
নতুন সরকারের প্রথম বাজেট সামনে রেখে শিক্ষা, জেন্ডার ও জলবায়ু খাতে আরও টেকসই ও জনবান্ধব কাঠামোর দাবি করেছেন অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও অংশীজনেরা। তাঁরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি, বৈশ্বিক চাপ ও জলবায়ু সংকটের সময়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় কার্যকর ও মানুষকেন্দ্রিক বাজেট এখন জরুরি।
রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে আজ মঙ্গলবার একশনএইড বাংলাদেশ আয়োজিত ‘ভবিষ্যতে বিনিয়োগের সময় এখনই: নারী, তরুণ ও জলবায়ু সুরক্ষায় জনবান্ধব বাজেট’ শীর্ষক সংলাপে এসব পরামর্শ উঠে আসে। অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ, জলবায়ুবিশেষজ্ঞ, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, তরুণ প্রতিনিধি ও তৃণমূল পর্যায়ের মানুষেরা অংশ নেন।
একশনএইড এক বিজ্ঞপ্তিতে এসব কথা জানায়। সংলাপে জানানো হয়, গত পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ১ দশমিক ৭২ শতাংশে নেমেছে। একই সময়ে জেন্ডার বাজেটের আকারও জিডিপির ৫ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
সভায় বক্তারা বলেন, নারী সুরক্ষা, আইনি সহায়তা ও সহিংসতা প্রতিরোধে বরাদ্দ কমে যাওয়ায় মাঠপর্যায়ে নানা সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। জলবায়ু খাতেও বরাদ্দ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় সভায়।
সংলাপে আগামী বাজেটের জন্য কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে ২০২৮ সালের মধ্যে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করা, ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় নারীর অংশগ্রহণ ৪০ শতাংশে নেওয়া, নারী উদ্যোক্তা তহবিল গঠন, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধে আলাদা বরাদ্দ এবং জলবায়ু ক্ষতিপূরণ ও অভিযোজনের জন্য পৃথক বাজেট কোড চালু করা।
উন্মুক্ত আলোচনায় জলবায়ু-ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ, প্রতিবন্ধী তরুণ, ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটির প্রতিনিধি ও নারী কৃষকেরা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। নারী কৃষক মোসাম্মত নিপা আক্তার বলেন, উন্নতমানের বীজের বরাদ্দ মাঠপর্যায়ে নারীরা সমানভাবে পান না। এই বৈষম্য দূর করার দাবি জানান তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়মা হক বিদিশা বলেন, জেন্ডার বাজেট শুধু নারীদের জন্য আলাদা বরাদ্দ নয়, এটি সব মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কাঠামো। তিনি নিরাপদ পরিবহন, অবৈতনিক কাজের স্বীকৃতি ও পোশাক খাতের বাইরে নারীদের কর্মসংস্থান বাড়ানোর তাগিদ দেন।
জলবায়ু অর্থায়ন বিশেষজ্ঞ আহসান উদ্দিন আহমেদ বলেন, গত এক দশকে প্রায় ২৫টি মন্ত্রণালয় জলবায়ু কার্যক্রমে যুক্ত হলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা গড়ে মাত্র ৭ শতাংশ। দুর্বল জবাবদিহির কারণে জলবায়ুঝুঁকি কমছে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী সাইমুম পারভেজ বলেন, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে এখন জনগণের অংশগ্রহণ বাড়ছে। জলবায়ু অর্থায়ন, আন্তর্জাতিক তহবিল ও আন্তমন্ত্রণালয় সমন্বয়কে সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বর্জ্য থেকে শক্তি উৎপাদন, ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও কার্বন ট্রেডিং নিয়ে সরকার কাজ করছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা বলেন, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, তরুণদের শিক্ষা, দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। জেন্ডার বাজেট কমে যাওয়ার প্রবণতা নারীদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পরিকল্পনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. গোলাম মোছাদ্দেক বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আয়বৈষম্য কমানোই সরকারের প্রধান লক্ষ্য। ইতিমধ্যে ১৫টি খাতে জলবায়ু ন্যায্যতা যুক্ত করা হয়েছে এবং স্বচ্ছতা বাড়াতে ডিজিটাল রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড চালু করা হয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন বলেন, তরুণদের জন্য ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত এসএমই ঋণ ও আউটসোর্সিং খাতে বিশেষ বরাদ্দ থাকছে। তবে বাজেটপ্রক্রিয়াকে আরও অংশগ্রহণমূলক করার প্রয়োজন রয়েছে।