ট্রাম্পের গায়ের স্যুটটি কি বাংলাদেশের

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পে গত সোমবার রাতে নীল রঙের একটি স্যুট গায়ে জড়িয়ে নেব্রাস্কায় এক নির্বাচনী সমাবেশে অংশ নেন। সমাবেশের একপর্যায়ে মঞ্চে তিনি দুই হাতে স্যুটটি বোতাম খুলে দাঁড়ান। তাতে স্যুটের ভেতরের একটি স্টিকার বা লেবেল সামনে চলে আসে। যেখানে লেখা ‘জোস এ ব্যাংক’। তার মানে, স্যুটটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের পোশাকের ব্র্যান্ড জোস এ ব্র্যান্ডের।

এদিকে ট্রাম্পের পরা ওই স্যুট নিয়ে দেশটির পুরুষদের পোশাকবিষয়ক লেখক এবং ট্রাম্পের পোশাক নিয়ে নিয়মিত সমালোচনা করা ডেরেক গাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে বলেন, জোস এ ব্যাংকের স্যুট এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তৈরি হয়। এসব দেশের মধ্যে চীন ও বাংলাদেশ রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, ব্র্যান্ডটির ‘জোসেফ অ্যাবুড’ নামে একটি সহযোগী লেবেলও রয়েছে, যার পোশাক যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি হয়।

ট্রাম্পের স্যুটটিতে ছিল গাঢ় নীল রঙের জ্যাকেট ও প্যান্ট, সাদা শার্ট এবং হালকা নীল টাই। সাধারণত তাঁকে লাল বা লাল নকশার টাই পরতে দেখা যায়। এবার সেই চেনা ধরন থেকে কিছুটা ব্যতিক্রম ছিল তাঁর পোশাক।

জোস এ ব্র্যান্ডের স্যুট পরে নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্পের উপস্থিতি নিয়ে একটি প্রতিবেদনও করেছে মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস। সেই প্রতিবেদনেও বলা হয়, জোস এ ব্যাংক সাধারণত চীন ও বাংলাদেশ থেকে স্যুট তৈরি করে। ট্রাম্প নিজে যখন যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদন বাড়ানো নিয়ে সোচ্চার তখন অন্য দেশে তৈরি স্যুট পরে নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে দেশটিতে নানা মহলে আলোচনা–সমালোচনা শুরু হয়।

ট্রাম্পের স্যুট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই বিতর্কে এসেছে বাংলাদেশেরও নাম। কারণ, যে ফ্যাশন ব্র্যান্ডের স্যুট ট্রাম্প পরেছিলেন, সেই ব্র্যান্ডের জন্য নিয়মিত স্যুট তৈরি করে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান অনন্ত গ্রুপ। তাই ট্রাম্পের স্যুটটি বাংলাদেশে তৈরি কি না, এ নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

অনন্ত গ্ৰুপের কারখানায় তৈরি ট্রাম্পের গায়ে জড়ানো একই রকমের স্যুট

স্যুট কি বাংলাদেশে তৈরি

বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শরীফ জহির গত শুক্রবার প্রথম আলোকে বলেন, নারায়ণগঞ্জের আদমজী ইপিজেডে তাঁদের গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সাল ম্যানসওয়্যারের কারখানায় এই স্যুট তৈরি হয়েছে। কারখানার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা তাঁকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।’ ইউনিভার্সাল ম্যানসওয়্যারের কারখানায় তৈরি একই ধরনের আরও কিছু স্যুটের সঙ্গে মিলিয়ে তিনি এ বিষয়ে আরও নিশ্চিত হন।

শরীফ জহির আরও জানান, ইউনিভার্সাল ম্যানসওয়্যার জোস এ ব্যাংক ব্র্যান্ডের জন্য ছয়–সাত বছর ধরে স্যুট তৈরি করে। প্রতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানটির কাছে ১০–১৫ হাজার পিস স্যুট রপ্তানি করে ইউনিভার্সাল ম্যানসওয়্যার।

এক লিখিত বক্তব্যে শরীফ জহির বলেন, ‘যে বিলিয়নিয়ার প্রেসিডেন্ট সোনা ও বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত, এমনকি হোয়াইট হাউসকেও সোনালি সাজে সাজিয়েছেন, তিনি যখন গর্বের সঙ্গে বাংলাদেশে তৈরি সাশ্রয়ী দামের স্যুট পরেন, তখন তা আমাদের কারিগরি দক্ষতা ও সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্পন্ন পোশাক তৈরির সক্ষমতার পরিচয় দেয়। এটি আমাদের দক্ষ শ্রমিক এবং গড়ে তোলা বিশ্বমানের পোশাকশিল্পের জন্য নিঃসন্দেহে গর্বের মুহূর্ত।’

স্যুটের দাম ৩৭৫ ডলার

গতকাল শরীফ জহির গাঢ় নীল রঙের স্যুটের কয়েকটি ছবি প্রথম আলোর এই প্রতিবেদককে পাঠান। সেখানে দেখা যায়, স্যুটের দাম ৩৭৫ ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় ৪৬ হাজার ১২৫ টাকা। তার মধ্যে স্যুটের জ্যাকেট ২৬০ ডলার। আর ট্রাউজারের দাম ১১৫ ডলার।

অনন্ত গ্ৰুপের কারখানায় তৈরি ট্রাম্পের গায়ে জড়ানো একই রকমের স্যুট

ট্রাম্পের পছন্দ কোন ব্র্যান্ড

২০১৬ সালে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস নিশ্চিত করেছিল, ওই বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্প ইতালির ব্র্যান্ড ব্রিওনির স্যুট পরতেন। পত্রিকাটি আরও জানায়, নিউইয়র্কভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মার্টিন গ্রিনফিল্ড ক্লথিয়ার্সের তৈরি স্যুটও রয়েছে ট্রাম্পের পছন্দের তালিকায়।

ট্রাম্প এখন নিয়মিত জোস এ ব্যাংকের স্যুট পরতে পছন্দ করেন কি না, তা স্পষ্ট নয়। যদি তিনি এই ব্র্যান্ডের স্যুট পরা শুরু করে থাকেন, তাহলে ব্রিওনির স্যুট থেকে তিনি কবে এই পরিবর্তন এনেছেন, সেটিও জানা যায়নি।

ট্রাম্প তাঁর ‘ট্রাম্প: থিঙ্ক লাইক আ বিলিয়নিয়ার’ বইয়ে লিখেছেন, তাঁর রিয়েলিটি টিভি অনুষ্ঠান ‘দ্য অ্যাপ্রেন্টিস’-এর জন্য ব্রিওনি তাঁকে স্যুট সরবরাহ করত। তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমি ব্রিওনির স্যুট পরি, যা দোকান থেকে সরাসরি কিনি।’

ওয়াশিংটন ডিসিতে ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে ব্রিওনির একটি বিক্রয়কেন্দ্র ছিল। ৩৭ কোটি ৫০ লাখ ডলারে হোটেলটি সিজিআই মার্চেন্ট গ্রুপের কাছে বিক্রি হওয়ার পর ২০২২ সালে ওই বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়।

ব্রিওনির ওয়েবসাইটে সবচেয়ে কম দামের স্যুটের মূল্য ৫ হাজার ৫০০ ডলার থেকে শুরু। সর্বোচ্চ দাম ১৬ হাজার ডলার পর্যন্ত। অন্যদিকে জোস এ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২৬০ ডলার দামেও তাদের স্যুট বিক্রি হয়। তবে কখনো মূল্য ছাড় দেওয়া হলে সে ক্ষেত্রে কিছু স্যুটের দাম কমে ১০০ ডলারের নিচে নেমে আসে।

ব্রিওনির স্যুটের দাম বেশি হওয়ার কারণ হলো, এগুলো হাতে তৈরি করা হয়। পাশাপাশি এতে ব্যবহার করা হয় উন্নত মানের এবং কখনো কখনো বিশেষভাবে সংগ্রহ করা উপকরণ। উচ্চপর্যায়ের গ্রাহকদের জন্য ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী পোশাক তৈরির বিশেষ সেবাও দেয় ইতালির ব্র্যান্ডটি।