দুই বছরের লোকসান কাটিয়ে আবারও মুনাফায় ফিরেছে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী এসিআই। সহযোগী সব প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় মিটিয়ে অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের বিবেচনায় মুনাফার ধারায় ফিরল প্রতিষ্ঠানটি। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) এসিআই সম্মিলিতভাবে ৩০ কোটি টাকা মুনাফা করেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে কোম্পানিটি ৬৫ কোটি টাকা লোকসান করেছিল। তার আগে ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে লোকসান করেছিল ৪৯ কোটি টাকা। কোম্পানিটির অর্ধবার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি হিসেবে গত রোববার অর্ধবার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এসিআই। তার আগে গত বৃহস্পতিবার কোম্পানিটির পরিচালনা পর্ষদের সভায় এই অর্ধবার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন অনুমোদন করা হয়। কোম্পানিটির প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদনে মুনাফার এই চিত্র উঠে এসেছে।
এদিকে কোম্পানিটির গত ১০ বছরের অর্ধবার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসের ব্যবসার হিসাবে ১০ বছরের ব্যবধানে এসিআইয়ের ব্যবসা বেড়ে সাড়ে তিন গুণ হয়েছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে কোম্পানিটি প্রথমবারের মতো ৭ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকার ব্যবসা করেছে। ১০ বছর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে কোম্পানিটি ব্যবসা করেছিল ২ হাজার ২৩০ কোটি টাকার। সেই হিসাবে ১০ বছরে এসিআইয়ের ব্যবসা সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়েছে।
কোম্পানিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দীর্ঘদিন পর পরিচালন মুনাফায় ফিরেছে এসিআই গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এসিআই লজিস্টিকসের আওতায় পরিচালিত সুপারশপ স্বপ্ন। পাশাপাশি শিল্পগোষ্ঠীটির ওষুধ, লবণ ও গাড়ির ব্যবসায়ও ভালো প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তাতে সব মিলিয়ে শিল্পগোষ্ঠীটি গত দুই বছরের লোকসান কাটিয়ে মুনাফায় ফিরেছে।
আর্থিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে এসিআই (সহযোগী প্রতিষ্ঠানসহ) পরিচালন মুনাফা করেছে ৬৮৫ কোটি টাকা। এই পরিচালন মুনাফা থেকে ব্যাংকঋণের সুদ, ধারদেনা, কর, শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের অর্থ পরিশোধের পর প্রকৃত মুনাফা কমে দাঁড়ায় ৩০ কোটি টাকায়। পরিচালন মুনাফার বড় অংশই ব্যাংকঋণের সুদসহ অন্যান্য আর্থিক খরচ মেটাতে ব্যয় হয়েছে। এই বাবদ উল্লেখিত ছয় মাসে কোম্পানিটির খরচ হয় ৪৯২ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে যার পরিমাণ ছিল ৪৪৪ কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির আর্থিক খরচ বেড়েছে ৪৮ কোটি টাকা বা প্রায় ১১ শতাংশ।
আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসিআই গ্রুপ চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে ৭ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকার যে ব্যবসা করেছে, তাতে মূল কোম্পানি এসিআইয়ের ব্যবসার পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৭০৮ কোটি টাকার। বাকি ৫ হাজার ৮৬ কোটি টাকার ব্যবসা ছিল সহযোগী অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর। মূল প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোও এবার ভালো ব্যবসা করায় সার্বিকভাবে কোম্পানিটি ছয় মাসে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড ব্যবসা করেছে।
জানতে চাইলে এসিআইয়ের কোম্পানি সচিব মোহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আমাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এসিআই লজিস্টিকস, ওষুধ, লবণ ও মোটরসের ব্যবসা বেশ ভালো হয়েছে। দীর্ঘদিন পর এসিআই লজিস্টিকসের আওতায় পরিচালিত স্বপ্ন পরিচালন মুনাফায় ফিরেছে। সব মিলিয়ে তাতে এসিআই লোকসান কাটিয়ে আবারও মুনাফার ধারায় ফিরে এসেছে।’
এদিকে বৃহস্পতিবার এসিআইয়ের পর্ষদ সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে নতুন করে কোম্পানিটি এসিআই লজিস্টিকস ৬৪০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। এ জন্য এসিআই লজিস্টিকস ৬৪ লাখ প্রেফারেন্স বা অগ্রাধিকারমূলক শেয়ার ইস্যু করবে। প্রতিটি প্রেফারেন্স শেয়ারের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এসিআই লজিস্টিকসের আওতায় পরিচালিত সুপারশপ স্বপ্ন পরিচালন মুনাফায় ফিরলেও বড় অঙ্কের ব্যাংকের ঋণের কারণে প্রতিষ্ঠানটি প্রকৃত মুনাফায় ফিরতে পারছে না। তাই প্রতিষ্ঠানটিকে পুরোপুরি লাভজনক করতে ব্যাংকঋণ কমিয়ে আনার জন্য নতুন করে এই বিনিয়োগ করছে এসিআই। বিনিয়োগের এই অর্থে ব্যাংকঋণ পরিশোধ করা হলে তাতে ঋণের সুদবাবদ প্রতিষ্ঠানটির খরচ কমে যাবে।
দুই বছর পর মুনাফায় ফিরলেও শেয়ারবাজারে গতকাল সোমবার এসিআইয়ের শেয়ারের দাম কমেছে। এদিন প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ারের দাম ২ টাকা বা প্রায় ১ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ২০৬ টাকায়। এদিন কোম্পানিটির প্রায় পৌনে চার কোটি টাকার সমমূল্যের শেয়ারের হাতবদল হয়।