করা শ্রমিকেরা আরও পিছিয়ে পড়ছেন।

অঞ্চল, আয় স্তর, জেন্ডার ও বয়সভিত্তিক তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থনৈতিক রূপান্তর বা অগ্রগতির গতি কম হওয়ার কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। অর্থাৎ স্বাভাবিক নিয়মে অর্থনীতির যে গতিতে উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী শিল্প বা সেবা খাতনির্ভর হওয়ার কথা, তার গতি কমে যাওয়াই চাকরির গুণগত মান ও উৎপাদনশীলতার টেকসই অগ্রগতির পথে বড় বাধা।

তরুণ ও এআইয়ের ঝুঁকি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তরুণেরা এখনো কঠিন অবস্থার মুখে। ২০২৫ সালে তরুণদের বেকারত্বের হার বেড়ে হয়েছে ১২ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রায় ২৬ কোটি তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা প্রশিক্ষণ (এনইইটি) কোনোটিতেই যুক্ত নয়। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে এই হার উদ্বেগজনক, ২৭ দশমিক ৯ শতাংশ। আইএলও সতর্ক করেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অটোমেশনের কারণে এসব চ্যালেঞ্জ আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন পেশায় প্রথমবারের মতো চাকরি খুঁজতে থাকা শিক্ষিত তরুণদের জন্য।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তরুণদের কর্মসংস্থানে এআইয়ের পূর্ণাঙ্গ প্রভাব কী হবে, সেই বিষয় এখনো অনিশ্চিত হলেও তার যে গভীরতা, সেদিকে নিবিড় দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন।

দক্ষিণ এশিয়ার বেকারত্ব

প্রতিবেদনের পূর্বাভাস, দক্ষিণ এশিয়ায় সামগ্রিক বেকারত্বের হার পর্যন্ত ৪ দশমিক ৬ শতাংশে অপরিবর্তিত থাকবে। প্রাথমিকভাবে মনে হতে পারে, এই স্থিতিশীলতা শ্রমবাজারের জন্য ভালো। তবে এই অঞ্চলে জনসংখ্যা ও শ্রমশক্তির বিশাল পরিসরের প্রেক্ষাপটে এ ধারণা বিভ্রান্তিকর বলে মনে করে আইএলও।

বিষয়টি হলো দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যা বিপুল ও দ্রুত বর্ধনশীল। পূর্বাভাস অনুযায়ী, বেকারের সংখ্যা ২০২৪ সালে ৩ কোটি ৭৬ লাখ থেকে বেড়ে ২০২৭ সালে ৩ কোটি ৯৯ লাখে পৌঁছাবে।

এই প্রবণতা থেকে বোঝা যায়, কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ কতটা। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এত বেশি যে কেবল বেকারত্বের হার স্থির রাখতেই প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা প্রয়োজন। টেকসই ও বৃহৎ পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে বেকারের সংখ্যা বাড়তেই থাকবে।

তবে সূচক দিয়ে বাস্তবতার পুরোটা বোঝা যায় না। শ্রমবাজারের গভীর গুণগত সমস্যাগুলো আড়ালে পড়ে যায়। বিপুলসংখ্যক অনানুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান, নিম্নমানের কাজ ও দারিদ্র্য এই অঞ্চলে অধিকাংশ শ্রমজীবীর বাস্তবতা। ফলে কেবল বেকারত্বের পরিসংখ্যান দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমবাজারের প্রকৃত ঝুঁকি ও ভঙ্গুরতা পুরোপুরি বোঝা যায় না।

আইএলও বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ম্যাক্স টুনোন বলেন, ‘এই প্রতিবেদনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাংলাদেশে যে উদ্বেগজনক প্রবণতাগুলো আমরা দেখছি, সেগুলোর প্রতিফলন বৈশ্বিক পর্যায়েও আছে। তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাধিক্যের যে সুবিধা, তা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। বাংলাদেশসহ অনেক দেশ আজ বড় প্রশ্নের মুখোমুখি: উৎপাদনশীল ও মানসম্মত কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ করা, না কি দীর্ঘমেয়াদি বেকারত্ব, অনানুষ্ঠানিকতা ও সামাজিক চাপের ঝুঁকির মধ্যে থাকা।’

বাণিজ্য অস্থিরতা

আইএলও মনে করছে, বৈশ্বিক বাণিজ্য বিঘ্নিত হওয়ায় শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। বাণিজ্যের নিয়ম নিয়ে অনিশ্চয়তা ও সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিবন্ধকতার কারণে শ্রমিকদের মজুরি কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাণিজ্য এখনো কর্মসংস্থানের বড় উৎস। বিশ্বব্যাপী ৪৬ কোটি ৫০ লাখ শ্রমিকের কাজ বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের অর্ধেকের বেশি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে শোভন কাজ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বাণিজ্যের ভূমিকা শক্তিশালী হতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে; এসব দেশের রপ্তানিনির্ভর খাতগুলোতে কর্মসংস্থানের মান ভালো। অর্থাৎ সেখানে তুলনামূলকভাবে ভালো মজুরি দেওয়া হয়। সেই সঙ্গে আছে কাজের নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা। নারী ও তরুণদের সুযোগও বেশি।

আইএলওর মহাপরিচালক শোভন কাজ ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তায় জোর দেন। বিশেষ করে দরিদ্র অর্থনীতিগুলোতে, যেসব দেশ সরবরাহ শৃঙ্খল ও ডিজিটাল বাণিজ্য সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে আছে।

হংবো বলেন, সরকার, নিয়োগকর্তা ও শ্রমিকেরা যদি দায়িত্বশীলভাবে প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং নারী ও তরুণদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সমন্বিতভাবে কাজ না করেন, তাহলে শোভন কাজের ঘাটতি থাকবে। এতে সামাজিক সংহতি ঝুঁকিতে পড়বে।

প্রতিবেদনের সুপারিশ

বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রতিবেদনে বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। সেগুলো হলো

  • দক্ষতা, শিক্ষা ও অবকাঠামোতে বিনিয়োগসহ উৎপাদনশীলতাবর্ধক নীতি বাস্তবায়ন।

  • অংশগ্রহণে বিদ্যমান বাধা দূর করা এবং প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করে লিঙ্গ ও যুব বৈষম্য মোকাবিলা।

  • বাণিজ্য ও শোভন কাজের পরিবেশ জোরদার করা, যেন সব অঞ্চলে বৈশ্বিক প্রবাহের সুফল পৌঁছে যায়।

  • ঋণ, এআই ও বাণিজ্য অনিশ্চয়তা থেকে সৃষ্ট ঝুঁকি সমন্বিত বৈশ্বিক ও জাতীয় নীতির মাধ্যমে প্রশমিত করা।