টানা ছয় বছর লোকসানে ছিল দেশের চা–শিল্প। উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে নিলামে চা বিক্রি করতে হচ্ছিল বাগানমালিকদের। সেই পরিস্থিতি বদলাতে দুই বছর আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ন্যূনতম নিলামের মূল্য নির্ধারণ করে বাংলাদেশ চা বোর্ড। তাতে নিলামে চায়ের দরপতনের ধাক্কা থামে। দুই বছরের ব্যবধানে লোকসানের বৃত্ত থেকে বের হতে শুরু করেছে দেশের ঐতিহ্যবাহী চা–শিল্প।
চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ন্যূনতম নিলামের মূল্য নির্ধারণের আগে ২০২৩–২৪ মৌসুমে (এপ্রিল–মার্চ) নিলামে প্রতি কেজি চায়ের গড় দাম ছিল ১৭১ টাকা ২৪ পয়সা। ন্যূনতম মূল্য কার্যকর হওয়ার পর ২০২৪–২৫ মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২০২ টাকা ৪৬ পয়সা। তবু লোকসানের গল্প যেন শেষ হচ্ছিল না। সবশেষ ২০২৫–২৬ মৌসুমে নিলামে প্রতি কেজি চা গড়ে বিক্রি হয়েছে ২৪৫ টাকা ৫০ পয়সায়, যা আগের মৌসুমের তুলনায় ৪৩ টাকা বেশি।
গত এপ্রিলে শুরু হওয়া নতুন মৌসুমেও ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রয়েছে। এখন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত চারটি নিলামেই ন্যূনতম মূল্যের চেয়ে বেশি দামে চা বিক্রি হয়েছে। চা বোর্ডের হিসাবে, প্রথম তিনটি নিলামে গড়ে প্রতি কেজি চায়ের দাম পাওয়া গেছে ২৭৫ টাকা। ফলে চলতি মৌসুমেও ভালো দর পাওয়ার আশা করছেন বাগানমালিকেরা। সেই সঙ্গে লোকসানের গল্পেরও শেষ হতে চলেছে।
চা এমন একটি পণ্য, যা নিলামের মাধ্যমেই বিক্রি করতে হয় উৎপাদকদের। সাধারণত বাগান থেকে পাতা সংগ্রহ করে চা উৎপাদনের পর তা গুদামে পাঠানো হয়। এরপর ব্রোকার প্রতিষ্ঠানগুলো নমুনা সংগ্রহ করে চায়ের মান নির্ধারণ করে। সেই মানের ভিত্তিতে প্রতি সপ্তাহে নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে চা বিক্রি করা হয়। চট্টগ্রাম, শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ে চায়ের নিলাম হলেও দেশের সিংহভাগ চা চট্টগ্রামের নিলামে বিক্রি হয়।
চা বোর্ডের হিসাবে, প্রথম তিনটি নিলামে গড়ে প্রতি কেজি চায়ের দাম পাওয়া গেছে ২৭৫ টাকা। ফলে চলতি মৌসুমেও ভালো দর পাওয়ার আশা করছেন বাগানমালিকেরা। সেই সঙ্গে লোকসানের গল্পেরও শেষ হতে চলেছে।
বাংলাদেশ চা সংসদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে প্রতি কেজি চায়ে ৬১ টাকা লাভ ছিল। পরের বছর থেকে নিলামে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে বিক্রি হতে থাকে চা। বছর ঘুরতেই কেজিপ্রতি লোকসানের অঙ্ক দাঁড়ায় ৫৩ টাকা। দীর্ঘ সময় দরপতনের কারণে অনেক বাগানে শ্রমিকের ব্যয় সামলানোও কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এরপরই শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে ন্যূনতম নিলামের মূল্য নির্ধারণ করে চা বোর্ড।
চা ব্যবসায়ীদের মতে, টানা লোকসানের পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল। প্রথমত, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি ছিল। দ্বিতীয়ত, নিলামে সমতল ও কিছু বাগানের চায়ের মান ব্যবসায়ীদের আকৃষ্ট করতে পারেনি। ফলে নিলামে দাম উঠত না। তৃতীয়ত, ভারত থেকে চোরাইপথে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে আসা চা দেশের বাজারে বিক্রি হচ্ছিল। সব মিলিয়ে বৈধ বাজারে দরপতন দেখা দেয়।
দুই বছর আগে ২০২৪–২৫ মৌসুমে সবচেয়ে সাধারণ মানের চায়ের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল প্রতি কেজি ১৬০ টাকা। এর চেয়ে উন্নত মানের চায়ের জন্য মূল্য নির্ধারণ করা হয় যথাক্রমে ২১০, ২২৭, ২৪৫ ও ২৭০ টাকা। সবচেয়ে ভালো মানের চায়ের ন্যূনতম মূল্য ছিল ৩০০ টাকা।
পরের মৌসুমে বিভিন্ন গ্রেডে কেজিপ্রতি ১০ থেকে ৮৫ টাকা পর্যন্ত ন্যূনতম দাম বাড়ানো হয়। যেমন সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাধারণ মানের চায়ের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি কেজি ২৪৫ টাকা। আর উত্তরাঞ্চলের বটলিফ চায়ের ন্যূনতম মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৭০ টাকা। নতুন মৌসুমেও ন্যূনতম মূল্য একই রাখা হয়েছে।
এবার পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়েছে। ফলে চায়ের উৎপাদন ও মান ভালো হবে আশা করা হচ্ছে। আর চায়ের মান ভালো হলে বাজারদরও বাড়ে।শাহ মঈনুদ্দিন, টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান
চা-বাগানের মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ চা সংসদের সভাপতি কামরান টি রহমান প্রথম আলোকে বলেন, নিলামে চা কেনাবেচায় ন্যূনতম মূল্য আরোপ করায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। নিলামে দাম বাড়ছে, এটা ইতিবাচক দিক, তবে নতুন দুশ্চিন্তা হলো চা উৎপাদনে ব্যবহৃত উপাদান ও সেবার দাম বাড়ায় চায়ের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে যদি কোনো কারণে আগামী নিলামগুলোতে ভালো দাম না পাওয়া যায়, তাহলে উৎপাদকেরা বিপদে পড়বেন।
চা ব্যবসায়ীদের সংগঠন টি ট্রেডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান শাহ মঈনুদ্দিন হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ন্যূনতম নিলামের মূল্য নির্ধারণ ও চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় গত মৌসুমে নিলামে চায়ের বাজার চাঙা ছিল। নতুন মৌসুমের চারটি নিলামেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
শাহ মঈনুদ্দিন আরও বলেন, ‘এবার পর্যাপ্ত বৃষ্টি হয়েছে। ফলে চায়ের উৎপাদন ও মান ভালো হবে আশা করা হচ্ছে। আর চায়ের মান ভালো হলে বাজারদরও বাড়ে।’
১৮৪০ সালে চট্টগ্রাম ক্লাবে পরীক্ষামূলক চা–বাগান দিয়ে এ অঞ্চলে চায়ের ইতিহাস শুরু হয়। এরপর সিলেটের মালনীছড়ায় ১৮৫৭ সালে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চা চাষ শুরুর পর নতুন নতুন বাগান গড়ে তোলা হয়।
এই চা ছিল রপ্তানিনির্ভর পণ্য। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন হতো বেশি। উদ্বৃত্ত চা রপ্তানি হতো বিদেশে। চাহিদা বাড়তে থাকায় ধীরে ধীরে রপ্তানি কমতে থাকে। উৎপাদন দিয়ে চাহিদা মেটাতে না পেরে দেড় দশক আগে শুরু হয় চা আমদানি। এই আমদানি একসময় বছরে কোটি কেজি ছাড়িয়েছিল।
সেখান থেকে শুরু হয় সরকার–উদ্যোক্তাদের নানামুখী চেষ্টা। এর ফলে দেশের চা উৎপাদন ৬–৭ কোটি কেজি থেকে বেড়ে ৯–১০ কোটি কেজিতে পৌঁছায়। তিন বছর ধরে গড়ে ৯ কোটি ৭০ লাখ কেজি চা উৎপাদন হয়ে আসছে। নানা উদ্যোগে ভালো দামও পাচ্ছেন উৎপাদকেরা।
এ বিষয়ে শাহ মঈনুদ্দিন হাসান বলেন, অবৈধভাবে বাজারজাত হওয়া চায়ে কোনো শুল্ক–কর দিতে হয় না। অন্যদিকে নিলাম থেকে কেনা চায়ে সরকারকে প্রায় সাড়ে ১৭ শতাংশ রাজস্ব দিতে হয়। ফলে বৈধ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। তাঁর মতে, সরকারের রাজস্ব সুরক্ষা ও বৈধ ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে অবৈধ চা বাজারজাতের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।