
কোম্পানির সংঘস্মারক পরিবর্তনের জন্য বর্তমানে উচ্চ আদালতের অনুমতি নিতে হয়। কোম্পানি আইন সংশোধনের মাধ্যমে এই ক্ষমতা যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) রেজিস্ট্রারের হাতে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, ভবিষ্যতে সংঘস্মারক পরিবর্তনের অনুমোদন দেবে আরজেএসসি।
এ উদ্যোগকে ব্যবসাবান্ধব বলে উল্লেখ করেছেন বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী নেতারা। তবে তাঁরা বলেন, এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য আরজেএসসির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে সংস্থাটির সেবা প্রদানের নির্ধারিত সময়সীমা আইনে উল্লেখ করে দিতে হবে।
কোম্পানি আইন-১৯৯৪–এর খসড়া সংশোধনী নিয়ে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় ব্যবসায়ী নেতারা এমন বক্তব্য দেন। দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই আয়োজিত এ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। এতে সভাপতিত্ব করেন এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক ফজলুল হক।
আজ সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে কোম্পানি আইন সংশোধন নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা জামাল হায়দার। তিনি বলেন, কোম্পানি আইনের ৪০টি ধারা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ব্যবসা সহজ করা, এসএমই উদ্যোক্তাদের উৎসাহ দেওয়া, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, সিএসআর অন্তর্ভুক্ত করা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই সংশোধন আনা হচ্ছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির বলেন, ১৯৯৪ সালে কোম্পানি আইন প্রণয়নের পর মাত্র দুটি ছোট সংশোধন হয়েছে। এখন আইনটিকে সময়োপযোগী করতে চায় সরকার। ব্যবসা পরিচালনার নিয়ম ও পদ্ধতি আধুনিক করতে সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। তিনি উপস্থিত ব্যবসায়ী নেতাদের এক মাসের মধ্যে কোম্পানি আইন বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব দেওয়ার আহ্বান জানান।
স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রস্তুতির প্রসঙ্গ তুলে মন্ত্রী বলেন, আগামী তিন বছরে সরকারকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। কোম্পানি আইন সংশোধন সেই বৃহৎ কর্মপরিকল্পনার একটি অংশ।
কী কী পরিবর্তনের প্রস্তাব
বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগের মহাপরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা জামাল হায়দার জানান, সংঘস্মারক সংশোধনের ক্ষমতা আদালতের পরিবর্তে রেজিস্ট্রারের হাতে গেলে সময় ও ব্যয় কমবে। ব্যবসা না করা বা টানা দুই অর্থবছর আয়কর রিটার্ন দাখিল না করলে নিষ্ক্রিয় কোম্পানির নাম নিবন্ধন বই থেকে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়াও সহজ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, কোম্পানির নাম পরিবর্তনের আদেশ অমান্য করলে প্রতিদিন ৫০০ টাকার পরিবর্তে ৫ হাজার টাকা জরিমানার প্রস্তাব করা হয়েছে। এক ব্যক্তির কোম্পানি (ওপিসি) গঠনের ক্ষেত্রে পরিশোধিত মূলধনের ন্যূনতম সীমা ২৫ লাখ থেকে কমিয়ে ৫ লাখ টাকা করা হচ্ছে। বর্তমানে ওপিসির সর্বোচ্চ মূলধন ৫ কোটি টাকা, যা বাড়িয়ে ৫০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এ ছাড়া এক অর্থবছরে ওপিসির ১ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেনের বাধ্যবাধকতা বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে।
১৯৯৪ সালে কোম্পানি আইন প্রণয়নের পর মাত্র দুটি ছোট সংশোধন হয়েছে। এখন আইনটিকে সময়োপযোগী করতে চায় সরকার। ব্যবসা পরিচালনার নিয়ম ও পদ্ধতি আধুনিক করতে সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছেখন্দকার আবদুল মুক্তাদির, বাণিজ্যমন্ত্রী
ব্যবসায়ীদের মতামত
মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সাবেক সভাপতি নিহাদ কবির বলেন, ডিজিটাল মাধ্যমে কোম্পানির দলিলপত্র সংরক্ষণের বিধান যুক্ত করা হচ্ছে। তবে এটি যেন কেবল কাগজের নথি কম্পিউটারে সংরক্ষণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। নিরাপত্তা, নির্ভুলতা ও গোপনীয়তা নিশ্চিত করে একটি বিশ্বস্ত ডিজিটাল করপোরেট ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয় পক্ষ যাতে তথ্য পরিবর্তন করতে না পারে, সে ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
নিহাদ কবির আরও বলেন, কোম্পানির ২০ শতাংশ বা তার বেশি মালিকানা থাকা ব্যক্তিদের হিতগ্রাহী স্বত্ব (বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ) আইনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য জটিল ও ব্যয়বহুল হতে পারে। তাই এটি বাতিল করা উচিত। একই সঙ্গে কোম্পানির শেয়ার হস্তান্তর ডিজিটাল মাধ্যমে করার ওপর জোর দেন তিনি।
সংঘস্মারক পরিবর্তনের ক্ষমতা রেজিস্ট্রারের হাতে দেওয়ার প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে নিহাদ কবির বলেন, কোনো বিষয়ে সংক্ষুব্ধ হলে ব্যবসায়ীরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে নাকি আদালতে যাবেন, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। কোম্পানির সামাজিক দায়দায়িত্ব–সংক্রান্ত বিধান বাতিলের প্রস্তাব দেন তিনি।
ফুটওয়্যার লেদারগুডস অ্যান্ড অ্যাকসেসরিজ এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (এফএলএএক্সএ) সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, আরজেএসসির ব্যবস্থাপনায় আরও পেশাদারত্ব আনতে হবে। সংস্থাটির প্রধানকে ঘন ঘন বদলি না করে ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে সেবা প্রদানের বিধান আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। বাণিজ্য সংগঠন বিধিমালা দ্রুত চূড়ান্ত করারও আহ্বান জানান তিনি।
জবাবে মোহাম্মদ মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, বিধিমালাটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং শেষে চলতি মাসেই প্রজ্ঞাপন জারির চেষ্টা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, এক ব্যক্তির কোম্পানির শেষে ওপিসি না লিখে ‘লিমিটেড’ রাখা ভালো। এতে তরুণ উদ্যোক্তাদের স্বীকৃতির ক্ষেত্রে সমস্যা হবে না।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, অন্য কোম্পানির নামের সাদৃশ্য ব্যবহার করলে শুধু জরিমানা নয়, প্রয়োজন হলে কোম্পানি বাতিল করার ক্ষমতাও রেজিস্ট্রারকে দিতে হবে। জরিমানার পরিমাণও যৌক্তিক হওয়া উচিত।
ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স (আইসিসি), বাংলাদেশের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বলেন, ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে কোম্পানি আইন সংশোধনের উদ্যোগ ইতিবাচক। কোম্পানি আইন ব্যবসা পরিচালনার মূল আইন; তাই এর বিধান অন্য কোনো আইনের মাধ্যমে খর্ব করা উচিত নয়।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন এমসিসিআইয়ের সভাপতি কামরান টি রহমান ও সহসভাপতি সিমিন রহমান, তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান, চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক এবং ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ।