প্রাণ অ্যাগ্রো লিমিটেডের নাটোরের কারখানার ছাদে সারি সারি সৌরপ্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে
প্রাণ অ্যাগ্রো লিমিটেডের নাটোরের কারখানার ছাদে সারি সারি সৌরপ্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে

কারখানার ছাদে ৪৩ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে প্রাণ-আরএফএল

  • ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগে বর্তমানে খালি ছাদে ৪৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে গ্রুপটি।

  • এই খাতে মোট ২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা।

একসময় কারখানার যে ছাদ খালি পড়ে থাকত সেটিই এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনের জায়গা। ছাদজুড়ে সারি সারি সৌর প্যানেল বসানো। দিনের আলোয় এসব প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়েই চলে কারখানাটির মেশিন তথা যন্ত্রপাতি।

১১ অক্টোবর নাটোরের প্রাণ অ্যাগ্রো লিমিটেডে গিয়ে এমন চিত্রই দেখা গেছে। অধিকাংশ কারখানা ভবনের পাকা ছাদ ও টিনের শেডে বসানো রয়েছে সৌর প্যানেল। এই কারখানায় নুডলস, সস, শর্ষের তেল, মসলাসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য উৎপাদন করা হয়, যা স্থানীয় বাজারে বিক্রির পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি হয়।

শুধু নাটোরের ওই কারখানায় নয়, বিভিন্ন জায়গায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ২৫টি কারখানার ১১০টি স্থাপনার ৩৫ লাখ বর্গফুট ছাদে সৌর প্যানেল বসিয়ে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে ২০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে বর্তমানে ৪৩ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ জানায়, বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় ও উৎপাদন খরচ কমাতে তারা এ উদ্যোগ নিয়েছে। একই সঙ্গে মৌলভীবাজারে ১০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গ্রুপটির দাবি, তাদের সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে বছরে প্রায় ৬০ হাজার টন কার্বন নিঃসরণ এড়ানো সম্ভব হচ্ছে।

সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ শুধু ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়, পরিবেশগত দায়িত্বেরও অংশ। শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারখানায় যত বেশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করা সম্ভব হবে, তত বেশি কার্বন নিঃসরণ কমানো যাবে।
কামরুজ্জামান কামাল, পরিচালক (বিপণন), প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ

দুই বছরের মধ্যে সারা দেশের নিজস্ব কারখানাগুলোর ছাদে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ বাড়িয়ে মোট ২৫০ মেগাওয়াট করতে চায় প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প বাস্তবায়নে তারা সব মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।

অব্যবহৃত জমিতেও বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে

বর্তমানে দেশজুড়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ৪৭টির বেশি শিল্পপার্ক ও কারখানা রয়েছে। এসব স্থাপনায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ২৫০ মেগাওয়াট। বর্তমানে জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ ও নিজস্ব গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যমে এ চাহিদার একটি অংশ পূরণ করা হয়।

এখন পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কারখানার ছাদ ব্যবহার করছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে ভবিষ্যতে শিল্পপার্কের খালি ও অব্যবহৃত জায়গাও কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

জানতে চাইলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, গ্রুপের মোট বিদ্যুতের চাহিদার সমপরিমাণ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। দুই বছরের মধ্যে ২৫০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদনক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কারখানার ছাদের পাশাপাশি শিল্পপার্কের অব্যবহৃত জায়গাও ব্যবহার করা হবে।

বিকল্পের খোঁজে

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় কারখানা চালু রাখতে দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সে জন্য অনবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প উৎস হিসেবে সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে তারা।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, নিজস্ব কারখানার বিদ্যুতের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বিনিয়োগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে তারা মৌলভীবাজারের গোবিন্দপুরে ১০০ মেগাওয়াট উৎপাদনক্ষমতার একটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।

এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির সোলার প্রকল্পের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) তৌহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পটির জন্য জমি কেনা, অর্থায়নসহ বিভিন্ন কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই সেখানে সৌর প্যানেল স্থাপনসহ অন্যান্য কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। আরও সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য সরকারের কাছ থেকে জমি ইজারা নেওয়ার বিষয়েও কাজ চলছে।

প্রাণ অ্যাগ্রো লিমিটেডের নাটোরের কারখানার ছাদে সারি সারি সৌরপ্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে

অতিরিক্ত বিদ্যুৎ যাচ্ছে জাতীয় গ্রিডে

সৌর প্যানেল থেকে উৎপাদিত সব বিদ্যুৎ সব সময় কারখানায় ব্যবহার করা হয় না। সাধারণত দিনের বেলায় চার থেকে ছয় ঘণ্টা সৌর প্যানেল থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। এ সময় চাহিদার তুলনায় বেশি উৎপাদিত হলে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়। পরে নিট মিটারিং ব্যবস্থার আওতায় সেই বিদ্যুৎ রাতের বেলায় কারখানায় ব্যবহার করা হয়।

তৌহিদুল ইসলাম বলেন, বর্তমানে নাটোর, রাজশাহী ও নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি কারখানা থেকে নিট মিটারিংয়ের মাধ্যমে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। সব কারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা গেলে এ সুযোগ আরও বাড়বে।

প্রতিষ্ঠানটি জানায়, বৈশ্বিক বাণিজ্যে পণ্যের দাম ও মানের পাশাপাশি উৎপাদনপ্রক্রিয়ার পরিবেশগত প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) উন্নত বাজারের ক্রেতারা পণ্য উৎপাদনে পরিবেশগত প্রভাব ও জ্বালানি ব্যবহারের বিষয়কে গুরুত্ব দিচ্ছেন। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।

শিল্পকারখানার পাশাপাশি বাসাবাড়িতেও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে ভাবছে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। তৌহিদুল ইসলাম বলেন, কম খরচে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে ইন্ডাকশন চুলা, ভাত রান্নার বৈদ্যুতিক যন্ত্রসহ বিভিন্ন গৃহস্থালি সরঞ্জাম চালানোর সুযোগ নিয়ে কাজ চলছে। সাশ্রয়ী মূল্যে বিভিন্ন প্যাকেজে বাসাবাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

যেভাবে সৌরবিদ্যুতে কারখানা চলে

একসময় ধারণা ছিল, সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে ভারী যন্ত্রপাতি চালানো সম্ভব নয়। তাই দেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার শুরু হলেও তা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েনি<bha>;</bha> বাসাবাড়িতে ফ্যান ও বাতি চালানোর মধ্যেই এর ব্যবহার সীমিত ছিল। তবে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের দাবি, তাদের কারখানায় ব্যবহৃত মোট বিদ্যুতের ১৮ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ থেকে আসছে।

সোলার প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা জানান, সূর্যের আলো সৌর প্যানেলে পড়লে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়। এ বিদ্যুৎ মূলত ডিসি (ডিরেক্ট কারেন্ট)। ইনভার্টারের মাধ্যমে ডিসি বিদ্যুৎকে এসি (অলটারনেটিং কারেন্ট) বিদ্যুতে রূপান্তর করে ব্যবহার করা হয়। কারণ, ডিসি বিদ্যুৎ দিয়ে কারখানা বা বাসাবাড়ির প্রচলিত অধিকাংশ বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালানো সম্ভব হয় না।

কার্বন নিঃসরণ হ্রাস

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের দাবি, তাদের কারখানাগুলোয় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে বছরে প্রায় ৬০ হাজার টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ এড়ানো সম্ভব হচ্ছে। সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা বাড়লে প্রচলিত ও জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুতের ব্যবহার কমবে। এতে শিল্পকারখানাগুলো থেকে সামগ্রিকভাবে কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হবে।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল বলেন, সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ শুধু ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নয়, পরিবেশগত দায়িত্বেরও অংশ। শিল্প উৎপাদন বাড়ানোর সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারখানায় যত বেশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করা সম্ভব হবে, তত বেশি কার্বন নিঃসরণ কমানো যাবে।