
শীত মৌসুমে আসবাব বিক্রি বাড়ে ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত।
মোট বিক্রির ৭০-৮০ শতাংশই ভিনিয়ার কাঠের আসবাব।
দেশে আসবাবের বাজার প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।
বাজারের ৩৫% ব্র্যান্ড ও ৭৫% নন-ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানগুলোর দখলে।
শীত মৌসুমে নতুন আসবাবের চাহিদা ও বিক্রি বেড়ে যায়। এর তিনটি বড় কারণ রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে বছরের এই সময়ে বিয়েশাদি বেশি হয়, তাই বরের বাড়ি আসবাব পাঠানো হয়; অনেকেই বাসাবাড়ি পাল্টান; আর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নতুন অফিসে কার্যক্রম শুরু করে।
আসবাব ব্যবসায়ীরা জানান, শীত আসতেই তাঁদের বেচাকেনা কিছুটা বেড়েছে। যদিও তা এখনো কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নয়। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো না থাকায় বিক্রি প্রত্যাশার তুলনায় কম হচ্ছে। দুই বছর ধরে আসবাব ব্যবসায়ে আগের মতো চাঙাভাব নেই।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, দেশের শীত মৌসুম নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি—এই চার মাসে নতুন আসবাব বিক্রি সবচেয়ে বেশি হয়। এ সময় বেডরুম সেট (খাট, ড্রেসিং টেবিল ও আলমারি), সোফা ও ডাইনিং টেবিলের চাহিদা বেশি থাকে। আজকাল ক্রেতাদের বড় অংশই অবশ্য প্রক্রিয়াজাত কাঠের আসবাব কেনার দিকে ঝুঁকছেন। এসব আসবাবে ভিনিয়ার ও মিডিয়াম ডেনসিটি ফাইবার বোর্ড (এমডিএফ) ধরনের কাঠ বেশি ব্যবহৃত হয়। ধরন ও নকশাভেদে এসব আসবাবের দাম মেহগনি ও সেগুন কাঠের আসবাবের তুলনায় ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কম।
বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্পমালিক সমিতির মহাসচিব ও নাদিয়া ফার্নিচারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ করিম মজুমদার বলেন, বছরের শুরুতে বাণিজ্য মেলা থাকে এবং শীত মৌসুমকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অফার দেওয়া হয়। ফলে এই সময়ে বিক্রি কিছুটা বাড়ে। বিয়ে ও অন্যান্য সামাজিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে শীত মৌসুমে বিক্রি সাধারণত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে।
-বছরের শুরুতে বাণিজ্য মেলা থাকে এবং শীত মৌসুমকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অফার দেওয়া হয়। ফলে এই সময়ে বিক্রি কিছুটা বাড়ে। বিয়ে ও অন্যান্য সামাজিক আয়োজনকে কেন্দ্র করে শীত মৌসুমে বিক্রি সাধারণত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ে।—এ করিম মজুমদার, মহাসচিব বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্পমালিক সমিতি ও এমডি, নাদিয়া ফার্নিচার।
রাজধানীর বিভিন্ন আসবাব ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে প্রক্রিয়াজাত কাঠ ও ফেব্রিকস (সুতার কাপড়) দিয়ে তৈরি নতুন ধরনের আসবাবের চাহিদা বেশি। ঢাকার বাইরে পার্টিকেল ও মেলামাইন বোর্ডের তৈরি আসবাবের চাহিদা তুলনামূলক বেশি।
ব্যবসায়ীরা জানান, সারা দেশে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৪০ হাজার আসবাব তৈরির প্রতিষ্ঠান রয়েছে। দেশে স্থানীয় আসবাবের বাজারের আকার প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে হাতিল, নাভানা, ব্রাদার্স, হাইটেক, রিগ্যালসহ বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দখলে রয়েছে ৩৫ শতাংশ বাজার। বাকি ৭৫ শতাংশ ব্যবসা নন-ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে।
হাতিলের বিপণন বিভাগের পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, প্রতিবছর সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ও খুচরা পর্যায়ে হাতিলের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার আসবাব বিক্রি হয়। এর মধ্যে শীত মৌসুমে মোট খুচরা বিক্রির প্রায় ৪০ শতাংশ সম্পন্ন হয়।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ব্র্যান্ড ও নন-ব্র্যান্ড মিলিয়ে এক হাজারের বেশি আসবাবের দোকান রয়েছে। তবে নতুন আসবাবের জন্য পান্থপথ ও মিরপুর এলাকা বিশেষভাবে পরিচিত। এই দুই এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে দুই শতাধিক নতুন আসবাবের দোকান রয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে এ দুটি এলাকায় ক্রেতাদের ভালো আনাগোনা লক্ষ করা গেছে।
পান্থপথের নূর ফার্নিচার মার্টের স্বত্বাধিকারী নূর মোহাম্মদ বলেন, বছরের আট মাসে যে পরিমাণ আসবাব বিক্রি হয়, শীত মৌসুমের চার মাসে তার চেয়েও বেশি বিক্রি হয়। তবে মোট বিক্রির ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই ভিনিয়ার ধরনের প্রক্রিয়াজাত কাঠের আসবাব। গত বছর শীতের মৌসুমে মাসে ৫০ লাখ টাকার আসবাব বিক্রি হলেও এবার হচ্ছে ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টাকার আসবাব।
আসবাবের দাম মূলত নির্ভর করে কোন কাঠ দিয়ে তৈরি, তার ওপর। পাশাপাশি নকশা, বার্নিশ ও আনুষঙ্গিক উপকরণের ওপরও দামের পার্থক্য তৈরি হয়। ব্র্যান্ডের আসবাবের দাম সাধারণত নন-ব্র্যান্ডের তুলনায় অনেক বেশি হয়। ক্রেতাদের মধ্যে মধ্যবিত্তদের কাছে ভিনিয়ার কাঠের তৈরি আসবাবের চাহিদা সবচেয়ে বেশি। এ ধরনের প্রক্রিয়াজাত কাঠের আসবাব প্রাকৃতিক কাঠের তুলনায় ৫০ শতাংশের বেশি কম দামে পাওয়া যায়।
ভিনিয়ার কাঠের তৈরি খাট কিনতে খরচ হয় ১২ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা। তবে বেশির ভাগ ব্র্যান্ডের একটি খাটের দাম ৩০ হাজার টাকার ওপরে। পছন্দসই খাট কিনতে অনেক ক্ষেত্রে ৪০ হাজার টাকার বেশি খরচ করতে হয়। সেগুন কাঠের তৈরি একটি খাটের দাম নকশাভেদে ৩৫ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায়ও খাট কেনাবেচা হয়।
ব্র্যান্ডভেদে ছয় আসনের ডাইনিং টেবিল কিনতে কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা লাগে। রাজধানীর বিভিন্ন নন-ব্র্যান্ড আসবাবের দোকান ঘুরে দেখা যায়, বর্তমানে সেগুন কাঠের তৈরি একটি সোফার দাম ধরন ও নকশাভেদে ৩০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা। তবে ব্র্যান্ডের সোফার দাম ৫০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত। একই নকশার ভিনিয়ার কাঠের তৈরি সোফা পাওয়া যায় ২৫ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকার মধ্যে। সেগুন কাঠের ড্রেসিং টেবিলের দাম ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার টাকা, আর ভিনিয়ার কাঠের তৈরি ড্রেসিং টেবিল পাওয়া যায় ১২ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকায়।
বাংলাদেশ ফার্নিচার শিল্প মালিক সমিতির মিরপুর অঞ্চলের সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান বলেন, গত কয়েক বছরে কাঁচামালের দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। তবে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার কথা বিবেচনায় রেখে সে হারে আসবাবের দাম বাড়ানো হয়নি। সারা বছর মন্দা থাকলেও শীত মৌসুমে আসবাবের বেচাকেনা প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।