
* নির্ধারিত ভ্যাট আরোপ হলে এই খাত থেকে ৪০০ কোটি টাকার মতো ভ্যাট আদায় হতে পারে। বর্তমানে ভ্যাট আদায় হচ্ছে ১৫০ কোটি টাকারও কম।
* দেশের বাজারে এখন ২২ ক্যারেট মানের প্রতি ভরি সোনার দাম প্রায় ২ লাখ ২৯ হাজার টাকা।
দেশে এখন সোনা বা অলংকার কেনাবেচার ক্ষেত্রে মোট বিক্রয় মূল্যের ওপর ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ধার্য রয়েছে। সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় এই পদ্ধতিতে ভ্যাটের টাকার পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। ফলে এ পদ্ধতিতে যথাযথভাবে ভ্যাট আদায় হচ্ছে না। তাই ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে শতাংশের বদলে ফিক্সড ভ্যাট নির্ধারণ করতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ ক্ষেত্রে ভরিপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা ভ্যাট আরোপ করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে।
দেশের বাজারে বর্তমানে ২২ ক্যারেট মানের এক ভরি সোনার দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ২৯ হাজার টাকায়। এ দামে সোনা কিনলে এখন প্রতি ভরিতে ৫ শতাংশ হারে ক্রেতাকে ভ্যাট দিতে হচ্ছে প্রায় সাড়ে ১১ হাজার টাকা। আগামী বাজেটে নির্ধারিত অঙ্কের ভ্যাট কার্যকর হলে তাতে প্রতি ভরি সোনা কিনতে গ্রাহককে দিতে হবে পাঁচ হাজার টাকা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, সোনার দাম বেশি হওয়ায় এখন বেচাবিক্রি এমনিতে কম। তার ওপর ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা গ্রাহকের ওপর বাড়তি চাপ। এ কারণে যথাযথ ভ্যাট আদায় হচ্ছে না। এখন নির্ধারিত হারে ভ্যাট আরোপ করা হলে তাতে আদায় কিছুটা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও রাজস্ব খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
আমরা শতভাগ ভ্যাট আদায় করতে চাই। তাই নির্ধারিত অঙ্কের ন্যূনতম ভ্যাট আরোপ করা হলে ক্রেতার জন্যও তা চাপ হবে না। এতে আদায়ও বাড়বে।—এনামুল হক খান, সভাপতি, বাজুস।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে এই খাত থেকে ১৫০ কোটি টাকার কম ভ্যাট আদায় হয়। নির্ধারিত ভ্যাট আরোপ করা হলে তাতে এই খাত থেকে ৪০০ কোটি টাকার মতো ভ্যাট আদায় হতে পারে। ব্যবসায়ীরা এরই মধ্যে সেই অঙ্গীকারও করেছেন। তাই নির্ধারিত অঙ্কের ভ্যাট আরোপ করা হলে তা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের জন্যই উইন-উইন বা লাভজনক হবে।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, সর্বশেষ গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সোনা বেচাকেনা থেকে সরকার ভ্যাট আদায় করেছিল ১৩৮ কোটা টাকা। যদিও দেশে জুয়েলারি দোকান আছে প্রায় ৪০ হাজার।
বাজেট সামনে রেখে এনবিআরের সঙ্গে প্রাক্–বাজেট আলোচনায় স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের বা ফিক্সড ভ্যাটের প্রস্তাব করা হয়। গত ১৩ মে একই দাবি জানিয়ে সংগঠনটি অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দেয়। সেই চিঠিতে নির্ধারিত অঙ্কের ভ্যাট আরোপ করা হলে তাতে এই খাত থেকে বছরে ৪০০ কোটি টাকা ভ্যাট আদায়ের কথা বলা হয়।
চিঠিতে বলা হয়, দেশের ৪০ হাজার জুয়েলারির মধ্যে আট হাজার প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট নিবন্ধন আছে। নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দেড় হাজার প্রতিষ্ঠান নিয়মিত ভ্যাট দেয়। ন্যূনতম ভ্যাট আরোপ করা হলে অনেক প্রতিষ্ঠান ভ্যাটের আওতায় আসবে বলে চিঠিতে জানানো হয়। বেশি সংখ্যক প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতায় আনতে ভরিতে দুই হাজার টাকা ভ্যাট নির্ধারণের দাবি জানায় বাজুস।
এ বিষয়ে বাজুসের সভাপতি এনামুল হক খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘এখন ১০ শতাংশ ভ্যাটও আদায় হয় না; কিন্তু আমরা শতভাগ ভ্যাট আদায় করতে চাই। তাই নির্ধারিত অঙ্কের ন্যূনতম ভ্যাট আরোপ করা হলে ক্রেতার জন্যও তা চাপ হবে না। এতে আদায়ও বাড়বে।’
এনামুল হক খান আরও বলেন, বিদেশে থেকে সোনা কিনে আনলে কোনো ভ্যাট দিতে হয় না। তাই মানুষ এখন বিদেশে গেলে সেখান থেকে সোনা কিনে আনেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে বড় বড় শপিং মলের বাইরের অধিকাংশ সোনার দোকানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই। তাদের ভ্যাটের আওতায় আনতে সরকারকে সহায়তা করতে আগ্রহী বাজুস। এ বিষয়ে বাজুসের সাবেক সহসভাপতি ও ফেন্সি জুয়েলার্সের মালিক সমিত ঘোষ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঢাকার বাইরের অধিকাংশ দোকানের ভ্যাট নিবন্ধন নেই। নির্দিষ্ট অঙ্কের ভ্যাট আরোপ করা হলে আমরা ভ্যাট আদায় বাড়াতে সরকারকে সক্রিয় সহায়তা করব।’
ভ্যাট বিশেষজ্ঞরা অবশ্য ন্যূনতম ভ্যাট আরোপের বিরোধিতা করছেন। তাঁরা বলছেন, বাজুস বড় সংগঠন হিসেবে সদস্যদের মধ্যে জনপ্রিয়তা পেতে এসব চিন্তার কথা বলছে; কিন্তু আদতে তারা ৪০ হাজার প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট দিতে বাধ্য করতে পারবে না।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ভ্যাট প্রফেশনালস ফোরামের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রউফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘৪০ হাজার প্রতিষ্ঠানের ওপর বাজুসের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তবে তারা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে পারবে না। তাই ন্যূনতম ভ্যাট বসিয়ে খুব বেশি সুফল পাওয়া যাবে বলে মনে করি না।’