নেত্রকোনা বিসিক

১৪ বছরেও গ্যাস মেলেনি, বন্ধ হচ্ছে কারখানা

গ্যাসের অভাবে ৪৪টি বড় শিল্প চালু করা যাচ্ছে না। ১৪ বছরে ২৬টি চালু হলেও একে একে সেগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) নেত্রকোনা শিল্পনগরে দীর্ঘ ১৪ বছরেও গ্যাস দেওয়া হয়নি। যে কারণে অধিকাংশ প্লটেই কারখানা চালু হয়নি। আবার যেসব কারখানা চালু হয়েছিল, সেগুলোও এক এক করে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। এতে কারখানার দামি যন্ত্রপাতি নষ্ট হচ্ছে। উদ্যোক্তারাও বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করে হাত গুটিয়ে বসে আছেন। তাঁরা এখন দ্রুত গ্যাস সরবরাহের দাবি জানাচ্ছেন।

বিসিকের স্থানীয় কার্যালয়ের তথ্যানুসারে, এ শিল্পনগরে ৭০টি শিল্প প্রকল্পের জন্য ১০৩টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়। গত ১৪ বছরে চালু হয়েছে মাত্র ২৬টি কারখানা। এর মধ্যে ছয়টি খাদ্য ও খাদ্যজাত; তিনটি করে আয়রন ও অ্যালুমিনিয়াম, প্লাস্টিক ক্যান, পশুখাদ্য ও ওষুধ; দুটি করে কেমিক্যাল ও গার্মেন্টস, প্লাস্টিক রিসাইক্লিং; একটি করে বিকল্প জ্বালানি, জুতা, মশার কয়েল, মসলা ও খনিজ পানি উৎপাদনের কারখানা। বাকি ৪৪টি প্লট বস্ত্র ও বস্ত্রজাত; প্রকৌশল, রসায়ন ও ওষুধ; প্লাস্টিক-রবার ও নন-মেটাল; ইট, খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাত পণ্য তথা বড় শিল্প প্রকল্প স্থাপনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু প্রকল্পগুলো গ্যাসনির্ভর হওয়ায় আজও চালু করা সম্ভব হয়নি।

কর্মকর্তারা জানান, এ শিল্পনগরে এখন পর্যন্ত ৭০ জন শিল্পোদ্যোক্তা ৭২ কোটি ২০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। চালু হওয়া ২৬ কারখানা ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রায় ২৫ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করেছে। এতে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ১ কোটি ২৯ লাখ টাকা। বড় শিল্পকারখানাগুলো চালু হলে সরকারের রাজস্ব আদায় অন্তত ১০ গুণ বাড়বে। চালু হওয়া কারখানাগুলোতে ৬৫০ জন শ্রমিক কাজ পেয়েছেন। সব কারখানা চালু হলে মোট কর্মসংস্থান দাঁড়াবে পাঁচ হাজার।

সম্প্রতি সরেজমিনে জানা যায়, গ্যাস সরবরাহ না থাকায় চালু হওয়া কয়েকটি কারখানা এখন বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছে। কিন্তু এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে, যা পণ্যের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। খাদ্য উৎপাদনকারী প্রিয়া ফুড ইন্ডাস্ট্রিজের স্বত্বাধিকারী তপন পাল বলেন, ‘গ্যাস না থাকায় আমরা জ্বালানি হিসেবে কাঠের ভুসি ব্যবহার করছি। ভুসির দাম বেশি। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। তাই আশানুরূপ লাভ হচ্ছে না।’

এ এল আকন্দ ফ্যাশন নামের পোশাক কারখানার মালিক জহিরুল হাসান আকন্দ বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহ না থাকায় আমরা ওয়াশিং সিস্টেম চালু করতে পারিনি। প্যান্ট, গেঞ্জি ইত্যাদি তৈরির পর গাজীপুরে পাঠিয়ে ওয়াশ করিয়ে আনতে হয়। এতে পরিবহন ও ওয়াশিং বাবদ বাড়তি খরচ গুনতে হয়। সময়ও নষ্ট হয়।’

মাহিতাজ আয়রন ইন্ডাস্ট্রিজের উদ্যোক্তা আজিজুল হক তালুকদার জানান, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তিনি ওই কারখানা চালু করেছিলেন। গ্যাস সরবরাহ না থাকায় তিনি জ্বালানি হিসেবে লাকড়ি ব্যবহার করতেন। কিন্তু লাভের মুখ দেখতে পারেননি। তাই কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন।

একই কারণে বন্ধ হয়ে গেছে আতিকুল ইসলামের বিসমিল্লাহ মুড়ি, আবদুস সালামের পোলার বেকারি, সাইদুল ইসলামের কয়েল ফ্যাক্টরিসহ আরও কয়েকটি কারখানা।

তা ছাড়া বিসিক শিল্পনগরের পুরোটাই অরক্ষিত। অনেক স্থানেই সীমানা দেয়াল নেই। ভেতরের রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা। শিল্পবর্জ্য পরিশোধনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় আশপাশের ডোবানালায় গিয়ে তা পড়ছে। এতে পরিবেশদূষণ হচ্ছে।

নেত্রকোনা বিসিক শিল্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল হাসান আকন্দ বলেন, গ্যাস না থাকায় ৪৪টি কারখানা এখনো চালু করা যাচ্ছে না। এসব কারখানার মালিকেরা কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে এখন হতাশায় ভুগছেন।

এ ব্যাপারে বিসিকের জেলা কার্যালয়ের উপব্যবস্থাপক আকরাম হোসেন বলেন, ‘এ শিল্পনগর প্রতিষ্ঠার সময় উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) গ্যাস সরবরাহের বিষয়টি উল্লেখ ছিল না। পরবর্তীকালে সেটির প্রয়োজন দেখা দিলে তিতাস গ্যাস কোম্পানি এখান থেকে তাদের সাবস্টেশন পর্যন্ত গ্যাসলাইন স্থাপনে ৯ কোটি ২৯ লাখ টাকার একটি প্রস্তাব তৈরি করে। ২০১৬ সালে তিতাসের এমডি প্রস্তাবটি পেট্রোবাংলায় পাঠান। ওই বছরেই পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এ প্রস্তাব জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠান। কিন্তু এরপর আর ফাইলটি এগোয়নি।’

জেলা প্রশাসক কাজি মো. আবদুর রহমান বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহ না থাকায় শিল্পনগরের অনেক কারখানা চালু হচ্ছে না, এটা সত্য। বিষয়টির দ্রুত সমাধানের জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়, খনিজ সম্পদ বিভাগ, বিসিক ও তিতাস গ্যাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছি। আশা করা যাচ্ছে, প্রতিকার মিলবে।’