প্রথম আলো ডট কম আয়োজিত রিয়েল এস্টেট কানেক্ট বাংলাদেশ শীর্ষক অনুষ্ঠানে আবাসন খাতের পুর্নগঠন বিষয়ে এক অধিবেশন শেষে বক্তাদের সঙ্গে প্রথম আলো ও ডিবিএল গ্রুপের শীর্ষ নির্বাহীরা। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে। ১০ অক্টোবর
প্রথম আলো ডট কম আয়োজিত রিয়েল এস্টেট কানেক্ট বাংলাদেশ শীর্ষক অনুষ্ঠানে আবাসন খাতের পুর্নগঠন বিষয়ে এক অধিবেশন শেষে বক্তাদের সঙ্গে প্রথম আলো ও ডিবিএল গ্রুপের শীর্ষ নির্বাহীরা। রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে।  ১০ অক্টোবর

প্রথম আলো ডটকমের আয়োজনে বক্তারা

সাশ্রয়ী আবাসনে নতুন পরিকল্পনা দরকার

সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে হলে নতুন পরিকল্পনা দরকার। এ জন্য ঢাকাকে আশপাশের ৪০-৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত সম্প্রসারণ করতে হবে। উন্নত করতে হবে যোগাযোগব্যবস্থা। বিদ্যমান ঢাকা শহরকে পুনর্গঠন করার পাশাপাশি বেদখল হওয়া খেলার মাঠ, জলাশয়, পার্ক উদ্ধারে উদ্যোগ নিতে হবে। সেই সঙ্গে কৃষিজমি বাঁচাতে উঁচু ভবন নির্মাণ করতে হবে। পরিবেশবান্ধব আবাসনকে জনপ্রিয় করতে লাগবে সরকারের প্রণোদনা। তা ছাড়া ক্রেতাদের মধ্যে আস্থার সংকট কাটাতে আবাসন কোম্পানিগুলোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

প্রথম আলো ডট কম আয়োজিত নবম অনলাইন আবাসন মেলা ২০২৬ উপলক্ষে ‘রিয়েল এস্টেট কানেক্ট বাংলাদেশ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের পাঁচটি অধিবেশনে আবাসন খাতের ব্যবসায়ী, স্থপতি ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা এ কথাগুলো বলেন।

রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আজ শনিবার অনুষ্ঠিত এই আয়োজনে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। তিনি বলেন, ‘সহজেই ঘরে বসে কিংবা বিদেশে থেকে যাতে ফ্ল্যাট ও প্লট কেনা যায়, সেই চিন্তাভাবনা থেকেই ৯ বছর আগে আমরা অনলাইন আবাসন মেলা শুরু করেছিলাম। এখন আবাসন খাতে এই মেলা বড় জায়গা করে নিয়েছে।’

‘সময় এসেছে আবার, ঘরে বসেই স্বপ্নের আবাস খোঁজার’ শীর্ষক স্লোগানে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ১০ দিনের অনলাইন আবাসন মেলা শুরু হয়। শেষ হয় ৩ অক্টোবর। মেলা শেষে গতকাল আবাসন খাতের ব্যবসায়ীদের জন্য রিয়েল এস্টেট কানেক্ট নামে এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল।

আবাসনে নতুন পরিকল্পনা দরকার
আজকের আয়োজনে ‘আবাসন খাতের পুনর্বিন্যাস: নীতি, অগ্রগতি ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক সমাপনী অধিবেশনটি সঞ্চালনা করেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির রিয়েল এস্টেট বিভাগের প্রধান আমির আহমেদ। সেই অধিবেশনে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকায় অভিবাসী হয়ে যাঁরা প্রতিদিন আসছেন, তাঁদের বড় অংশ দরিদ্র। তাঁরা শহরের উপকণ্ঠে থাকছেন। পরিকল্পনা ও কমপ্লায়েন্স না থাকার কারণে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলো সেখানে যাবে না। তবে সাভার, গাজীপুর কিংবা মুন্সিগঞ্জ পর্যন্ত ঢাকাকে সম্প্রসারণের সুযোগ আছে।

একই অধিবেশনে রিহ্যাবের সাবেক সভাপতি তানভীরুল হক প্রবাল বলেন, ‘আমরা যশোর, রংপুরের মতো জায়গায় কাজ করছি। ঢাকার বাইরে আবাসন প্রকল্প করতে হবে। অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে পরিবেশবান্ধব ভবনগুলো বড়লোকদের ভবন হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের জন্য পরিবেশবান্ধব ভবন করতে হলে সরকারকে ভর্তুকি বা প্রণোদনা দিতে হবে।’

কৃষিজমি বাঁচাতে ৪০-৫০ তলা ভবন নির্মাণ ছাড়া উপায় নেই বলে মন্তব্য করেন ট্রপিক্যাল হোমসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শেখ রবিউল হক। তিনি বলেন, ৩০০ ফুট সড়ক থেকে নরসিংদী এবং বুড়িগঙ্গা থেকে পদ্মা সেতু পর্যন্ত সব জমি বিক্রি শেষ। তার মানে সেখানকার কৃষিজমি শেষ। অথচ ঢাকার ভেতরে ভবনের উচ্চতা ৭-৮ তলা। এসব ভবন ৪০-৫০ তলা পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারলে এত কৃষিজমি নষ্ট হতো না।

নতুন পরিকল্পনা হিসেবে ঢাকা শহরের বিদ্যমান ভবন পুনর্গঠন বা মানোন্নয়নের ওপর জোর দেন স্পেসজিরো লিমিটেডের এমডি মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আমরা সবাই শহরের কেন্দ্রস্থলে থাকতে চাই। বিদ্যমান যে শহর, সেটি নিয়েও পরিকল্পনা করতে হবে। আবাসন খাতের পুনর্গঠনে বিদ্যমান ভবনগুলো বড় সম্পদ।’

অধিবেশনে এবিসি রিয়েল এস্টেটের এমডি শ্রাবন্তী দত্ত বলেন, সময়মতো ফ্ল্যাট হস্তান্তর ও ক্রেতার লগ্নি করা অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করা, আইনগত কাগজপত্রের স্বচ্ছতার অভাব, নির্মাণ ব্যয় কমাতে ভবনের মানের সঙ্গে আপস করার কারণে আবাসন কোম্পানি ক্রেতাদের আস্থা হারায়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ক্রেতাদের বুঝতে হবে কোন কোম্পানি থেকে ফ্ল্যাট কিনবেন। সে জন্য ক্রেতাদেরও জানাশোনা থাকতে হবে।

রিহ্যাবের সভাপতি আলী আফজাল বলেন, ‘আবাসন খাতের কিছু মৌলিক বিষয় সংস্কার করতে হবে। ৩০ দিনে ভবনের নকশা পাস হওয়ার কথা থাকলেও ২ বছরেও তা হচ্ছে না। উন্নত বিশ্বে ৪ শতাংশ সুদে গৃহঋণ পাওয়া যায়। অথচ আমাদের দেশে গৃহঋণের সুদহার ১৪-১৫ শতাংশ। এই সুদহারে রাষ্ট্রের বড় অংশের মানুষের আবাসন নিশ্চিত করা কঠিন। তা ছাড়া নিবন্ধন খরচও এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় বেশি।’

নতুন প্রজন্মের আবাসন
এই আয়োজনে ‘ভবিষ্যতের আবাসন খাত’ শীর্ষক অপর এক অধিবেশন সঞ্চালনা করেন এসিআই প্রপার্টিজের পরিচালক তানভীর শাহরিয়ার রিমন।

অধিবেশনটিতে র্যানকন রিয়েল এস্টেটের এমডি মাশিদ রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ছে। ফলে আগামী দিনে প্রবৃদ্ধির নতুন ক্ষেত্র হবে আবাসন খাত। ঢাকায় কর্মজীবী নারী ও পুরুষ বাড়লেও তাঁদের জন্য কোনো আবাসন হচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ, বৃষ্টির পানি ভবনের নিচে সংরক্ষণ, গাছ লাগানো, ভবনের ভেতরে তাপ কমাতে বিশেষায়িত গ্লাস লাগাতে হবে। এসব উদ্যোগ নিলেই আগামী প্রজন্মের জন্য টেকসই আবাসন হবে।

রূপায়ণ হাউজিং এস্টেটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সাব্বির হোসেন খান বলেন, আগামী দিনের আবাসন হবে গেটেড কমিউনিটি। যেখানে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকবে। আবাসনকে সাধ্যের মধ্যে আনতে এক অঙ্কের সুদহারে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে।

অধিবেশনে ইস্টার্ন ব্যাংকের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সালেকীন ইব্রাহিম বলেন, পরিবেশবান্ধব গাড়ি কেনায় ঋণের পরিমাণ বাড়িয়েছে সরকার। একই রকম সুবিধা দেওয়া হলে পরিবেশবান্ধব আবাসন কেনার প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইপিডিসির রিটেইল বিজনেসের প্রধান মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘উন্নত দেশে আবাসন ঋণের সুদহার ৫ শতাংশ। আমাদের দেশে গৃহঋণের সুদহার কমাতে পুনঃ অর্থায়ন তহবিল চালু করা যেতে পারে। তাহলে গৃহঋণ বাড়বে। বর্তমানে প্রতিবছর গ্রাহকেরা যে পরিমাণ গৃহঋণ নিচ্ছেন, সেটি আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।’

ক্রেতার আস্থায় জোর
‘আস্থা অর্জনে আবাসন খাতের নতুন পথ’ শীর্ষক অপর এক অধিবেশনে বক্তব্য দেন আচিভ কনসালটিংয়ের প্রতিষ্ঠাতা আসিফ ইকবাল। তিনি বলেন, আবাসন খাতে সত্য কথা বলাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। একজনকে সত্য বললে হবে না, প্রতিষ্ঠানের সবাইকে সত্য বলতে হবে। আস্থা একা গড়া যায় না, সবাইকে মিলে গড়তে হয়।

আসিফ ইকবাল আরও বলেন, ‘মানুষ তাঁর সর্বোচ্চ সঞ্চয় দিয়ে আকাশের নিচে একটা ছাদের স্বপ্ন দেখেন। সেখানে সামাজিক, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয়ভাবে আস্থার সংকট তৈরি করা হলে তা ক্রেতার জন্য দুঃখজনক। আমাদের মতো জনবহুল দেশে আবাসনের চাহিদা সব সময় থাকবে। তাহলে কেন আমরা আস্থার সংকট তৈরি করছি।’

‘আবাসন খাতের রূপান্তর: চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও উত্তরণ’ নিয়ে অপর এক অধিবেশনে বক্তব্য দেন বিটিআইয়ের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাহবুবুর রহমান। আরেকটি অধিবেশনে কথা বলেন বিজনেস স্ট্র্যাটেজিক ও করপোরেট ট্রেইনার মার্ক অনুপম মল্লিক।