সাভারের আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় রোববার রাতে প্রিটি কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড কারখানা চত্বরে সিলিন্ডারবাহী কাভার্ড ভ্যানে বিস্ফোরণের ঘটনায় সাতজন নিহত হন। গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থলের চিত্র
সাভারের আশুলিয়ার জামগড়া এলাকায় রোববার রাতে প্রিটি কম্পোজিট টেক্সটাইল লিমিটেড কারখানা চত্বরে সিলিন্ডারবাহী কাভার্ড ভ্যানে বিস্ফোরণের ঘটনায় সাতজন নিহত হন। গতকাল দুপুরে ঘটনাস্থলের চিত্র

জ্বালানি সংকটে শিল্পকারখানায় অনিরাপদ গ্যাস পরিবহন বেড়েছে

প্রশাসন ও সিএনজি ফিলিং স্টেশন মালিকদের ‘নীরব সম্মতি’তে ঝুঁকিপূর্ণভাবে সিলিন্ডারভর্তি গ্যাস যায় শিল্পকারখানায়।

সরবরাহ লাইনে গ্যাসের চাপ কম থাকলে উৎপাদন সচল রাখতে সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে ভরে গ্যাস নেন তৈরি পোশাক ও বস্ত্র, সিরামিকসহ বিভিন্ন খাতের অনেক শিল্পকারখানার মালিকেরা। এভাবে অনিরাপদ সিলিন্ডারে গ্যাস পরিবহন গ্যাস আইন–২০১০ ও গ্যাস বিতরণ বিধিমালা–২০১৬ অনুযায়ী নিষিদ্ধ। তবে বিষয়টি অনেক দিন ধরে প্রকাশ্যেই চলছে। সাম্প্রতিক গ্যাস–সংকটে এ প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

টানা দুই মাসের সংকট শেষে গত সপ্তাহে গ্যাসের সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ার পরও যে সিলিন্ডারে গ্যাস পরিবহন বন্ধ হয়নি, তা প্রমাণ করে ঢাকার আশুলিয়ার ঘটনাটি। 

প্রিটি কম্পোজিট টেক্সটাইলের কর্তৃপক্ষ বয়লার চালাতে কাভার্ড ভ্যানে করে রোববার সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাসের (সিএনজি) সিলিন্ডার নিয়ে আসে। সেই গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের সাতজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১৯ জন। এ ঘটনায় সিলিন্ডারবাহী গাড়িসহ পাঁচ-ছয়টি গাড়ি পুড়ে গেছে।

জানা যায়, আইনে নিষিদ্ধ হলেও প্রশাসন ও সিএনজি ফিলিং স্টেশন মালিকদের ‘নীরব সম্মতি’তে ঝুঁকিপূর্ণভাবে সিলিন্ডার নিয়ে যাওয়া হয় শিল্পকারখানায়। এই বাণিজ্যকে ঘিরে একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠীও গড়ে উঠেছে। তারা প্রতি ঘনমিটার সিএনজির দাম ৫–১০ টাকা বা তার বেশি দামে শিল্পকারখানায় সরবরাহ করছে। এতে সংশ্লিষ্ট সিএনজি ফিলিং স্টেশন মালিকের পকেটও ভারী হচ্ছে। 

তৈরি পোশাকশিল্প মালিকপক্ষের নেতারা বলছেন, খাতের গ্যাস–সংকটে উৎপাদন সচল রাখতে বাধ্য হয়েই অনেক কারখানা মালিক সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে ঝুঁকিপূর্ণভাবে সিলিন্ডারে ভরে গ্যাস আনছেন। তবে শ্রমিকনেতাদের ভাষ্য, এ ধরনের শিল্পদুর্ঘটনাকে কোনোভাবেই শুধু দুর্ঘটনা বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। গ্যাস সিলিন্ডার পরিবহন, সংরক্ষণ ও ব্যবহারে কোনো অনিয়ম বা অবহেলা থাকলে তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। 

জানতে চাইলে পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান মো. আব্দুল মান্নান প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে করে শিল্পকারখানায় গ্যাস দেওয়ার কোনো অনুমতি কখনো দেওয়া হয়নি। তবে সংকটের সময় অনেক শিল্পকারখানা এই কাজটি করে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে। এ জন্য আমরা বিভিন্ন সময় অভিযানও পরিচালনা করেছি।’ 

মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার

আশুলিয়ার প্রিটি কম্পোজিট টেক্সটাইলে বিস্ফোরণের সময় ঘটনাস্থলে ১০–১২টি কাভার্ড ভ্যান ছিল। পরে কয়েকটি ভ্যান সরিয়ে নেওয়া হয়। ঘটনাস্থলে ৯টি সিলিন্ডারবাহী কাভার্ড ভ্যান পান ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। প্রতিটি কাভার্ড ভ্যানে ৯০ থেকে ১০০টি করে সিলিন্ডার ছিল। 

গতকাল সোমবার দুপুরে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, কারখানা থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে খাবার দোকান রানা হোটেলের ভেতর একটি সিলিন্ডার পড়ে আছে। সেই সিলিন্ডারের গায়ে খোদাই করে লেখা রয়েছে, ‘অ্যাপ্রোভড পিআরডি সিএনজি অনলি, ডু নট ইউজ আফটার ২০২১।’ তার মানে হচ্ছে, সিলিন্ডারটি মেয়াদোত্তীর্ণ।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন সিএনজি ফিলিং স্টেশন মালিক বলেন, আইনে নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে কারখানায় সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহে একশ্রেণির মধ্যস্বত্বভোগী গড়ে উঠেছে। তাদের বড় অংশই স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী। তাঁরা স্টেশনে গ্যাস নিতে নিম্নমানের সিলিন্ডার নিয়ে আসেন। 

অনুমতি চেয়েও পায়নি দুই সমিতি

গত জুলাইয়ে তীব্র গ্যাস–সংকট শুরু হলে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ এবং নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানাকে সিলিন্ডারে গ্যাস দিতে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ মালিক সমিতিকে চিঠি দেয়। তারা নিজেরা সিদ্ধান্ত না নিয়ে পেট্রোবাংলার কাছে নির্দেশনা চায়। তবে পেট্রোবাংলা এ–সংক্রান্ত কোনো নির্দেশনা দেয়নি। তবে শিল্পকারখানায় সিলিন্ডারে করে গ্যাস যেতে থাকে ঠিকই। 

বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান গতকাল রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘জ্বালানি–সংকটের কারণে সিলিন্ডারে গ্যাস নেওয়ার প্রবণতা আগেও ছিল। ইদানীং সেটি বেড়েছে। আমরা সিলিন্ডারের গ্যাস ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিলাম। অনুমতি দেওয়া হয় নাই। আবার শক্তভাবে বন্ধও করা হয়নি।’ তিনি বলেন, ‘গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে সচেতনতা বাড়াতে মালিকদের চিঠি দেব। সংকটে এলপিজি সরবরাহ করা গেলে ভালো হয়। তবে মূল বিষয় হচ্ছে, শিল্পে গ্যাসের চাপ বাড়াতে হবে।’ 

শিল্পকারখানার যাতে ফিলিং স্টেশন থেকে গ্যাস নিতে পারে, সে জন্য নীতিমালা করে দেওয়া দরকার বলে মনে করেন বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ মালিক সমিতির মহাসচিব ফারহান নূর। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের সদস্য প্রতিষ্ঠান সিলিন্ডারে গ্যাস দিতে বাধ্য হচ্ছে। কারণ, স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন এভাবে শিল্পকারখানার জন্য গ্যাস দেওয়ার জন্য চাপ দেন।’ 

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন প্রথম আলোনিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার]