রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার একটি এলপিজি রূপান্তর কেন্দ্রে সম্প্রতি নিজের গাড়ির এলপিজি রুপান্তর প্রক্রিয়া দেখছেন একজন গ্রাহক
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকার একটি এলপিজি রূপান্তর কেন্দ্রে সম্প্রতি নিজের গাড়ির এলপিজি রুপান্তর প্রক্রিয়া দেখছেন একজন গ্রাহক

জ্বালানি তেলের সংকটে গাড়ি এলপিজি ও সিএনজিতে রূপান্তর বেড়েছে

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জনতা হাউজিংয়ের বাসিন্দা শেখ আসিফ পেশায় একজন ব্যবসায়ী। ২০১৮ সাল থেকে তিনি টয়োটা ব্র্যান্ডের ১৫০০ সিসির একটি গাড়ি ব্যবহার করছিলেন। জ্বালানিসংকটের পরিস্থিতিতে সম্প্রতি তিনি গাটিড়িকে এলপিজিতে কনভারশন বা রূপান্তর করেছেন। মোহাম্মদপুরের গ্রিন ফুয়েল সিএনজি অ্যান্ড এলপিজি কনভারশন সেন্টারে কাজটি করতে তাঁর মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৬০ হাজার টাকা।

শেখ আসিফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘জরুরি ব্যবসায়িক কাজে গাড়ি নিয়ে অনেক জায়গায় যেতে হয়। লাইনে দাঁড়িয়ে জ্বালানি সংগ্রহ করা সময়সাপেক্ষ। তাই বিকল্প হিসেবে গাড়িকে এলপিজিতে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ ছাড়া দেশে জ্বালানি তেলের মান ভালো না। তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া।’

গ্রিন ফুয়েল সিএনজি অ্যান্ড এলপিজি কনভারশন সেন্টারের স্বত্বাধিকারী হাসিন পারভেজ বলেন, গাড়ির জ্বালানি হিসেবে এলপিজি ভালো। আর এটি সহজলভ্যও। তিনি জানান, জ্বালানিসংকট শুরুর পর কনভারশনের চাহিদা ২০–৩০ শতাংশ বেড়েছে।

সরেজমিনে দুই দিন ধরে রাজধানীর বেশ কয়েকটি এলাকার এলএনজি ও সিএনজি রূপান্তর কেন্দ্র ঘুরে দেখা যায়, সব জায়গাতেই কর্মীরা এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন।

রাজধানীর তেজগাঁওয়ের সাউদার্ন অটোমোবাইলস নামের প্রতিষ্ঠানটি গত ফেব্রুয়ারি মাসে এলপিজি ও সিএনজি করভারশন করেছে ২৫টি, যা মার্চে বেড়ে ৩৯টিতে ওঠে। এই প্রতিষ্ঠানে একেকটি গাড়ি এলপিজি ও সিএনজিতে করভারশন তথা রূপান্তর করতে ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হয়।

সাউদার্ন অটোমোবাইলসের তেজগাঁও শাখার উপব্যবস্থাপক সুমন কুমার সরকার বলেন, ‘জ্বালানি তেলের চেয়ে সিএনজি ব্যবহার করে গাড়ি চালালে ৭০-৮০ শতাংশ খরচ কমানো যায়। আর এলএনজির ক্ষেত্রে কমে ৩০-৪০ শতাংশ। তাই অনেকেই এখন কনভারশনের খরচ ও সুবিধা জানার জন্য আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।’

জ্বালানি তেলের চেয়ে সিএনজি ব্যবহার করে গাড়ি চালালে ৭০-৮০ শতাংশ খরচ কমানো যায়। আর এলএনজির ক্ষেত্রে কমে ৩০-৪০ শতাংশ। তাই অনেকেই এখন কনভারশনের খরচ ও সুবিধা জানার জন্য আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
সুমন কুমার সরকার, উপব্যবস্থাপক, সাউদার্ন অটোমোবাইলস, তেজগাঁও শাখা।

একাধিক গাড়ি বিশেষজ্ঞের মতে, এলপিজি সিলিন্ডারের চেয়ে সিএনজি সিলিন্ডারের ওজন বেশি। আর এলপিজি সিলিন্ডারের জন্য জায়গা কম প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া ব্যক্তিগত গাড়িতে প্রতি লিটার অকটেনে গাড়িভেদে ৮-১৪ কিলোমিটার পর্যন্ত চালানো যায়। আর এক লিটার এলপিজিতে চলে ৮-১২ কিলোমিটার। অকটেনের চেয়ে এলপিজির দাম কম।

তেজগাঁওয়ের আরেকটি গাড়ি সার্ভিসিং প্রতিষ্ঠান মাল্টিব্র্যান্ড ওয়ার্কশপ। প্রতিষ্ঠানটি বিলাসবহুল ব্র্যান্ড মার্সিডিজ বেঞ্জ, বিএমডব্লিউ, আউডি, রেঞ্জরোভারসহ সব ধরনের গাড়ির সার্ভিসিং সেবার পাশাপাশি সিএনজি ও এলপিজি কনভারশন সেবাও দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

মাল্টিব্র্যান্ড ওয়ার্কশপের নির্বাহী পরিচালক মাসুদ করিম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, জ্বালানির সংকট শুরুর পর কনভারশনের চাহিদা ১০-১৫ শতাংশ বেড়েছে। অনেকেই এ বিষয়ে খোঁজ নিচ্ছেন।

একাধিক এলপিজি ও সিএনজি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে ৮০ শতাংশ গাড়িই এলপিজিতে, আর ২০ শতাংশ সিএনজিতে কনভারশন হয়।

এলপিজির দাম বাড়ায় শঙ্কা

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) সম্প্রতি তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) সঙ্গে গাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজির (অটো গ্যাস) দাম লিটারে ১৭ টাকা ৯৪ পয়সা বাড়িয়েছে। ফলে গাড়ির প্রতি লিটার এলপিজির দাম দাঁড়িয়েছে ৭৯ টাকা ৭৭ পয়সা, যা এর আগে ছিল ৬১ টাকা ৮৩ পয়সা।

একটিভ এলপিজি কনভারশনের রাজধানীর ভাটারার মাদানী অ্যাভিনিউ শাখা এখন প্রতিদিন পাঁচটির মতো গাড়ি কনভারশনের কাজ করে। যুদ্ধ ও ঈদের আগে প্রতিদিন এক–দুটি গাড়ি এলপিজি কনভারশনের জন্য আসত।

একটিভ এলপিজি কনভারশনের এই শাখার পরিচালক মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, হুট করে এলপিজির দাম বেড়ে যাওয়ায় এখন কনভারশনের চাহিদা কমে যাবে। অনেকেই এই কনভারশনে আগ্রহী থাকলেও দাম বাড়ায় আগ্রহ হারাবে।

মোটরসাইকেলও এলপিজিতে যাচ্ছে

দেশে জ্বালানিসংকটের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা যায়, অনেকেই মোটরসাইকেলও এলপিজিতে রূপান্তর করাচ্ছেন। যদিও এ ব্যাপারে আইনি অনুমতি আছে কি না, তা কেউ জানেন না। এ ছাড়া নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

* জ্বালানিসংকট শুরুর পর কনভারশন বা রূপান্তরের চাহিদা ২০%-৩০% বেড়েছে।* বর্তমানে ৮০% গাড়ি এলপিজিতে, আর ২০% সিএনজিতে রূপান্তর করা হয়।

মোটরসাইকেলে এলপিজি কনভারশন করে দেয়

মিরপুর ১ নম্বরের চিড়িয়াখানা রোডের প্রতিষ্ঠান সাদিফ এন্টারপ্রাইজ দুই বছর ধরে মোটরসাইকেলে এলপিজি কনভারশন সেবা দিচ্ছে। এ জন্য প্রত্যেক বাইকমালিকের খরচ হয় ১৩–১৪ হাজার টাকা। মোটরসাইকেলের সিলিন্ডারে সর্বোচ্চ ৫ লিটার পর্যন্ত এলপিজি ধারণক্ষমতা রয়েছে। ঈদের আগে প্রতিষ্ঠানটি প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১০টি মোটরসাইকেল করভারশন করত। অথচ এখন প্রতিদিনই ৪–৫টি মোটরসাইকেল কনভারশন করে প্রতিষ্ঠানটি।

সাদিফ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সোহেল রানা বলেন, এলপিজিতে অকটেনের মতো মাইলেজ পাওয়া যায়। তাই এই কনভারশনের চাহিদা বেশি রাইডশেয়ারিং সেবা দেওয়া মোটরসাইকেলচালকদের মধ্যে। ঈদের পর থেকে কনভারশনের চাহিদা দুই থেকে তিন গুণ বেড়ে গিয়েছে।