২০২৭ সালে বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া এফটিএ হবে, ঢাকায় আলোচনা শুরু

আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে তিন দিনব্যাপী প্রথম দফার আলোচনা উদ্বোধন করেন বাণিজ্যসচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। উদ্বোধনী অধিবেশনে আলোচনার রূপরেখা ও কার্যপরিধি নির্ধারণে ‘টার্মস অব রেফারেন্স’ (টিওআর) স্বাক্ষরিত হয়
ছবি– বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সৌজন্যে

বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২৭ সালের মধ্যে চুক্তি চূড়ান্ত করতে চায় উভয় দেশ। চুক্তি হলে দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ তৈরি হবে।

আজ মঙ্গলবার সকালে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে তিন দিনব্যাপী প্রথম দফার আলোচনা উদ্বোধন করেন বাণিজ্যসচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী। উদ্বোধনী অধিবেশনে আলোচনার রূপরেখা ও কার্যপরিধি নির্ধারণে ‘টার্মস অব রেফারেন্স’ (টিওআর) স্বাক্ষরিত হয়।

অনুষ্ঠানে মালয়েশিয়ার ৩১ সদস্যের প্রতিনিধিদলের প্রধান রশিদি সাইদ এবং বাংলাদেশের দলের প্রধান ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খাদিজা নাজনীনসহ দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যসচিব শরফ উদ্দিন আহমদ চৌধুরী বলেন, ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব আর অভিন্ন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ভিত্তিতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ক দৃঢ় হয়েছে। দুই দেশের বিদ্যমান বাণিজ্য সম্পর্ক আশাব্যঞ্জক হলেও বাণিজ্য বহুমুখীকরণ ও বিনিয়োগের বিপুল সম্ভাবনা এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো যায়নি।

বাণিজ্যসচিব জানান, গত জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরকালে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে ২০২৭ সালের মধ্যে টেকসই ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার বিষয়ে আলোচনা হয়। প্রথম দফার আনুষ্ঠানিক আলোচনার মধ্য দিয়ে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হলো।

বাণিজ্যসচিব বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে এফটিএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশ মালয়েশীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্ভাবনাময় বাজার বলে উল্লেখ করেন বাণিজ্যসচিব। তিনি বলেন, হালাল শিল্প, অর্ধপরিবাহী বা সেমিকন্ডাক্টর খাতে দক্ষতা উন্নয়ন, ডিজিটাল বাণিজ্য, পণ্য পরিবহন, সরবরাহব্যবস্থা ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে। আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোট রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে আকাঙ্ক্ষা, তার প্রতি মালয়েশিয়ার সমর্থনের জন্যও তিনি কৃতজ্ঞতা জানান।

মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিদলের প্রধান রশিদি সাইদ বলেন, প্রস্তাবিত এফটিএ কেবল শুল্ক কমানোর চুক্তি নয়; এটি দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি ও ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব প্রতিষ্ঠার কৌশলগত উদ্যোগ।

রশিদি সাইদ জানান, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল প্রায় ২ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন বা ২৮৪ কোটি মার্কিন ডলার। চুক্তি কার্যকর হলে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শিল্পায়ন ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।

পারস্পরিক সমঝোতা, নমনীয়তা ও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে আলোচনা শেষ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন রশিদি সাইদ। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন বাংলাদেশ সফরে এ প্রক্রিয়া আরও গতিশীল হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।

বাংলাদেশের আলোচনা দলের প্রধান খাদিজা নাজনীন বলেন, এফটিএ কার্যকর হলে দুই দেশের বাজার আরও উন্মুক্ত হবে, কমবে বাণিজ্যবাধা। সেই সঙ্গে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি হবে। বাণিজ্যিক কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও সহজ হবে। বিষয়গুলো আগে থেকে অনুমান করা সম্ভব হবে।

খাদিজা নাজনীন আরও বলেন, আলোচনায় পণ্য ও সেবাবাণিজ্য, পণ্যের উৎপত্তিবিধি ও শুল্কসংক্রান্ত প্রক্রিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দুই দেশের স্বার্থ রক্ষা করে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

কত দেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার সঙ্গে এফটিএ

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্যানুসারে, বর্তমানে মালয়েশিয়ার সঙ্গে ভারত, পাকিস্তানসহ প্রায় ১৪টি দেশের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) রয়েছে। প্রায় এক দশক বাংলাদেশের সঙ্গে এফটিএ করার জন্য নানা সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৫ সালের আগস্টের মাঝামাঝি মালয়েশিয়া সফর করেন। এর পর থেকে দুই দেশের মধ্যে এফটিএ নিয়ে আবার আলোচনা শুরু হয়। এরপর নির্বাচিত সরকারের আমলে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হলো।

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়া পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে ২০ থেকে সর্বোচ্চ ৩০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা। অথচ ভারত, চীন ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশগুলো শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কসুবিধায় দেশটিতে পণ্য রপ্তানি করছে। বাংলাদেশের সঙ্গে এফটিএ হলে শুল্ক কমবে। তবে তার সুবিধা নিতে হলে নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির প্রথম দফার আলোচনা ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে।