জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ। বদলে যাওয়া আড্ডার ধরন আর ক্রমাগত নগরায়ণের হাত ধরে দেশের কোমল পানীয়র চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। একসময় কোমল পানীয় মানেই ছিল পারিবারিক অনুষ্ঠান বা অতিথি আপ্যায়নের অনুষঙ্গ; এখন বন্ধুদের আড্ডা, অফিসের বিরতি কিংবা যেকোনো করপোরেট আয়োজন আর গেট টুগেদারে কোমল পানীয়, জুস বা এনার্জি ড্রিংকের উপস্থিতি যেন স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এতে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কোমল পানীয়র বাজার, যা ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে কয়েক বছর হলো। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নগরায়ণ ও তরুণ প্রজন্মের বদলে যাওয়া জীবনযাত্রার হাত ধরে পাঁচ বছরের মধ্যে এই খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১২ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে বিশাল সম্ভাবনার পাশাপাশি খাতটি নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আছে। উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি ও বারবার করনীতি পরিবর্তনের ফলে ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ পড়ছে, এতে এ খাতের প্রবৃদ্ধি এক অঙ্কের ঘরে ঘোরাফেরা করছে।
এর সঙ্গে বৈশ্বিক উত্তপ্ত ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি, দেশের বাজারে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামা এবং জ্বালানিসংকটে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহন খরচ বাড়ায় উৎপাদনেও প্রভাব পড়েছে। কনসেনট্রেট, কিছু খাদ্য উপাদান এবং প্যাকেজিং–সামগ্রী এখনো আমদানির ওপর ভর করেই চলছে।
একই সঙ্গে দেশের ভেতরেও চিনি, পিইটি বোতল, ক্যাপ, কার্টন, বিদ্যুৎ, গ্যাস, শ্রম ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে উৎপাদন ব্যয় ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে; তবে ক্রেতার সক্ষমতায় দাম বাড়ানোর সুযোগ বরাবরের মতো রয়েছে সীমিত।
গেল চার বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে ভোক্তার নাগালের মধ্যে কোমল পানীয় রাখতে এ খাত–সংশ্লিষ্টদের মান ও খাদ্যনিরাপত্তা অক্ষুণ্ন রাখাই বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
ছোট ও সাশ্রয়ী মূল্যের পণ্য বাজারজাত করে আর উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় দক্ষতা বাড়িয়ে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রেখে বাজারে টিকে থাকতে হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের রুচি ও চাহিদা মাথায় রেখে নতুন স্বাদ, আকর্ষণীয় প্যাকেজিং এবং উদ্ভাবনী পণ্য তৈরির সুযোগও দেখছেন খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) চিফ মার্কেটিং অফিসার (সিএমও) কাজী মো. মহিউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশের কোমল পানীয় ও বেভারেজ শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি সম্ভাবনা যথেষ্ট শক্তিশালী। বিশাল জনগোষ্ঠী, তরুণ ভোক্তাশ্রেণি, নগরায়ণ এবং পরিবর্তিত জীবনযাত্রা এ বাজারের প্রবৃদ্ধির বড় ভিত্তি।
তবে বর্তমানে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং ভোক্তার ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ—দুই দিক থেকেই শিল্পটি নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।
চ্যালেঞ্জের এই সময়ে বাজারে টিকে থাকতে কী করতে হচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে ছোট ও সাশ্রয়ী প্যাকেজ, উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায় দক্ষতা বৃদ্ধি এবং যেখানে সম্ভব স্থানীয় কাঁচামাল ও প্যাকেজিং–সামগ্রীর ব্যবহার বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের ভোক্তাদের জন্য নতুন স্বাদ, আকর্ষণীয় প্যাকেজিং এবং পরিবর্তিত চাহিদার উপযোগী পণ্য তৈরিতে উদ্ভাবনের বড় সুযোগ রয়েছে।
কোমল পানীয়র বাজার সম্প্রসারণ হতে হতে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ, বদলে যাওয়া জীবনযাত্রা ও আড্ডার ধরনের কারণে বোতলজাত পানি, কার্বোনেটেড পানীয়, এনার্জি ড্রিংক, দুগ্ধজাত পানীয় ও চা-কফির মতো বৈচিত্র্যময় পণ্যের চাহিদা বেড়েছে ব্যাপকভাবে।
অতীতে বছরে গড়ে ২০ শতাংশ হারেও এ খাতের প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) করনীতি কাঠামো বারবার বদলে দিয়ে যেমন এ খাতের প্রবৃদ্ধি আটকে দিয়েছে, তেমনি প্রভাব পড়েছে রাজস্ব আদায়ের হালচিত্রেও।
বর্তমানে কোমল পানীয় থেকে সরকার নানাভাবে রাজস্ব আদায় করে থাকে। সবচেয়ে বেশি আদায় হয়ে থাকে মূল্য সংযোজন কর মূসক বা ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক থেকে।
ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক থেকে আদায়ের তথ্য বলছে, এনবিআর ২০২০-২১ অর্থবছরে কোমল পানীয় খাতে রাজস্ব আদায় করেছে ১ হাজার ৭২ কোটি টাকা, ২০২১-২২ অর্থবছরে ১ হাজার ১৪৪ কোটি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১ হাজার ৫৩৩ কোটি এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা।
উচ্চ সম্পূরক শুল্ক সত্ত্বেও রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি না হয়ে উল্টো কমে যাওয়ার মূলে ছিল ওই অর্থবছরে টার্নওভার কর দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩ শতাংশ করা। টার্নওভার কর বোঝায় ন্যূনতম কর। প্রতিষ্ঠানের মুনাফা হোক বা না হোক, বার্ষিক বিক্রির ওপর ৩ শতাংশ হারে বাড়তি কর দিয়ে যেতে হবে। এতে এ খাতের প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় রাজস্ব আদায়ে ভাটা দেখা যায়।
এনবিআর ওই সময়ে করছাড় না দিয়ে উল্টো রাজস্ব আদায় বাড়াতে সম্পূরক শুল্ক ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করা হয়। এতে মোট করভার ৫০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতে এ হার ৪০ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৩০ শতাংশের মতো, নেপালে ৩৮ শতাংশের মতো এবং ভুটানে ৩০ শতাংশ রয়েছে কেবল।
পরে রাজস্ব আদায় কমে যাওয়া এবং ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে টার্নওভার কর ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে আড়াই শতাংশ করা হয়।
কোমল পানীয় উৎপাদনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ বেভারেজ ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, ১৩০টির বেশি কোম্পানি দেশে পানি, কোমল পানীয় ও অন্যান্য বেভারেজ তৈরি করছে, যার বাজার বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে এবং বিভিন্ন পর্যায়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আগামী দিনগুলোতে প্রচণ্ড তাপপ্রবাহ আরও বাড়বে; এতে কোমল পানীয়র জ্যামিতিক হারে বাড়বে চাহিদাও। এই প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা থেকে দেশি ও আন্তর্জাতিক বেভারেজ কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ আরও বাড়াচ্ছে। এ খাতে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
দেশে বর্তমানে পেপসিকো ও কোকা-কোলার মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ট্রান্সকম বেভারেজেস, প্রাণ, আব্দুল মোনেম, মেঘনা ও আকিজ ভেঞ্চারের মতো দেশীয় কোম্পানিগুলোও বাজারে নিজেদের অবস্থান দিন দিন শক্ত করছে।
নানামুখী চ্যালেঞ্জের মধ্যেও বাজার সম্ভাবনায় এমজিআইর সিএমও কাজী মো. মহিউদ্দিন বলেন, ‘বাংলাদেশের বৃহৎ ও তরুণ ভোক্তাবাজার এ খাতের অন্যতম বড় শক্তি। দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং দক্ষতা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে মানসম্পন্ন পণ্য সাধারণ ভোক্তার নাগালের মধ্যে রাখা।’
এ শিল্পের সম্ভাবনা সামনে রেখে সহায়ক নীতিকাঠামো তৈরি ও ঘন ঘন করকাঠামো পরিবর্তন না করার পরামর্শ খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। না হলে চাহিদা বাড়লেও বিনিয়োগ ও সরবরাহ সক্ষমতা সেই গতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে না বলে শঙ্কা তাদের।
শিল্পসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী ও সরকারের মধ্যে নিয়মিত সংলাপ এবং বিনিয়োগবান্ধব একটি কর পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এ খাতের টেকসই প্রবৃদ্ধি হবে এবং এতে বাড়তি রাজস্ব আদায় হবে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।