দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিমেন্ট খাতের কোম্পানিগুলোর মধ্যে আয়ের দিক থেকে শীর্ষে ক্রাউন সিমেন্ট।

করোনার মধ্যেও স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ভালো ব্যবসা করেছে দেশের সিমেন্ট খাত। সর্বশেষ ২০২০-২১ অর্থবছরে সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর আয় স্বাভাবিক সময়ের আয়কে ছাড়িয়ে গেছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত সিমেন্ট খাতের সাত কোম্পানির সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
দেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত সিমেন্ট কোম্পানিগুলোর মধ্যে পাঁচটি দেশি মালিকানাধীন। বাকি দুটি বহুজাতিক কোম্পানি। দেশি পাঁচটি কোম্পানি হলো—এমআই সিমেন্ট (ব্র্যান্ড ক্রাউন সিমেন্ট), প্রিমিয়ার সিমেন্ট, কনফিডেন্স সিমেন্ট, মেঘনা সিমেন্ট ও আরামিট সিমেন্ট। আর বহুজাতিক কোম্পানি দুটি হলো—লাফার্জহোলসিম ও হাইডেলবার্গ সিমেন্ট। দেশি কোম্পানিগুলোর আর্থিক বছর জুলাই-জুন, আর বহুজাতিক দুই কোম্পানির আর্থিক বছর জানুয়ারি-ডিসেম্বর ভিত্তিতে হিসাব করা হয়। সেজন্য প্রথম আলোর পর্যালোচনায় দেশি কোম্পানিগুলোর ২০২০-২১ অর্থবছর ও বহুজাতিক কোম্পানি দুটির ২০২১ সালের ৯ মাসের (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) আর্থিক প্রতিবেদন বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১২ মাসের হিসাবে আয়ের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে দেশি ক্রাউন সিমেন্ট। করোনার মধ্যেও ২০২০-২১ অর্থবছরে কোম্পানিটির আয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৩২ কোটি টাকা। এটি স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে অনেক বেশি, এমনকি গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যেও সর্বোচ্চ।
তবে ১২ মাসের পূর্ণাঙ্গ হিসাবে আয়ের দিক থেকে ক্রাউন সিমেন্টকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বহুজাতিক লাফার্জহোলসিম। কারণ, গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসেই কোম্পানিটি ১ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা আয় করেছে। বাকি তিন মাসের আয় যোগ হলে বার্ষিক বিক্রিতে ক্রাউন সিমেন্টকে যে ছাড়িয়ে যাবে তা বলাই যায়। আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিমেন্ট খাতের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর আয়ে সর্বনিম্ন ৪ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৫৬ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। আর মুনাফায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে সর্বনিম্ন ৪০ থেকে সর্বোচ্চ ৭৬১ শতাংশ পর্যন্ত।
করোনার মধ্যে সিমেন্টে এত ভালো ব্যবসা হওয়ার পেছনে বেশ কিছু কারণ উল্লেখ করেছেন এ খাতের উদ্যোক্তারা। তাঁরা বলছেন, ২০২০ সালের মার্চে দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছিল। তাতে কয়েক মাস ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ ছিল। কিন্তু ২০২১ সালের প্রথম ভাগে করোনা সংক্রমণ কিছুটা কমে এলে জীবনযাত্রা অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। ফলে সব ধরনের নির্মাণকাজে অস্বাভাবিক গতি সঞ্চার হয়। পাশাপাশি সরকারি বড় বড় কিছু প্রকল্পের কাজও বেশ গতি পায়। এসবের সুফল পেয়েছে সিমেন্ট খাতের কোম্পানিগুলো। ২০২১ সালের প্রথমার্ধে চাহিদা এতটাই বেড়েছিল যে সিমেন্ট পেতে গ্রাহকদের হিমশিম খেতে হয়।
ক্রাউন ব্র্যান্ডের সিমেন্ট প্রস্তুতকারক কোম্পানি এম আই সিমেন্টের উপদেষ্টা মাসুদ খান বলেন, ২০২১ সালের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) সিমেন্ট খাতে ৩৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি হয়। একই সময়ে বস্তাপ্রতি দাম (৫০ কেজির বস্তা) গড়ে ৩০ টাকা করে বৃদ্ধি পায়, যার প্রভাব পড়েছে কোম্পানিগুলোর আয়ে। আবার ওই সময়ে দেশে রেকর্ড পরিমাণ প্রবাসী আয় আসে। তাতে গ্রামেগঞ্জে মানুষের মধ্যে বাড়ি করার প্রবণতা বাড়ে। এ ক্ষেত্রে যাদের উৎপাদন সক্ষমতা যত বেশি ছিল, তারা তত বেশি ভালো করেছে।
তবে খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, ভালো ব্যবসা হলেও গত বছরের শুরু থেকেই কিন্তু কাঁচামালের দাম বাড়তে শুরু করে। পাশাপাশি জাহাজ ভাড়াও বৃদ্ধি পায়। যে কারণে আয়ের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলো চমক দেখালেও মুনাফায় তা দেখাতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে অবশ্য চমক দেখিয়েছে বহুজাতিক কোম্পানি লাফার্জহোলসিম। কারণ, সিমেন্টের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকার তৈরির নিজস্ব উৎস রয়েছে কোম্পানিটির। এ ছাড়া গত বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটি চুনাপাথরের নতুন ব্যবসা থেকেও ভালো আয় করে। বদৌলতে শেয়ারবাজারের কোম্পানিগুলোর মধ্যে মুনাফায় বড় চমক দেখিয়েছে লাফার্জহোলসিম।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে লাফার্জহোলসিম ৯ মাসেই (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) সর্বোচ্চ ৩০৮ কোটি টাকা মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৩৭৪ শতাংশ বেশি। মুনাফার পরিমাণে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে কনফিডেন্স সিমেন্ট। কোম্পানিটি গত অর্থবছরে ১২৪ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। তাদের প্রবৃদ্ধি হয় ১৬৩ শতাংশ। যদিও কনফিডেন্সের মুনাফার বড় অংশই এসেছে সহযোগী বিদ্যুৎ কোম্পানির আয় থেকে। টাকার অঙ্কে মুনাফায় এর পরের অবস্থানে রয়েছে যথাক্রমে ক্রাউন সিমেন্ট, প্রিমিয়ার সিমেন্ট, হাইডেলবার্গ সিমেন্ট, মেঘনা সিমেন্ট ও আরামিট সিমেন্ট।
তবে মুনাফা প্রবৃদ্ধিতে শীর্ষে রয়েছে ক্রাউন সিমেন্ট। ২০১৯-২০ অর্থবছরে কোম্পানিটি ১৩ কোটি টাকা লোকসান দেয়। সেই লোকসান কাটিয়ে গত অর্থবছরে ৮৬ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। এতে এক বছরে কোম্পানিটির মুনাফায় প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৭৬১ শতাংশ। অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে মুনাফায় হাইডেলবার্গের ৪২৩ শতাংশ, প্রিমিয়ারের ১৪০ শতাংশ, আরামিটের ১০১ শতাংশ ও মেঘনা সিমেন্টের ৪০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
প্রিমিয়ার সিমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আমিরুল হক বলেন, ‘করোনার মধ্যেও আমরা উৎপাদন অব্যাহত রেখেছিলাম। সরকারি প্রকল্পগুলোতে নিয়মিত পণ্য সরবরাহ করে গেছি। প্রকল্পের বাইরে খুচরা পর্যায়েও সিমেন্টের চাহিদা অনেক বেড়েছিল। এতে আমরা ভালো ব্যবসা করেছি। যদি কাঁচামাল ও জাহাজ ভাড়া না বাড়ত তবে মুনাফা আরও বেশি হতো।’