আইএমএফের লোগো
আইএমএফের লোগো

আইএমএফের কাছে ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি নতুন ঋণ চায় বাংলাদেশ

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচিতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ইতিমধ্যে এ ঋণ নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। নতুন কর্মসূচির আকার হতে পারে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলারের সমান।

পাশাপাশি আইএমএফের চলমান ঋণ কর্মসূচি এগিয়ে নিতে চায় না বাংলাদেশ—সরকারের তরফ থেকে আইএমএফকে তা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার আইএমএফের প্রতিনিধিদের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সরকারের বেশ কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ভার্চ্যুয়াল বৈঠক করেন। সেখানেই সরকারের এই মনোভাবের কথা জানানো হয় বলে সূত্রগুলো বলছে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ওই দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার ও এর সঙ্গে সম্পর্কিত শীর্ষ পর্যায়ের আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে আইএমএফের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল বৈঠক করেন।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, চলমান কর্মসূচিটিকে এগিয়ে না নেওয়ার আগ্রহের কথা বাংলাদেশ গত এপ্রিলে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকেই প্রাথমিকভাবে জানিয়ে এসেছিল। এরপর আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক কয়েক দফা ভার্চ্যুয়াল বৈঠক হয়েছে উভয় পক্ষের।

চলমান ঋণ কর্মসূচি থেকে সরে আসার বিষয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছ থেকে চেয়েও কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে আজ সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ২১ মে আইএমএফের সঙ্গে সরকারের একটি নতুন কর্মসূচি গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা হয়। কর্মসূচির মেয়াদ হবে তিন বছর। এ সময়ের মধ্যে অগ্রাধিকারমূলক ও বাস্তবায়নযোগ্য সংস্কারগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং ধাপে ধাপে সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হবে। বৈঠকে আইএমএফর ডিএমডি নাইজেল ক্লার্ক নতুন কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগকে স্বাগত জানান।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, চলমান কর্মসূচিটি ভিন্ন অর্থনৈতিক ও নীতিগত পরিপ্রেক্ষিতে গ্রহণ করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে উদ্ভূত দেশি প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে কিছু সংস্কার বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়। সরকার সংস্কার থেকে সরে আসতে চায় না বরং বাস্তবসম্মত, ধাপে ধাপে এবং দেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে আগ্রহী।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চলমান কর্মসূচি থেকে বের হওয়ার জন্য মোটা দাগে কিছু বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে। যেমন রাজস্ব আদায় বৃদ্ধিসহ ভ্যাট সংস্কার, করছাড় কমানো এবং কর প্রশাসন আধুনিকায়নের বিষয়ে শর্ত পূরণে বাংলাদেশের অগ্রগতি কম। আবার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক মুদ্রা বিনিময় হারও চালু হয়নি এখনো। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানোর পথেও যায়নি বাংলাদেশ।

এ ছাড়া ব্যাংক খাত সংস্কার ও সুশাসন ব্যবস্থায় বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, মালিকানা ও পরিচালনায় সুশাসন ইত্যাদি বিষয়ে অগ্রগতি নিয়ে আইএমএফের অসন্তোষ আছে। বিশেষ করে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন নিয়ে এরই মধ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। বিভিন্ন কিস্তি ছাড়ের পর্যালোচনা করার সময় এসব বিষয়ে আইএমএফ তাদের এসব অবস্থান জানিয়েছে।

আনুষ্ঠানিক চিঠি যাবে আইএমএফে

বসন্তকালীন বৈঠক থেকে ফিরে আসার পর থেকে আইএমএফের সঙ্গে নতুন ঋণ কর্মসূচি শুরু করার আগ্রহের কথা জানিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। বৃহস্পতিবার আইএমএফ সম্মতি দেওয়ার পর অর্থ মন্ত্রণালয় এখন সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে নীতিগত অনুমোদন নেবে।

অনুমোদন পাওয়ার পর চলমান কর্মসূচি থেকে বের হয়ে নতুন ঋণ কর্মসূচি শুরু করার বাস্তবতা ও যৌক্তিকতা তুলে ধরে আইএমএফকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেবে বাংলাদেশ। নতুন ঋণ কর্মসূচির আকার হতে পারে ৪০০ থেকে ৪৫০ কোটি মার্কিন ডলার।

নতুন ঋণ কর্মসূচিতেও বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের শর্ত থাকবে। শর্তের ব্যাপারে আলোচনা করতে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাই বা তার পরের মাস আগস্টে ঢাকায় আইএমএফের একটি মিশন আসার কথা রয়েছে। সেই মিশন ওয়াশিংটনে ফিরে গিয়ে আইএমএফের কাছে প্রতিবেদন দেবে, সেখানেই উঠে আসবে নতুন ঋণ কর্মসূচির সার্বিক দিক।

যোগাযোগ করলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা প্রথম আলোকে জানান, চলমান কর্মসূচির মেয়াদ আর এক বছরও নেই। এই সময়ের মধ্যে অবশ্য পালনীয় শর্তগুলো পূরণের বাস্তবতা কম। নতুন কর্মসূচি হলে বর্তমান সরকারের পক্ষে সংস্কার কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়ন করা সহজতর হবে। সে কারণেই নতুন কর্মসূচির দিকে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছে বাংলাদেশ এবং আইএমএফ বাংলাদেশের বাস্তবতা অনুধাবন করেছে।

যোগাযোগ করলে বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার আসলে কিছু ‘সময়’ কিনছে। চলমান কর্মসূচির আওতায় যেসব সংস্কারকাজ বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করতে পারেনি, নতুন কর্মসূচিতে যে সেগুলো থাকবে না, তা কিন্তু নয়। বাংলাদেশের নিজের জন্যই এগুলো করা দরকার।

জাহিদ হোসেন বলেন, ‘চলমান কর্মসূচির কোন বিষয়ের সঙ্গে সরকার একমত নয়, কোন কর্মসূচি জাতীয় স্বার্থের বিপক্ষে রয়েছে, কোনটার সঙ্গে সরকারের দ্বিমত আছে, তা কিন্তু পরিষ্কার নয়। এখন দেখতে হবে নতুন কর্মসূচির আওতায় বিষয়বস্তু (কনটেন্ট) কী আছে। সময় কেনা অর্থাৎ একই কাজ করার জন্য বেশি সময় পাওয়া ছাড়া নতুন কর্মসূচি থেকে বাড়তি কোনো সুবিধা পাওয়া যাবে বলে আমার মনে হচ্ছে না।’

কেন ঋণ নিতে হয়েছিল

জরুরি ভিত্তিতে লেনদেনের ভারসাম্য বজায় রাখা ও বাজেট সহায়তা বাবদ আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ চেয়ে ২০২২ সালের ২৪ জুলাই আইএমএফে চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ। ৪৭০ কোটি মার্কিন ডলারের সমান ঋণ চাওয়া হয় তিন ধরনের অর্থাৎ বর্ধিত ঋণ সহায়তা (ইসিএফ), বর্ধিত তহবিল সহায়তা (ইএফএফ) ও রেজিলিয়েন্স অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ফ্যাসিলিটি (আরএসএফ)। ৪২ মাসে ৭ কিস্তিতে এ ঋণের গড় সুদের হার ২ শতাংশের কম।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি আইএমএফ পর্ষদ এ প্রস্তাব অনুমোদন করে। মাঝে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ২০২৫ সালের জুনে ৮০ কোটি ডলার বেড়ে ঋণ কর্মসূচির আকার ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়। আইএমএফ থেকে এখন পর্যন্ত ৫ কিস্তিতে বাংলাদেশ পেয়েছে ৩৬৪ কোটি ডলার। বাকি ছিল ১৮৬ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের গত অক্টোবরে আইএমএফের বার্ষিক সভায় ষষ্ঠ কিস্তির অর্থ পাওয়ার আলোচনা বাংলাদেশ তুললেও আইএমএফ তাতে সম্মত হয়নি।

আইএমএফের বরাতে তখনকার অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করবে আইএমএফ। এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার গঠিত হয়। গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান ও অন্য কর্মকর্তাদের নিয়ে নতুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক-আইএমএফের বসন্তকালীন বৈঠকে অংশ নেন। এ বৈঠকেও কিস্তি ছাড়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।