নিত্যপণ্য
নিত্যপণ্য

রোজার বাজারে বাড়তি খরচের চাপ কমাতে কী করবেন

পবিত্র রমজান মাসে ইফতার ও সাহ্‌রির আয়োজনে অনেক পরিবারেই বিশেষ বা বাড়তি আয়োজন থাকে। এ কারণে রমজানে সাধারণত নিত্যপণ্যের চাহিদা বাড়ে। এতে পরিবারের মাসিক খরচও বেড়ে যায়। তবে সচেতন পরিকল্পনা ও কিছু কৌশল অনুসরণ করলে রোজায় সংসারের খরচ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। এখানে তেমন কিছু পরামর্শ দেওয়া হলো—

১. বাজেট করুন, তালিকা মেনে চলুন

রোজা শুরুর আগেই আপনার সম্ভাব্য কেনাকাটা ও ব্যয়ের একটি তালিকা অর্থাৎ বাজেট তৈরি করে নিন। ইফতার ও সাহ্‌রির জন্য কী কী পণ্য লাগবে, তা লিখে নিয়ে বাজারে যান। বিশেষ করে খাবারের জন্য সাত দিনের একটি সহজ মেনু বানিয়ে নিলে সে অনুসারে বাজার করা সহজ হয়। এতে হঠাৎ সিদ্ধান্তে অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কমানো যায়।

২. মৌসুমি ও দেশি পণ্যে ভরসা

ইফতারিতে অনেকেরই পছন্দের তালিকায় এক বা একাধিক ফল থাকে। বাজারে মাল্টা, আপেল, আঙুর বা আনারের মতো আমদানি করা ফলের দাম সাধারণত বেশি থাকে। এর পরিবর্তে কলা, পেঁপে, বরই, আনারস, তরমুজ প্রভৃতি দেশি ও মৌসুমি ফল বেছে নিলে খরচ কমে। কারণ, বাজারে মৌসুমি ফলের সরবরাহ বেশি থাকে এবং দাম তুলনামূলক কম থাকে।

স্থানীয় বাজারের তুলনায় কিছু কিছু ক্ষেত্রে দূরের বাজার থেকে তুলনামূলক কম দামে পণ্য পাওয়া যায়। এ বিষয়টিও ভোক্তারা মাথায় রাখতে পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে একাধিক প্রয়োজনীয় পণ্য একসঙ্গে কিনে আনলে পরিবহন খরচ কমানো সম্ভব।

৩. ভাজাপোড়া কমান

ইফতারিতে অনেক সময় উচ্চ মূল্যের খাবার যেমন ফাস্ট ফুড, বিরিয়ানি, মিষ্টান্ন ইত্যাদি খাওয়া হয়। অতিরিক্ত ভাজাপোড়ার উপকরণ খরচ বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যের ঝুঁকিও বাড়ায়। পুষ্টিবিদেরা জানান, ফল, সালাদ, ডাল বা ঘরে বানানো শরবত সাশ্রয়ী ও স্বাস্থ্যকর বিকল্প হতে পারে।

৪. ঘরে তৈরি খাবারে জোর

বাজারের তৈরি প্যাকেটজাত ইফতারি আইটেমের বদলে ঘরে বানানো বুটের ডাল, পেঁয়াজু, বেগুনি বা শরবত খরচ কমায়। একবারে বেশি মসলা প্রস্তুত করে ফ্রিজে সংরক্ষণ করলে সময় ও জ্বালানি দুটিই সাশ্রয় হয়। তাই বাইরের খাবার কিনে খাওয়ার বদলে ঘরেই রান্না করার চেষ্টা করুন। আবার বিভিন্ন কোমল পানীয় বা জুসের বদলে পানি বা সাধারণ শরবত পান করতে পারেন। বাইরে বের হলে সঙ্গে বোতলে পানি রেখে নিলে আলাদা করে তা কেনার প্রয়োজন পড়বে না।

৫. মাংসের বিকল্প ভাবুন

প্রতিদিন গরু বা খাসির মাংসের বদলে মুরগি, ডিম, ডাল, সবজি বা ছোট মাছ রাখলে খরচ কমে। পুষ্টিবিদদের মতে, বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্যতালিকা স্বাস্থ্য ও বাজেট উভয়ের জন্য ভালো। তাই প্রতিদিন গরু বা খাসির মাংসের বদলে ডাল, শিম, ডিম বা ছোলা ব্যবহার করে প্রোটিনের চাহিদা মেটাতে পারেন। এর সঙ্গে মুরগি, ছোট মাছ বা সস্তা ধরনের মাছ বেছে নিলেও খরচ কমানো যায়।

৬. অপচয় রোধে সচেতনতা

রোজার সময় অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি রান্না হলে খাবার নষ্ট হয়। পরিবারের সদস্যসংখ্যা অনুযায়ী পরিমিত রান্না করলে অপচয় কমে। অবশিষ্ট খাবার সংরক্ষণ করে পরের বেলায় ব্যবহার করা যেতে পারে। আবার একসঙ্গে পরিবার বা বন্ধুদের মধ্যে ইফতারি ভাগাভাগি করা যায়। এর মাধ্যমে আপনি অতিরিক্ত খরচ থেকে বাঁচতে পারবেন এবং খাবারেও বৈচিত্র্য আনা সম্ভব হবে।

৭. অফার যাচাই করে কেনাকাটা

চাল, ডাল, ছোলা, তেল, চিনি— এসব দীর্ঘমেয়াদি পণ্য একসঙ্গে কিনলে তুলনামূলক কম দামে পাওয়া যায়। বিভিন্ন সুপারশপ ও মুদির দোকানগুলো রোজায় বিশেষ ডিসকাউন্ট বা কুপন অফার করে থাকে। আগেভাগে এ ধরনের অফারের খোঁজ নেওয়া এবং তার ভিত্তিতে কেনাকাটা করলে যথেষ্ট সাশ্রয় করা সম্ভব। বিশেষ করে বৃহৎ পরিমাণে কেনাকাটা করলে বেশি মূল্যছাড় পাওয়া যেতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে বড় বড় শপিং মল বা সুপারশপের চেয়ে স্থানীয় বাজার বা ফুটপাত থেকে অনেক পণ্য সস্তায় পাওয়া যায়। তবে পণ্যটির গুণগত মান ঠিক আছে কি না, সে বিষয়ে সতর্ক থাকুন।

৮. বিদ্যুৎ ও গ্যাস ব্যবহারে সতর্ক থাকা

রোজায় রান্নাবান্না বেশি হওয়ায় বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিল বাড়তে পারে। একসঙ্গে রান্না করা, প্রেশার কুকার ব্যবহার ও অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক যন্ত্র বন্ধ রাখা গেলে ব্যয় কমবে।

৯. সামাজিক আয়োজনে সংযম

ইফতার মাহফিল বা দাওয়াতে অযথা আড়ম্বর না করে সীমিত আয়োজন করলে খরচ কমানো সম্ভব। এর সমাধান হিসেবে অনেকেই যৌথভাবে ইফতার আয়োজন করে খরচ ভাগাভাগি করার পন্থা অবলম্বন করেন।

১০. ঈদ শপিংয়ে দায়িত্বশীল হোন

রোজার শেষ দিকে খরচের আরেকটি চাপ আসে ঈদের কেনাকাটায়। ঈদে নতুন পোশাক কিনতে গেলে একাধিক দোকান থেকে দাম তুলনা করুন। আগের অভিজ্ঞতা থাকলে আপনি অনলাইন দোকানগুলো থেকেও সাশ্রয়ী দামে পোশাক কিনতে পারেন।

অর্থনীতিবিদেরা বলেন, রোজা হলো সংযমের মাস। তাই ভোগের চেয়ে প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিলে এবং পরিকল্পিতভাবে খরচ করলে ইবাদতের এ মাসে আর্থিক স্বস্তিও বজায় রাখা সম্ভব।