
দেশের সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর ও জ্বালানি খাতের কৌশলগত অবকাঠামো ব্যবস্থাপনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য বাড়ছে। অথচ এই খাতে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছেন না। এটি দীর্ঘ মেয়াদে জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। তাই এসব খাতে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ন্যূনতম ৫১ শতাংশ দেশীয় মালিকানা এবং বাধ্যতামূলক প্রযুক্তি হস্তান্তরের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর বনানীর একটি হোটেলে সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ (সিএসআর) আয়োজিত ‘কৌশলগত সম্পদে দেশীয় বিনিয়োগের অগ্রাধিকার’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এ কথা বলেন। বক্তারা কৌশলগত অবকাঠামোতে বিনিয়োগের জন্য উন্মুক্ত দরপত্রে দেশীয় কোম্পানির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানান। পাশাপাশি একটি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত স্বাধীন বন্দর নিয়ন্ত্রক সংস্থা গঠনেরও সুপারিশ করেন তাঁরা।
গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি (জোনায়েদ সাকি), সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুল, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, সাবেক সচিব আবু আলম মোহাম্মদ শহীদ খান, কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সাবেক পরিচালক আবু তাহের খান, ঢাকা স্ট্রিমের উপদেষ্টা সম্পাদক হাসান মামুন প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিএসআরের নির্বাহী পরিচালক সাকিব আনোয়ার। তিনি জানান, সুযোগ পেলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আন্তর্জাতিক মানের চেয়েও ভালো পারদর্শিতা দেখাতে পারে। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ৪৯ দিনে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল) পূর্ববর্তী অপারেটরের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বেশি কনটেইনার ব্যবস্থাপনা করেছে। অথচ এই এনসিটিকেও দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
মূল প্রবন্ধে আরও বলা হয়, চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনা নিয়ে বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি দেশ—সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড ও সৌদি আরবের আরএসজিটি কোম্পানি সরাসরি প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বিদেশি এই দুই কোম্পানির চেয়ে বন্দরকে বেশি রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব করেছে দেশি প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপ। তা সত্ত্বেও সরকার বিদেশিদের নিয়েই মূল্যায়ন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের (এফডিআই) নামে মূলত দেশীয় অর্থ ও ঋণের ব্যবহার হচ্ছে বলে জানান সাকিব আনোয়ার। তিনি বলেন, পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালে (পিসিটি) বিদেশি অপারেটরের ১৭০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মধ্যে ১০০ মিলিয়ন ডলার বা ৫৯ শতাংশই এসেছে দেশীয় ও আঞ্চলিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ থেকে।
অর্থনীতিতে গতিশীলতা আনতে বিদেশি বিনিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে বলে জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি। তিনি বলেন, অনেক ক্ষেত্রে প্রযুক্তি হস্তান্তর না হলে বিদেশি বিনিয়োগ ইতিবাচক প্রভাব ফেলে না এবং মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ না হয়ে বিদেশে চলে যায়। আমাদের লক্ষ্য হলো বিদেশি বিনিয়োগকে এমনভাবে কাজে লাগানো, যাতে দেশের নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি হয়।
জোনায়েদ সাকি আরও বলেন, সরকার দুটি প্রধান বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছে। তার একটি হলো ব্যবসা সহজ করা, অন্যটি ব্যবসার খরচ কমিয়ে আনা। একটি মাঝারি মানের ব্যবসায় উদ্যোগ নিতে গেলেও একজন উদ্যোক্তাকে এত অফিস ঘুরতে হয় এবং এত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় যে তার বিনিয়োগের বড় অংশ ও সময় সেখানেই ব্যয় হয়ে যায়। ধৈর্যচ্যুতি ঘটে। এই জায়গায় বড় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘চুরি-লুটপাট আমাদের অস্থিমজ্জায় মিশে গেছে। এই বিষয়ই আমাদের এখন প্রধান শত্রুতে পরিণত হয়েছে। এ জন্য সর্বস্তরে পেশাদারি, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি বন্ধে বেশি নজর দিতে হবে।’
সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত বিদেশিদের সঙ্গে নিরাপত্তা ইস্যু ছাড়া যত চুক্তি সই হয়েছে, তার সব কটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত। সংবিধান অনুযায়ী জনগণের এসব চুক্তি সম্পর্কে জানার অধিকার রয়েছে।