বঙ্গবন্ধু প্রতিবন্ধী সুরক্ষা বিমা

১৫০ টাকা প্রিমিয়ামে মিলবে লাখ টাকার চিকিৎসা ব্যয়

চার ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য এ বিমা পলিসি চালু হচ্ছে। বাস্তবায়নে নিউরোডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট ও সাধারণ বিমা।

দেশে প্রথমবারের মতো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আনা হচ্ছে। বিমা পলিসিটির নাম ‘বঙ্গবন্ধু প্রতিবন্ধী সুরক্ষা বিমা’। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আজ মঙ্গলবার জাতীয় বিমা দিবস-২০২২–এর অনুষ্ঠানে এ পলিসির উদ্বোধন করার কথা রয়েছে।

এ স্বাস্থ্যবিমা সেবা নিতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কোনো মাশুল (ফি) দিতে হবে না। তবে একটা অংশ বহন করবেন অভিভাবকেরা। সাধারণ বীমা করপোরেশনকে বার্ষিক প্রিমিয়াম দিতে হবে ৬০০ টাকা। যেসব অভিভাবকের মাসিক আয় ২৫ হাজার টাকা বা এর চেয়ে কম, তাঁদের বহন করতে হবে বার্ষিক প্রিমিয়ামের ২৫ শতাংশ অর্থাৎ ১৫০ টাকা। বাকি ৭৫ শতাংশ বা ৪৫০ টাকা বহন করবে এনডিডি সুরক্ষা ট্রাস্ট। আর যেসব অভিভাবকের মাসিক আয় ২৫ হাজার টাকার বেশি, তাঁদের পুরো বার্ষিক প্রিমিয়ামই বহন করতে হবে। পলিসির আওতায় সর্বোচ্চ এক লাখ টাকার চিকিৎসা ব্যয় বহন করা হবে।

প্রাথমিকভাবে অটিজম, ডাউন সিনড্রোম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও সেরিব্রাল পালসি—এ চার ধরনের প্রতিবন্ধীকে স্বল্প খরচে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে। আজ চার শ্রেণিতে চারজনকে বিমার আওতায় এনে কার্যক্রমটি চালু করা হবে। উদ্যোগটি বাস্তবায়নে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন নিউরোডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট (এনডিডি সুরক্ষা ট্রাস্ট) এবং সাধারণ বীমা করপোরেশনের মধ্যে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিগত ও বিকাশগত সমস্যাকে নিউরোডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধিতা বলা হয়।

আপাতত চার শ্রেণি দিয়ে শুরু করা হলেও পরে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, বাক্‌প্রতিবন্ধী ইত্যাদি শ্রেণিকেও পলিসির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
এম মোশাররফ হোসেন, চেয়ারম্যান, আইডিআরএ

অটিজম হচ্ছে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক বিকাশের এমন একটি জটিল প্রতিবন্ধকতা, যা শিশুর জন্মের দেড় থেকে তিন বছরের মধ্যে প্রকাশ পায়। এ ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শারীরিক গঠনে কোনো সমস্যা বা ত্রুটি থাকে না। তাদের চেহারা ও অবয়ব স্বাভাবিক মানুষের মতোই হয়ে থাকে। তবে তারা পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিকতার সঙ্গে যথাযথভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে পারে না। তবে অনেক ক্ষেত্রে ছবি আঁকা, গান করা, কম্পিউটার পরিচালনা বা গাণিতিক সমাধানসহ অনেক জটিল বিষয়ে এ ধরনের ব্যক্তিরা বিশেষ পারদর্শী হয়ে থাকে।

ডাউন সিনড্রোম হচ্ছে কোনো ব্যক্তির মধ্যে বংশানুগতিক সমস্যা থাকা, যাদের মধ্যে মৃদু থেকে গুরুতর মাত্রার বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা, দুর্বল পেশিক্ষমতা ও খর্বাকৃতি ইত্যাদি বৈশিষ্ট্য আছে।

বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা হচ্ছে বয়সের উপযোগী ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ করার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা অর্থাৎ যোগাযোগ, নিজের যত্ন নেওয়া, সামাজিক দক্ষতা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, লেখাপড়া, নিজেকে পরিচালনা করতে না পারা—এ ধরনের এক বা একাধিক লক্ষণ থাকা।

আর সেরিব্রাল পালসি হচ্ছে প্রসবের সময়ে দীর্ঘসূত্রতার ফলে মস্তিষ্কে আঘাতজনিত সমস্যায় শিশুর চলাফেরা ও দেহভঙ্গিতে অস্বাভাবিকতা দেখা দেওয়া।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতে বিমা পলিসিটি চালু হচ্ছে। আশা করছি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিভাবকেরা এ সুযোগ নিতে আসবেন।
সৈয়দ শাহরিয়ার আহসান, এমডি, সাধারণ বীমা করপোরেশন

উদ্যোগটি পরীক্ষামূলকভাবে ঢাকা শহর, ঢাকা জেলা ও সিলেট জেলার প্রতিবন্ধীদের জন্য চালু করা হচ্ছে। প্রাথমিক পর্যায়ে এনডিডি সুরক্ষা ট্রাস্ট এবং সাধারণ বীমা করপোরেশনের মাধ্যমে এটি বাস্তবায়ন করা হলেও পরে সব বেসরকারি নন-লাইফ বিমা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে মোট প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ২৪ লাখ ৬১ হাজার ৮৫৫। এর মধ্যে এনডিডি গ্রুপের প্রতিবন্ধী ১৪ দশমিক ১৯ শতাংশ অর্থাৎ ৩ লাখ ৪৯ হাজার ২৫৫ জন।

সাধারণ বীমা করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ শাহরিয়ার আহসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করতে বঙ্গবন্ধু প্রতিবন্ধী সুরক্ষা বিমা পলিসিটি চালু হচ্ছে। আশা করছি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অভিভাবকেরা এ সুযোগটি নিতে আসবেন।’

পলিসি করতে কী কী লাগবে

প্রথম পর্যায়ে অটিজম, ডাউন সিনড্রোম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও সেরিব্রাল পালসি—এ চার ধরনের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সবাই বিমা পলিসিটির আওতায় আসবেন। পলিসির আওতায় আসার আগে কোনো ধরনের ডাক্তারি পরীক্ষার দরকার পড়বে না। তবে যথাযথ কর্তৃপক্ষ থেকে সনদ নিতে হবে।

গ্রাহক হতে গেলে একটি ফরম পূরণ করতে হবে। সঙ্গে দিতে হবে পাসপোর্ট আকারের এক কপি ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি)
বা জন্মনিবন্ধনের ফটোকপি, স্থানীয় প্রতিনিধি অর্থাৎ চেয়ারম্যান বা কমিশনারের মাধ্যমে সত্যায়িত প্রতিবন্ধী সনদ, স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণপত্র ইত্যাদি।

বিমা দাবি পরিশোধের পদ্ধতি

জানা গেছে, পলিসি করার পর গ্রাহকদের একটি স্বাস্থ্য কার্ড দেবে এনডিডি সুরক্ষা ট্রাস্ট। কার্ডটি পলিসি নেওয়ার প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ কার্ড দেখিয়েই স্বাস্থ্যসেবা নিতে হবে সরকারি হাসপাতাল থেকে। আর বিমা দাবি করতে হবে সাধারণ বিমা করপোরেশন বরাবর।

বিমা দাবি করার সময় আবেদনপত্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের প্রত্যয়নপত্র, বিল, ভর্তি ও ছাড়পত্র ও অন্যান্য ভাউচারের ফটোকপি দিতে হবে। আবেদন পাওয়ার দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে সাধারণ বীমা করপোরেশন সরাসরি গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে অর্থ পরিশোধ করবে।

জানতে চাইলে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান এম মোশাররফ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘দুই বছর ধরে চেষ্টাটা চলছে। আপাতত চার শ্রেণি দিয়ে শুরু করা হলেও পরে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, বাক্‌প্রতিবন্ধী ইত্যাদি শ্রেণিকেও পলিসির আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। একটা প্রিমিয়াম দেওয়ার পর থেকেই গ্রাহকেরা এক লাখ টাকা পর্যন্ত স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারবেন।’