গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকায় বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের গেট। এখানকার অনেক শ্রমিক এখন জীবিকার তাগিদে পেশা পরিবর্তন করেছেন
গাজীপুরের কাশিমপুর এলাকায় বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের গেট। এখানকার অনেক শ্রমিক এখন জীবিকার তাগিদে পেশা পরিবর্তন করেছেন

গাজীপুরের বেক্সিমকোর শ্রমিকদের কেউ এখন চা বিক্রি করেন, কেউ চালান অটোরিকশা

গাজীপুরের কাশিমপুরের সারাবো এলাকায় বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের কারখানা শ্রমিকদের অনেকেই পুরোনো পেশায় ফিরতে পারেননি। তাঁদের অনেকেই নতুন করে অন্য কোথাও চাকরি পাননি।

তাই জীবিকার তাগিদে তাঁরা বদলে ফেলেছেন পেশা। কেউ চা বিক্রি করছেন, কেউ বাজারে সবজি নিয়ে বসছেন, আবার কেউ অটোরিকশা চালাচ্ছেন। একসময় যাঁরা বেক্সিমকোর কারখানায় নিয়মিত বেতন পেতেন, তাঁদের অনেকেই এখন অনিশ্চিত আয়ের ওপর নির্ভর করে সংসার চালাচ্ছেন।

গাজীপুরের কাশিমপুরের সারাবো এলাকায় বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক। একসময় ভোর হলেই এই শিল্পপার্কের ফটকে জমত শ্রমিকদের ভিড়। উৎপাদনের ব্যস্ততায় মুখর থাকত পুরো এলাকা। এখন সেই চিত্র বদলে গেছে। কারখানার মূল ফটক বন্ধ। উৎপাদন লাইনে নেই শ্রমিক। বড় বড় ভবন ও যন্ত্রপাতি পড়ে আছে অলস। অল্পসংখ্যক প্রশাসনিক কর্মী ও নিরাপত্তাকর্মী দিয়ে কোনো কোনো স্থাপনা পাহারা দেওয়া হচ্ছে।

কারখানার ফটক বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু শিল্পপার্কের ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই। আশপাশ এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, এসব কারখানার শ্রমিকদের অনেকেই অন্য কোথাও চাকরি না পেয়ে তাঁদের অনেকেই এখন সংসার চালাতে বাধ্য হয়ে অন্য পেশা বেছে নিয়েছেন। তাঁরা কোনোরকমে সংসার চালাচ্ছেন। তাঁদের বেশির ভাগের আয় আগের চেয়ে কমেছে। বেড়েছে অনিশ্চয়তা।

শিল্প পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের বিভিন্ন কারখানায় একসময় প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক কাজ করতেন। ২০২৪ সালের শেষ দিকে এবং ২০২৫ সালের শুরুতে দফায় দফায় ছাঁটাইয়ের পর তাঁদের অধিকাংশই কর্মহীন হয়ে পড়েন।

২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের ১৪টি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়। কারখানাগুলো পুনরায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা শেষ পর্যন্ত সম্ভব হয়নি।

বেক্সিমকোর কারখানায় আগে চাকরি করতেন মো. সোলাইমান। কয়েক মাস ধরে ওই এলাকার চক্রবর্তী বাজারে তিনি চা বিক্রি করেন। চাকরির সময় নিয়মিত বেতন পাওয়ার পাশাপাশি বাড়তি কাজ করেও আয় করতেন। কারখানা বন্ধ হওয়ার পর সেই নিশ্চয়তা হারিয়ে গেছে।

অপর শ্রমিক মো. সোলাইমান বলেন, বেক্সিমকোতে চাকরি করার সময় সংসার ভালোভাবেই চলত। নিয়মিত বেতন পেতাম, বাড়তি কাজ করলে আয়ও বাড়ত। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আর চাকরি পাইনি। বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাজারে ফল বিক্রি করছি। এই আয় দিয়ে সংসার চালানো খুব কষ্টের। কারখানা আবার খুললে আগের কাজে ফিরতে চাই।

স্থানীয় চক্রবর্তী বাজারে সবজি বিক্রি করছেন ওসমান আলী। তিনিও আগে বেক্সিমকো কারখানায় চাকরি করতেন। কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নতুন কাজের সন্ধান করেও স্থায়ী কোনো কাজ পাননি। তিন মাস আগে সবজি বিক্রি শুরু করেছেন।

ওসমান আলী বলেন, কারখানা বন্ধ হওয়ার পর অনেক জায়গায় চাকরি খুঁজেছি, কিন্তু কোথাও পাইনি। তাই বাধ্য হয়ে বাজারে সবজি বিক্রি করছি। আগের কাজের তুলনায় আয় অনেক কম। পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জের খাইরুল ইসলামও আগে বেক্সিমকো এলাকায় কাজ করতেন। কারখানার কর্মচাঞ্চল্যের ওপর তাঁর মতো অনেকের আয়রোজগার নির্ভর করত। এখন ওই এলাকায় অটোরিকশা চালান।

খাইরুল ইসলাম বলেন, ‘কারখানা চালু থাকলে এখানে হাজার হাজার মানুষ আসা-যাওয়া করত। তখন আমাদেরও ভালো আয় হতো। কারখানা বন্ধ হওয়ার পর যাত্রী কমে গেছে, আয়ও কমেছে। নিজের চাকরিটাও হারিয়েছি। এখন অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাচ্ছি।’

কাজ হারিয়েছেন হাজারো শ্রমিক

কারখানা বন্ধের পর বেক্সিমকোর শ্রমিকদের বড় একটি অংশের জীবনযাত্রায় নেমে আসে অনিশ্চয়তা। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কারখানা খোলার দাবিতে গাজীপুরে হাজারো শ্রমিক বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেন। কারখানা বন্ধের সময় শ্রমিকদের পাওনা পরিশোধে তৎকালীন সরকার অর্থের ব্যবস্থাও করে। ২০২৫ সালের মার্চে ১৪টি বন্ধ কারখানার ৩৩ হাজার ২৩৪ শ্রমিক ও কর্মচারীর বকেয়া পরিশোধে ৫২৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকার চেক দেওয়া হয়।

পাওনা পরিশোধ হলেও নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হওয়ায় অনেক শ্রমিক বাধ্য হয়েছেন ছোট ব্যবসা, পরিবহন বা অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ নিতে।

কারখানা খোলার উদ্যোগও থমকে আছে

বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালুর জন্য ২০২৫ সালেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। জাপানের রিভাইভাল এবং যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইকোমিলির অর্থায়নে বেক্সিমকো টেক্সটাইলের ১৪টি কারখানা চালুর পরিকল্পনা করা হয়। প্রাথমিকভাবে ২ কোটি ডলার বিনিয়োগের মাধ্যমে ২৫ হাজারের বেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই উদ্যোগও বাস্তবায়িত হয়নি।

বেক্সিমকো কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, বেক্সিমকোর শিল্পপার্কের সংকটের পেছনে রয়েছে বিপুল ঋণ ও নানা আইনি জটিলতা।

বেক্সিমকো ইন্ড্রাট্রিয়াল পার্কের মহাব্যবস্থাপক মো. আবদুল লতিফ প্রথম আলোকে বলেন, কারখানাগুলো খোলার বিষয়ে বেক্সিমকো লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছেন। আশা করি ভালো একটি সমাধান হবে।

ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, বেক্সিমকোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালুর জন্য সরকারের সহযোগিতা চাইছে।