‘রাজনৈতিক রূপান্তর ও শেয়ারবাজার: গণ–অভ্যুত্থান থেকে শিক্ষা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজের সহযোগী অধ্যাপক অনিরুদ্ধ মিত্র
‘রাজনৈতিক রূপান্তর ও শেয়ারবাজার: গণ–অভ্যুত্থান থেকে শিক্ষা’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজের সহযোগী অধ্যাপক অনিরুদ্ধ মিত্র

জুলাই অভ্যুত্থানের পর অনিশ্চয়তায় শেয়ারবাজারের পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হয়, গবেষণার তথ্য

২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থান বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে নতুনভাবে বড় ধরনের কোনো পতন ঘটায়নি। তবে অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা ফেরেনি। এ কারণে শেয়ারবাজারের সম্ভাব্য পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজের সহযোগী অধ্যাপক অনিরুদ্ধ মিত্রের করা এক গবেষণায় এমন পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে।

আজ মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগে সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসির উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে গবেষণাটি উপস্থাপন করেন গবেষক অনিরুদ্ধ মিত্র। গবেষণাটি তিনি লুকা ভিভাস নিকোনোরভের সঙ্গে যৌথভাবে করেছেন।

অনুষ্ঠানে সেন্টার অন বাজেট অ্যান্ড পলিসির পরিচালক অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম, বার্ড কলেজের শিক্ষক ফাহমিদুল হক প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে গবেষক অনিরুদ্ধ মিত্র জানান, এই গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে, তা নির্ণয় করা। তিনি আরও জানান, রাজনৈতিক সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে বিশ্বে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা হলেও অধিকাংশ গবেষণা যুদ্ধ বা গৃহযুদ্ধকেন্দ্রিক। গণ–অভ্যুত্থান বা তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত রাজনৈতিক আন্দোলনের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা তুলনামূলকভাবে কম।

গবেষণায় বাংলাদেশের শেয়ারবাজারের সূচক হিসেবে বৈশ্বিক বিশ্লেষণ সূচক ‘এমএসসিআই’ ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের পুঁজিবাজারের বড় ও মাঝারি মূলধনি কোম্পানিগুলোর শেয়ারের অবস্থা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। আর জুলাই অভ্যুত্থানের প্রকৃত প্রভাব নির্ধারণে ‘অগমেন্টেড সিনথেটিক কন্ট্রোল’ পদ্ধতি ব্যবহার করেন গবেষক। এই পদ্ধতিতে সংগতিপূর্ণ বিভিন্ন তথ্যের ভিত্তিতে একটি কাল্পনিক বাংলাদেশ তৈরি করা হয়, যেখানে ধরে নেওয়া হয় যে জুলাই অভ্যুত্থান ঘটেনি। এরপর সেই কাল্পনিক পরিস্থিতির সঙ্গে বর্তমান বাস্তব বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের গতিপ্রকৃতি তুলনা করা হয়।

মডেল তৈরিতে চারটি প্রধান অর্থনৈতিক সূচক বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। এগুলো হলো রপ্তানি আয়, ডলার–টাকার বিনিময় হার, ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ। গবেষকের মতে, এসব সূচক একটি দেশের পুঁজিবাজারের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

জুলাই অভ্যুত্থান পুঁজিবাজারকে আরও নিম্নমুখী করেনি

গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের আর্থিক খাত ও শেয়ারবাজারের দুর্বলতা জুলাই অভ্যুত্থানের অনেক আগেই শুরু হয়েছিল। ২০২১ সালের শেষ প্রান্তিকে করোনা–পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের গতি থেমে যায়। এরপর ২০২২ সালে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। যুদ্ধের কারণে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, রপ্তানিতে চাপ, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ কমা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মতো একাধিক কারণ পুঁজিবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বার্ড কলেজের শিক্ষক অনিরুদ্ধ মিত্র জানান, এসব অর্থনৈতিক চাপ জুলাই অভ্যুত্থানের আগেই আর্থিক খাতকে দুর্বল করে দেয়। ফলে শেয়ারবাজারের নিম্নমুখী প্রবণতা অভ্যুত্থানের আগে থেকেই চলছিল। গবেষণায় এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে জুলাই অভ্যুত্থান ওই নিম্নমুখী প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে। তবে অভ্যুত্থানের পর নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিশ্চয়তার কারণে অর্থনীতির স্বাভাবিক সমন্বয়ের প্রক্রিয়া ধীর হয়ে যায়। ফলে যে পুনরুদ্ধার হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, তা বিলম্বিত হয়েছে।

অনিরুদ্ধ মিত্র বলেন, ‘বিশ্লেষণ অনুযায়ী যদি জুলাই অভ্যুত্থান না ঘটত, তাহলে ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে যেতে পারত।’

যদিও এই গবেষণার জন্য ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত সময়ের তথ্য নেওয়া হয়েছে। পরের কয়েক মাসে দেশের শেয়ারবাজারের সূচক বেড়েছে।

অন্যদিকে অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে আলোচকেরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে পুঁজিবাজারের ক্ষেত্রে অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, পরিসংখ্যানগত সূচকের সঙ্গে বাজারের বাস্তবতার প্রকৃত মিল থাকে না। অর্থাৎ অর্থনীতির তত্ত্ব ও তথ্য মেনে চলে দেশের পুঁজিবাজার চলে না। কারণ, এখানে মুষ্টিমেয় কিছু লোক বাজারকে প্রায়ই প্রভাবিত করেন।

উপস্থাপনায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গেও বাংলাদেশের পরিস্থিতির তুলনা করা হয়। গবেষক উল্লেখ করেন, পাকিস্তান, তিউনিসিয়া, মিসর ও আরব বসন্তের সময় রাজনৈতিক অস্থিরতার পর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর শেয়ারবাজারে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব দেখা গিয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একই ধরনের তাৎক্ষণিক ধসের প্রমাণ মেলেনি; বরং আগে থেকে চলমান নিম্নমুখী প্রবণতাই অব্যাহত ছিল।

অনিরুদ্ধ মিত্র বলেন, এই বিশ্লেষণ নতুন কয়েকটি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো জেনারেশন জেড (জেন–জি) নেতৃত্বাধীন গণ–অভ্যুত্থানকে রাজনৈতিক অর্থনীতির গবেষণায় আলাদা বিশ্লেষণী কাঠামো হিসেবে দেখা উচিত কি না। পাশাপাশি ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাতে বাংলাদেশ কেন একই ধরনের অন্যান্য রপ্তানিনির্ভর দেশের তুলনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেটিও ভবিষ্যৎ গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।