ফ্ল্যাট বা জমি কিনতে আইনি প্রস্তুতি

সারা জীবনের সঞ্চিত অর্থ দিয়ে মানুষ স্থায়ী আবাসের স্বপ্নই দেখেন। নিজের ফ্ল্যাট কিংবা এক টুকরা জমি। এ জমি বা ফ্ল্যাট কেনার সময় অনেক ক্ষেত্রে প্রতারিত হওয়ার ভয় থাকে কিংবা বৈষয়িক নানা ঝামেলার মুখোমুখি হতে হয়। এ ক্ষেত্রে কী ধরনের আইনগত প্রস্তুতি গ্রহণ করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন ব্যারিস্টার তানজিব উল আলম। তিনি বলেন, ‘বাড়ি, প্লট বা ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে কারও দ্বারা প্রলুব্ধ হয়ে তাড়াহুড়া করে কেনার চুক্তি করা উচিত নয়।

যেহেতু আপনি আপনার সঞ্চিত অর্থ দিয়ে একটি স্থায়ী ঠিকানা গড়তে চাচ্ছেন, তাই বিক্রেতাপ্রতিষ্ঠান সম্পর্কে ভালোভাবে খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি জমির দলিলপত্র ও চুক্তিপত্রগুলো একজন আইনজীবীকে দেখিয়ে নেওয়া ভালো। এরপর ফ্ল্যাট বা জমি বুকিং দিতে পারেন।’

ফ্ল্যাট বা জমি কেনার ক্ষেত্রে সবার আগে দরকার সচেতনতা—এমন ভাবনার সঙ্গে তানজিব উল আলম দিয়েছেন আরও কিছু পরামর্শ।

ফ্ল্যাট কেনার আগে প্রস্তুতি

ফ্ল্যাটটির জমির দলিল সঠিক কি না, যে প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির ফ্ল্যাটটি কিনতে যাচ্ছেন, তাঁর মালিকানা আছে কি না, ঋণের জন্য ফ্ল্যাটটি কোনো ব্যাংকের কাছে বন্ধক আছে কি না, যে কোম্পানির কাছ থেকে ফ্ল্যাট কিনছেন, সেই প্রতিষ্ঠানের সরকারি অনুমোদন এবং রাজউক কর্তৃক অনুমোদিত প্ল্যান আছে কি না ইত্যাদি অবশ্যই জেনে নিতে হবে।

এ ছাড়া ফ্ল্যাট ক্রয়-বিক্রয়সংক্রান্ত সব শর্ত ভালো করে বুঝে ও দেখে নিতে হবে। কেনার আগে একটু সতর্কতা অবলম্বন করলে প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কা কম থাকে। এরপরও কোনো সমস্যার সম্মুখীন হলে ‘রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন এবং ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০’-এর সাহায্য নিতে পারবেন।

যখন আপনি ফ্ল্যাট কেনার উদ্যোগ নিচ্ছেন, তখনই আইনি সহায়তায় চুক্তি করতে পারেন। তাতে কীভাবে ফ্ল্যাট কিনছেন, শর্তগুলো সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। ভবন নির্মাণে যেসব উপকরণ ব্যবহার করা হবে, তা চুক্তিতে উল্লেখ থাকতে হবে। ফ্ল্যাটের অনুমোদিত নকশাও আবাসন–নির্মাতা ক্রেতাকে দেখাতে এবং তা দিতে বাধ্য থাকবেন। ভবনের কোন ফ্ল্যাটটি কিনছেন, শর্তের বাইরে অতিরিক্ত কোনো অর্থ দিতে ক্রেতা বাধ্য নন এবং ক্রেতা যদি কোনো উন্নত মানের সরঞ্জাম ব্যবহার করতে চান তবে দুই পক্ষের পারস্পরিক সম্মতিক্রমে তা করতে হবে—এ বিষয়গুলো চুক্তিতে উল্লেখ থাকতে হবে।

রিয়েল এস্টেট আইন অনুযায়ী, একজন ক্রেতা তাঁর সমুদয় মূল্য পরিশোধের তিন মাসের মধ্যে আবাসন–নির্মাতা দখল হস্তান্তর, দলিল সম্পাদন ও নিবন্ধনের যাবতীয় কাজ সম্পাদন করে দেবেন। হস্তান্তরকালে আয়তন কম–বেশি হলে, তার দাম ক্রয়মূল্য অনুযায়ী তিন মাসের মধ্যে সমন্বয় করতে হবে।

আর যদি আবাসন নির্মাতাপ্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময়ে ফ্ল্যাট হস্তান্তর করতে ব্যর্থ হয়, চুক্তিতে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণসহ সব অর্থ ক্রেতাকে ছয় মাসের মধ্যে ফেরত দিতে হবে। আবার কোনো কারণে চুক্তি বাতিল করতে চাইলে নির্মাতাপ্রতিষ্ঠানকে আপনার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরিশোধিত অর্থের ১০ শতাংশ বাদ দিয়ে বাকি অর্থ তিন মাসের মধ্যে এককালীন চেক অথবা পে-অর্ডারের মাধ্যমে ফেরত দিতে হবে।

কখন আইনের সাহায্য নেবেন

চুক্তি অনুযায়ী আপনার বুকিং দেওয়া ফ্ল্যাটটি সময়মতো না হলে অথবা চুক্তি অনুযায়ী নির্মাণ–উপকরণ ব্যবহার না করলে কিংবা কোনোরকম নকশা পরিবর্তনে জটিলতা তৈরি হলে প্রথমে নিজেদের মধ্যে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করবেন। সমাধান না হলে বিষয়টি ‘সালিস আইন ২০০১’ মোতাবেক সালিসি ট্রাইব্যুনালের শরণাপন্ন হতে হবে। তখন সালিসি ট্রাইব্যুনাল বিষয়টি নিষ্পত্তি করবেন। ৩০ দিনের মধ্যে উভয় পক্ষ যদি ট্রাইব্যুনাল গঠনে ব্যর্থ হয় তাহলে যেকোনো পক্ষ বিবদমান বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য উপযুক্ত আদালতে মামলাও করতে পারবে।

এই আইনের অধীন অপরাধগুলো প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বিচার করেন। এই আইনের বিধিবিধান লঙ্ঘন করলে ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে। তাই ফ্ল্যাট কেনার সময় উপরিউক্ত বিষয়গুলো উল্লেখ করে চুক্তিতে সই করতে হবে। একবার চুক্তি হয়ে গেলে, তা থেকে বের হওয়া অনেক ঝক্কির। তাই ভালোভাবে জেনে–বুঝে তবেই ফ্ল্যাটের বুকিং দিন।

যে জমির ওপর আপনার ফ্ল্যাটটি হবে, সেই জমির মালিকানা এবং জমির দখলদার সম্পর্কে জেনে নিতে হবে। ভূমি অফিসে গিয়ে জমির তল্লাশি দিয়ে জমির মালিকানা ও দখলদার সম্পর্কে পূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। প্রায়ই দেখা যায়, দখল কিংবা ঝামেলাযুক্ত জমির মালিকেরা অনেক সময় জমি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানে দিয়ে থাকেন। সে ক্ষেত্রে নির্মাতাপ্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ফ্ল্যাট বুঝে পেলেও ভবিষ্যতে আইনি ঝামেলার সম্মুখীন হতে পারেন।

জমি কেনার আগে প্রস্তুতি

প্রথমেই প্রস্তাবিত জমিটি সরেজমিনে গিয়ে দেখতে হবে। তাহলে বুঝতে পারবেন জমিটি আসলে কেমন। আদৌ ভালো নাকি ডোবা-নালা-পুকুর। সংলগ্ন জমির মালিক বা এলাকাবাসীর কাছ থেকে জমির বিষয়ে খোঁজখবর নিতে হবে। তারাই আপনাকে জমির বিষয়ে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য দিতে পারবেন।

বিক্রেতার কাছ থেকে তার মালিকানার প্রমাণস্বরূপ দলিলাদি ও অন্যান্য কাগজপত্রের ফটোকপি চেয়ে নিতে হবে। জমির দলিল, ওয়ারিশ সনদ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে), সিএস/ এসএ/ আরএস/ মহানগর/ মিউটেশন পরচা, ডিসিআর, খাজনার দাখিলা ইত্যাদির ফটোকপি সংগ্রহের চেষ্টা করতে হবে।

তহসিল অফিসে কর্মরত কাউকে কাগজপত্রগুলো যাচাইয়ের জন্য সহায়তা করতে অনুরোধ করতে পারেন। কোনো জমির প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে সঠিক তথ্য কেবল তহসিল অফিস থেকেই পেতে পারেন।

জমিটির কাগজপত্র যাচাইয়ে সন্তুষ্ট হয়ে কেনার বিষয়ে মনস্থির করলে বা বায়না করলে আপনার নাম, ঠিকানা, জমির দাগ-খতিয়ান উল্লেখ করে জমিতে একটি সাইনবোর্ড দিন। একই সঙ্গে পত্রিকায় ছোট আকারের হলেও একটি বিজ্ঞাপন দিন। এতে পরে কোনো সমস্যা হলেও আপনি আইনগত সুবিধা পাবেন। তা ছাড়া এই জমির অন্য কোনো দাবিদার বা ওয়ারিশ থাকলে, মামলা–মোকদ্দমাসহ অন্য কোনো সমস্যা থাকলে তা প্রকাশিত হবে এবং আপনি ভবিষ্যতের একটি স্থায়ী ও জটিল সমস্যা থেকে রক্ষা পাবেন।