দেশের বস্ত্র খাতকে চাঙা করতে সুতা ব্যবহারে নগদ সহায়তা দেড় শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করেছে সরকার। এতে সরকারের আনুমানিক সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নগদ সহায়তা বাড়ানোর সরকারের এ উদ্যোগে দেশের স্পিনিং মিলগুলো ঘুরে দাঁড়াবে সামান্যই। তার কারণ, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের পাশাপাশি তারল্যসংকটে ভুগছে এই খাতের বেশির ভাগ কারখানা। আবার নগদ সহায়তা পাওয়া নিয়েও আছে কিছু জটিলতা।
বস্ত্র খাতের একাধিক উদ্যোক্তা এমন শঙ্কার কথায় জানিয়েছেন প্রথম আলোকে। তাঁরা বলছেন, নগদ সহায়তা বাড়ানোর কারণে বিক্রি ৫ শতাংশের মতো বাড়তে পারে। এতে কিছুটা দম নেওয়ার সুযোগ পাবে স্পিনিং মিলগুলো। তবে ভারতীয় সুতার আমদানি কমিয়ে দেশীয় সুতার ব্যবহার বাড়াতে হলে আরও কয়েকটি কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। তাহলে দেশের বস্ত্র খাত ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ১২ জুলাই রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে দেশীয় সুতা বা কাপড় ব্যবহারে শুল্ক বন্ড ও ডিউটি ড্র-ব্যাকের পরিবর্তে বিকল্প নগদ সহায়তার হার দেড় শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫ শতাংশ করেছে। চলতি অর্থবছরে বাড়তি এ নগদ সহায়তা পাবেন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকেরা, যাঁরা স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সুতা ব্যবহার করবেন। তার আগে ৯ জুলাই এ–সংক্রান্ত এক নির্দেশনা বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠায় অর্থ মন্ত্রণালয়।
বস্ত্রকলের মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর হিসাবে, দেশে বর্তমানে ১ হাজার ৮০০-এর বেশি টেক্সটাইল মিল বা বস্ত্রকল রয়েছে। এর মধ্যে স্পিনিং মিল বা সুতার কল ৫২৭টি। খাতটিতে মোট বিনিয়োগ প্রায় ২ হাজার ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। নিট পোশাকশিল্পের ৮০ শতাংশ এবং ওভেন পোশাকের প্রায় ৪০ শতাংশ সুতা সরবরাহ করে স্থানীয় বস্ত্রকল।
জানতে চাইলে বিটিএমএর সাবেক পরিচালক রাজীব হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, যেসব ছোট-মাঝারি কারখানা এত দিন চোখ বন্ধ করে ভারতীয় সুতা কিনত, তারা এখন নগদ সহায়তা বৃদ্ধির কারণে দেশীয় সুতা ব্যবহারে কিছুটা হলেও আগ্রহী হবে। এতে সুতার চাহিদা কিছুটা বাড়বে। তাতে বন্ধ কারখানাও চালু হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। তবে তৈরি পোশাকের ক্রয়াদেশ যদি ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে এবং গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের সমাধান না হয়, তাহলে খুব বেশি লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকবে না।
নগদ সহায়তার প্রভাব কতটা
আড়াই বছর আগে স্থানীয় সুতা ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ৪ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হতো। তবে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এ সহায়তা কমিয়ে ৩ শতাংশ করা হয়। তারও ছয় মাস পর সহায়তার পরিমাণ আরও কমিয়ে দেড় শতাংশ করা হয়। এ সহায়তার ওপর আবার ৫ শতাংশ করও দিতে হয় রপ্তানিকারকদের। নগদ সহায়তা কমিয়ে দেড় শতাংশে নামিয়ে আনার পর থেকে দেশে সুতা আমদানি বাড়তে থাকে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যানুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৪ হাজার ৪১০ কোটি টাকার কটন সুতা আমদানি হয়েছিল। পরের অর্থবছর তা বেড়ে ২১ হাজার ১৪২ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। আর ২০২৪-২৫ অর্থবছরে আমদানি হয় ২৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকার সুতা। সর্বশেষ বিদায়ী অর্থবছরে ২৫ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকার সুতা আমদানি হয়েছে। আমদানি করা সুতার ৯০ শতাংশই এসেছে ভারত থেকে।
দেশীয় সুতা ব্যবহারের প্রণোদনার সুফল স্পিনিং মিলগুলো পেলেও তা সরাসরি জমা হয় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকের ব্যাংক হিসাবে। কয়েকজন তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগে যখন ৪ শতাংশ নগদ সহায়তা ছিল, তখন আমদানি ও দেশীয় সুতার মধ্যে দামের পার্থক্য ছিল কেজিপ্রতি ১০-১৫ সেন্ট। ক্রয়াদেশ দেওয়ার পর দ্রুত সুতা প্রাপ্তি এবং পরিবহন খরচ কম—এই দুই সুবিধার কারণে দেশীয় সুতা ব্যবহৃত হতো বেশি। নগদ সহায়তা কমানোর পর আমদানি ও দেশীয় সুতার দামের পার্থক্য ৪০ সেন্টে গিয়ে পৌঁছায়। সে কারণে আমদানি বাড়তে থাকে।
জানতে চাইলে নিট পোশাকশিল্পের মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, দেশীয় সুতা ব্যবহারে ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা দিলেও আইনের মারপ্যাঁচে শেষ পর্যন্ত হাতে আসবে মাত্র আড়াই শতাংশ। তার কারণ, ৫ শতাংশ সহায়তার ওপর ৫ শতাংশ কর দিতে হবে। সেটি আবার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি নয়। তার কারণে শেষ পর্যন্ত হয়তো ৩ দশমিক ২ শতাংশের মতো টিকবে। এতে সুতা আমদানি খুব বেশি কমবে না। মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, কর প্রত্যাহার করার পাশাপাশি নগদ সহায়তা প্রাপ্তি সহজ করতে হবে। প্রয়োজনে রপ্তানির পরই নগদ সহায়তার অর্থ দিতে হবে।
নানামুখী সংকটে বস্ত্রকল
গাজীপুরের ভবানীপুরের মোশারফ কম্পোজিট টেক্সটাইল মিলসের দৈনিক ১৬০ টন সুতা উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। কারখানাটিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাসচালিত ক্যাপটিভ জেনারেটর রয়েছে। বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগও আছে। বর্তমানে কারখানাটিতে দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ থাকে ২-৩ পিএসআই। রাতে বেলায় গ্যাসের চাপ বেড়ে হয় ৪-৫ পিএসআই। অন্যদিকে বিদ্যুতে লোডশেডিং হয় দিনে ৫-৭ বার। তাতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।
মোশারফ গ্রুপের চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটের কারণে আমাদের উৎপাদন ২০ শতাংশ কম হচ্ছে। তাতে প্রতি কেজি সুতা উৎপাদনে ব্যয় বেশি হচ্ছে। এ অবস্থায় নগদ সহায়তা বাড়ানো হলেও তাতে সুতা বিক্রি বাড়তে পারে সামান্য। কারণ, চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছে না কারখানাগুলো। আবার অনেক প্রতিষ্ঠান পুঁজির সংকটে ভুগছে। তাই তাদের সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে।’
সাভারের লিটল স্টার স্পিনিং মিলস দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসের সংকটে ভুগছে। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পেয়ে কারখানাটির কর্তৃপক্ষ সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সঞ্চয়ের ব্যবস্থায় ১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। এ বিনিয়োগের পর কারখানাটির উৎপাদন সক্ষমতার ৮০ শতাংশ ব্যবহার করা গেলেও উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে।
জানতে চাইলে লিটল স্টার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বিটিএমএর পরিচালক খোরশেদ আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ভারত তাদের দেশের বস্ত্রকলগুলোকে বিভিন্নভাবে ১৩ শতাংশ সহায়তা দেয়। সরকারের সঙ্গে অনেক দেনদরবারের পর আমাদের সহায়তা বেড়ে ৫ শতাংশ হয়েছে। তারপরও আমরা ভারত থেকে পিছিয়ে।’ তিনি বলেন, ‘গ্যাসের উচ্চ মূল্যের সঙ্গে সংকট, উচ্চ সুদহারসহ বিভিন্ন কারণে আমাদের উৎপাদন ব্যয় বেশি। তাই বস্ত্র খাতকে টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি তৈরি পোশাকশিল্পে মূল্য সংযোজন বাড়াতে হলে বিভিন্নভাবে সহায়তা করতে হবে। সুতা আমদানিতে বন্ড–সুবিধার অপব্যবহার রোধ এবং দেশি ও বিদেশি ঋণপত্রের শর্তও সহজ করতে হবে।’