
রাজধানীর ফকিরাপুলের সরদার গলিতে অবস্থিত নূর প্রিন্টিং প্রেসে ওয়াজ মাহফিলের পোস্টার ছাপাচ্ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির মেশিন অপারেটর বিল্লাল শেখ। দুই ঘণ্টার মধ্যে এক হাজার রঙিন পোস্টার ছাপানো শেষ হয়ে যায়। এরপর হাতে কোনো কাজ না থাকায় দীর্ঘক্ষণ বসে থাকেন তিনি। এটি গত রোববার দুপুরের চিত্র।
এ সময় কথা হয় বিল্লাল শেখের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘অতীতে নির্বাচনের মৌসুমে পোস্টার ছাপাতে আমাদের রাত–দিন কাজ করতে হতো; কিন্তু এ বছর কাজের কোনো চাপই নেই। আবার প্রতিবছর এ সময় বইমেলার অনেক কাজ থাকত। এবার সেটিও কম। এখানকার প্রায় সব প্রেসেই একই অবস্থা।’
গত রোববার দুপুরে ফকিরাপুল এলাকায় সরেজমিন এই চিত্র দেখেছেন এই প্রতিবেদক। শুধু ফকিরাপুলই নয়, রাজধানী ঢাকার বেশির ভাগ প্রিন্টিং প্রেসের ব্যবসাতেই এখন মন্দা অবস্থা চলছে। কারণ, স্বাধীনতার পর এবারই প্রথম দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে পোস্টার ছাড়া। নির্বাচনের আগে যে পোস্টারে ছেয়ে যায় প্রতিটি এলাকা। এবার সেই চিত্র নেই।
এ ছাড়া সাধারণত ফেব্রুয়ারির ১ তারিখ থেকে মাসব্যাপী বইমেলা শুরু হয়। সেটিও এবার পিছিয়ে গেছে।
গত ১০ নভেম্বর ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা ২০২৫’ জারি করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এতে বলা হয়, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা কোনো পোস্টার ব্যবহার করতে পারবেন না। পোস্টারের অতি ব্যবহার পরিবেশ নষ্ট করে, তাই এই উদ্যোগ নেয় সরকার।
প্রতিবারই নির্বাচনের মৌসুমে সারা দেশে ব্যাপক হারে পোস্টারের ব্যবহার হয়। নির্বাচনের পরেও অনেকদিন পর্যন্ত ওই সব পোস্টার দেয়ালে থাকে।
নতুন আচরণবিধি অনুযায়ী, প্রার্থীরা কেবল লিফলেট, হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুন ব্যবহার করতে পারবেন। এতে কোনো দলীয় প্রধান ছাড়া অন্য কারও ছবি ব্যবহারের সুযোগ নেই। এরপর গত সপ্তাহে ছাপাখানাগুলোকে (প্রিন্টিং প্রেস) নির্বাচনী পোস্টার না ছাপার নির্দেশনা দিয়েছে ইসি।
ছাপাখানা সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণায় পোস্টারের ব্যবহার বহু পুরোনো। এটিকে কেন্দ্র করে দেশে মৌসুমি ব্যবসা গড়ে উঠেছে। এই ব্যবসায়ীরা এবার বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছেন। নির্বাচন কমিশনের নতুন নিয়মের কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন ছাপাখানার মালিক ও শ্রমিকেরা।
বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতি সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে পোস্টার, লিফলেট ও হ্যান্ডবিলের বেশির ভাগ ছাপাখানা ফকিরাপুল, বিজয়নগর, পল্টন, নীলক্ষেত, পুরান ঢাকার বাংলাবাজার এলাকায় অবস্থিত। এর বাইরে টঙ্গী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের সব জেলাতেই কমবেশি এ ধরনের ছাপাখানা রয়েছে।
খাত–সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা জানান, অতীতে জাতীয় নির্বাচনের মৌসুমে শুধু ঢাকার ছাপাখানাগুলোতে প্রায় ২০০ কোটি টাকার ব্যবসা হতো। এর মধ্যে লিফলেট-হ্যান্ডবিলের ব্যবসা প্রায় ৩০ থেকে ৫০ কোটি টাকার; বাকিটা পোস্টারের। অর্থাৎ এ বছর পোস্টার ছাপানো বন্ধ থাকায় প্রায় ১৫০ কোটি টাকার ব্যবসা ‘নাই’ হয়ে গেছে। লিফলেট-হ্যান্ডবিলের চাহিদাও কম। অন্যদিকে ছাপা পোস্টার পরিবহন ও সরবরাহের কাজে যুক্ত শ্রমিকদের আয়ও এবার কমেছে।
গত রোববার রাজধানীর ফকিরাপুল, বিজয়নগর ও পল্টন এলাকার বিভিন্ন ছাপাখানা ঘুরে দেখেন প্রথম আলোর প্রতিবেদক। ঘুরে দেখা গেছে, হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে লিফলেট ছাপা হচ্ছে। বিভিন্ন ছাপাখানায় পর্যাপ্ত কাজ না থাকায় এক বা একাধিক যন্ত্র বন্ধ ছিল। যেসব ছাপাখানা সচল ছিল, সেগুলোতে মূলত বিভিন্ন কোম্পানির ব্রশিয়ার, ফাইল, পোশাকের ট্যাগ, বই প্রভৃতি ছাপার কাজ হয়েছে।
কালভার্ট রোডে অবস্থিত ওয়ার্ল্ড ভিশন ট্রেড নামের ছাপাখানায় গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির চারটি ছাপাযন্ত্রের মধ্যে মাত্র একটিতে নির্বাচনের লিফলেট ছাপা হচ্ছিল। জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানটির মেশিনম্যান আজিম মোল্লা বলেন, ‘এবার ব্যবসা পুরোই ডাউন। পোস্টারের তো কাজ নেই। লিফলেটের কাজও কম আসছে; মাত্র ১৫ থেকে ২০ হাজার পিসের অর্ডার (কার্যাদেশ) আছে।’
ব্যবসায়ীরা জানান, অতীতে রাজধানীর ছাপাখানাগুলোতে ঢাকার সব আসনের প্রার্থীদের পাশাপাশি আশপাশের জেলা থেকেও পোস্টার–লিফলেট ছাপানোর ক্রয়াদেশ থাকত। কম খরচে ছাপাতে দূরের জেলা থেকে এসেও অনেকে পোস্টার ছাপিয়ে নিতেন। এবার সব বন্ধ। সাধারণত প্রতিটি লিফলেট–হ্যান্ডবিল ছাপাতে ৪০ থেকে ৬০ পয়সা লাগে। আর পোস্টার ছাপাতে লাগে সাড়ে ৩ টাকা থেকে ৪ টাকা।
অর্থাৎ পোস্টার ছাপিয়ে লাভ বেশি থাকত। ফলে এবার শুধু লিফলেট ছাপিয়ে তেমন একটা লাভ হয়নি। এ ছাড়া প্রতিবছর ফেব্রুয়ারির শুরুতে বইমেলা শুরু হতো; কিন্তু এ বছর নির্বাচনের জন্য বইমেলার সময় পিছিয়ে ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখে নেওয়া হয়েছে। এ কারণে বইমেলা ঘিরে ছাপার ক্রয়াদেশও এখন কম।
ফকিরাপুলের জননী প্রিন্টার্সের স্বত্বাধিকারী শহীদ খান বলেন, ‘২০২৪ সালের মরা নির্বাচনের সময়েও ভরপুর পোস্টার ছাপাইছি। এবার তো একদম বন্ধ। আবার প্রতিবছর নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি–মার্চ মাস পর্যন্ত বই ছাপানোর কাজ থাকত। এবার নির্বাচনের কাজও নেই; বইয়ের কাজও সেভাবে নেই।’
বাংলাদেশ মুদ্রণ শিল্প সমিতির সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান এবং ঢাকা দক্ষিণ প্রিন্টিং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. ওয়াহিদুর রহমান বলেন, নির্বাচনী আচরণবিধির কারণে এ বছর পোস্টার ছাপানো নিষিদ্ধ হওয়ায় মুদ্রণশিল্প বড় ধাক্কায় পড়েছে। আগে নির্বাচনী মৌসুমে পোস্টার ছিল এই খাতের অন্যতম প্রধান আয়ের উৎস। বছরের তিন–চার মাসের নির্বাচনী ও মৌসুমি কাজের ওপর নির্ভর করেই সারা বছরের ব্যয় মেটানো হতো। এবার শুধু হ্যান্ডবিল ও লিফলেট ছাপানোর সুযোগ থাকলেও তা ক্ষতি পোষাতে পারছে না। তার ওপর বইমেলার কাজও প্রত্যাশা অনুযায়ী পাওয়া যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে এটি আমাদের শিল্পের জন্য প্রায় আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ওয়াহিদুর রহমান আরও জানান, দুই বছর ধরে কাজ কমে যাওয়ায় কর্মচারী সংকট শুরু হয়েছে, নিয়মিত বেতন ও বোনাস দেওয়া যাচ্ছে না। অনেক প্রেস ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, আরও অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। একের পর এক সংকটে পড়ে এই শিল্প থেকে উত্তরণ এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।