সংস্থাটির শর্ত পূরণ করে ঋণ পরিশোধের মতো বাস্তব অবস্থা অনেক দেশেরই থাকে না। তবু বিষয়টি আমলে নেওয়া হয় না।
যখন কোনো দেশ বিপদে পড়ে, সাধারণত তখনই তারা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছে ঋণ চায়। কোনো দেশ আইএমএফের কাছে ঋণের জন্য আবেদন করলে ধরে নেওয়া হয়, সেই দেশ সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা সঠিকভাবে করতে পারছে না। মজার ব্যাপার হলো, ঋণ দেওয়ার শর্ত হিসেবে দেশটির সেই দুর্বল জায়গাতেই হাত দেয় আইএমএফ। অর্থাৎ যেসব সমস্যার কারণে একটি দেশ আইএমএফের দ্বারস্থ হয়, সংস্থাটি ঠিক সেই কারণগুলো সংশোধনের শর্তই আরোপ করে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ সরকার এক ধাপে জ্বালানি তেলের দাম ৫০ শতাংশের মতো বাড়িয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, আইএমএফের ৪৫০ কোটি ডলারের ঋণ পাওয়ার শর্ত পূরণ করতেই মূলত এমনটা করা হয়েছে। সংস্থাটির বিশ্বাস, তাদের শর্তগুলো পূরণ করলে একটি দেশকে আর আর্থিক সহায়তা চাইতে হবে না। কিন্তু বাস্তবতা এত সহজ নয়, বরং খুবই বন্ধুর। ফলে আইএমএফের নানা শর্ত পূরণ করে ঋণ পরিশোধের মতো বাস্তব অবস্থা অনেক দেশেরই থাকে না।
এসব কারণে আইএমএফের ঋণের বিষয়ে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় একধরনের তিক্ত অভিজ্ঞতা আছে। বাজার অর্থনীতিতে আইএমএফের অগাধ বিশ্বাস, সে জন্য তারা ঋণের শর্ত হিসেবে বাজার উদারীকরণের চূড়ান্ত শর্ত আরোপ করে। আর সেটা হলো, সরকারের ভূমিকা হ্রাস করা। কিন্তু অর্থনীতিবিদদের বড় অংশই এখন মনে করেন, বাজারের অদৃশ্য হাত নেই, সে নিজে নিজে কিছুই ঠিক করতে পারে না। করোনার সময় উন্নত দেশগুলোর পদক্ষেপ দেখলেই তা বোঝা যায়। নাগরিকদের তারা যেভাবে প্রত্যক্ষ নগদ সহায়তা দিয়েছে। তাতেই স্পষ্ট, বাজার নিজে নিজে সবকিছু ঠিক করতে পারে না।
বাজার প্রসঙ্গে পাকিস্তানের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও সাবেক অর্থমন্ত্রী মাহবুবুল হকের কথা প্রণিধানযোগ্য। তিনি একবার বলেছিলেন, ‘বাজার গরিব, দুর্বল ও অরক্ষিতদের প্রতি বন্ধুসুলভ নয়, তা সে জাতীয় বা আন্তর্জাতিক যে পরিসরেই হোক না কেন। আমরা প্রায়ই এমনভাবে কথা বলি যে মনে হয়, বাজার স্বাধীন। আদতে তা নয়, আমি নিজের দেশেই তা দেখেছি। প্রায়ই দেখা যায়, বাজার শক্তিশালী গোষ্ঠীর হাতের পুতুল হিসেবে কাজ করে, অর্থাৎ বাজার বিদ্যমান বণ্টনব্যবস্থার প্রতি পক্ষপাত দেখায়।’
অনেক দেশই আইএমএফের শর্ত মানতে গিয়ে বিপদে পড়েছে। ১৯৯৭ সালে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছিল। তখন মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো আইএমএফের কথায় নিজেদের মুদ্রানীতি কঠোর করার পাশাপাশি রাজস্ব খাতেও কাটছাঁট করে। মূলত বাজেট–ঘাটতি ও মুদ্রার বিনিময়মূল্য শক্তিশালী করতে এই পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দেয় আইএমএফ। এতে একটি দেশের অর্থনীতি শুরুতে কিছুটা গতি হারায়, কিন্তু পরবর্তীকালে তা গুরুতর মন্দায় রূপ নেয় এবং বেকারত্ব অনেক বেড়ে যায়।
আইএমএফ ১৯৯০ সালে কেনিয়ায় হস্তক্ষেপ করে। তাদের চাপে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুঁজিপ্রবাহের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ তুলে নেয়।
তখন ধারণা তৈরি হয়, দুর্নীতিবাজ রাজনীতিকদের টাকা পাচারে সহায়তা করতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে (গোল্ডেনবার্গ কেলেঙ্কারি)। সমালোচকেরা বলেন, আইএমএফ যে ঋণগ্রহীতা দেশের পরিপ্রেক্ষিত বা বাস্তবতা বুঝতে পারে না, এটা তার আরেকটি নজির ছিল।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানও আইএমএফের পরামর্শ মেনে বিপদে পড়েছে। জ্বালানির ওপর শুল্ক বাড়ানোর কারণে দেশটিতে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম অনেক বেড়ে যায় এবং পরিণামে সেখানকার প্রধান খাবার নানরুটির দাম অনেকটাই বেড়ে যায়। এরপর ২০১৯-২০ সালে পাকিস্তান পরিসংখ্যান ব্যুরোর এক জরিপে সে দেশের ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ বা সাড়ে তিন কোটি মানুষ সহনীয় থেকে তীব্র মাত্রার খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় পড়ার কথা বলা হয়।
তবে আইএমএফের ঋণ নিয়ে উপকৃত হওয়ার উদাহরণও আছে। নিকট অতীতে অনেক আলোচনার পর গ্রিস আইএমএফের যে ঋণ নেয়, তাতে তারা উপকৃতই হয়েছে। তবে ঋণের শর্ত নির্ধারণে গ্রিসের বড় ভূমিকা ছিল সেখানে।
বাংলাদেশ আইএমএফের কাছে ঋণ চেয়েছে মোট ১০ বার। প্রথমবার ঋণ নিয়েছিল ১৯৭৪ সালে। সংস্থাটির ওয়েবসাইটের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ঋণের জন্য আইএমএফের কাছে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি গেছে ১৯৮০ থেকে ১৯৯০ সালে। এই ১০ বছরে বাংলাদেশ আইএমএফের কাছ থেকে পাঁচবার অর্থ ধার করেছে।
সহযোগিতার ক্ষেত্রে ‘প্যারিস ডিক্লারেশন অন এইড ইফেক্টিভনেস’ একটি মাইলফলক। ২০০৫ সালে স্বাক্ষরিত এ ঘোষণায় বলা হয়েছিল, উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেরাই উন্নয়নের কৌশল প্রণয়ন ও ব্যবস্থাপনা করবে আর তা করতে তাদের সহায়তা করবে দাতারা। অনেক আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই কাঠামো নির্ধারিত হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রে এর কাঠামো অনেকটাই মানা হচ্ছে। তবে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো বহুপক্ষীয় দাতা সংস্থাগুলো এর স্বাক্ষরকারী নয়।
এ প্রসঙ্গে অর্থনীতিবিদ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সব সময় নানা ধরনের শর্ত দিয়েছে, বিশেষ করে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ। তারা বেসরকারীকরণ, নিয়ন্ত্রণ শিথিলকরণ ও সরকারি সংস্থার শেয়ার বিক্রি করে দেওয়ার মতো শর্ত আরোপ করেছে। আইএমএফ বিভিন্ন ধরনের সংস্কার করতে বলেছে। এই শতকের শুরুর দিকে বিশ্বব্যাংক বলেছে কাঠামোগত সমন্বয়ের কথা। এ নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। এতে এমন অনেক কিছু ছিল, যার কারণে অভ্যন্তরীণ নীতি নির্ধারণের পরিসর সংকুচিত হয়েছে। যেমন ব্যাংক সরকারের হাতে থাকলে গ্রামাঞ্চলে শাখা খুলে কৃষকদের ঋণ দেওয়া যায়, কিন্তু সংস্থাটি চায় না, ব্যাংক সরকারের হাতে থাকুক।
ভর্তুকি প্রত্যাহারের কথা বলেছে তারা। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘কিছু কিছু বিষয় বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আছে, কিন্তু তা কীভাবে ও কত সময় নিয়ে করা যাবে, সেই সিদ্ধান্ত আমাদের হাতে থাকতে হবে। কোন ধাপের পর কোন ধাপ আসবে, পরম্পরা কী হবে, এসব আমাদের ঠিক করতে হবে। বহুপক্ষীয় দাতা সংস্থাগুলো সুশাসন, রাজস্ব বৃদ্ধি, ব্যাংকিং খাত সংস্কার এসব নিয়ে সোচ্চার। বিষয়টি হচ্ছে, এসব আমাদের নিজেদেরই করা উচিত। আর কিছু কিছু বিষয় আমাদের স্থানীয় পরিপ্রেক্ষিতের সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যেমন সারের ভর্তুকি এখন প্রত্যাহার করা যাবে না বা জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করা যাবে না। অর্থাৎ আমাদের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিসর থাকতে হবে।’
আইএমএফের ঋণের সঙ্গে যেসব শর্ত দেওয়া হয় তার মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে কাঠামোগত সমন্বয়। বিষয়টি শুনতে মন্দ লাগে না। যেমন এর মধ্যে আছে সরকারের ব্যয় হ্রাস, বাণিজ্য উদারীকরণ, পুঁজির প্রবাহ বাধাহীন করা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেওয়া, ভর্তুকি হ্রাস, কর বৃদ্ধি ইত্যাদি।
বস্তুত এই কাঠামোগত সমন্বয়ের মধ্যে এমন অনেক কিছুই আছে, যা ঋণ গ্রহণকারী দেশের নিজে থেকেই করা উচিত, যেমন করের আওতা বৃদ্ধি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি। এসব যুক্তিসংগত হলেও শর্ত এমনভাবে আরোপ করা হয় যে তা একরকম ‘শক থেরাপি’র মতো হয়ে যায়। এ ছাড়া যেসব সংস্কার দেশগুলো অনেক দিন ধরে চেষ্টা করেও পেরে উঠছে না, সেগুলো অল্প কয়েক দিনের মধ্যে করার চাপ দেওয়া হয়।
এই কাঠামোগত সমন্বয়ের প্রভাব কী, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে অবশ্য মতভেদ আছে। সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সমালোচনা হচ্ছে, আইএমএফ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বেশি গুরুত্ব দেয় এবং কাঠামোগত সমন্বয়ের কারণে যে দুর্দশা ভোগ করতে হয় দেশগুলোকে, তা উপেক্ষা করে। এমনকি ২০১৮ সালে সংস্থাটির নিজস্ব পর্যালোচনায়ও বিষয়টি অস্বীকার করা হয়নি। পরিচালকেরা ভেবেছিলেন, প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের ছাপ আছে, মূলত বৈশ্বিক পূর্বাভাসে ভুলত্রুটি থাকার কারণে এমন হয়। সেই সঙ্গে আছে নীতিগত সমন্বয়ের অবমূল্যায়ন এবং কাঠামোগত সংস্কারের অতিমূল্যায়ন—এই সবকিছু মিলে প্রবৃদ্ধিতে অতি গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আইএমএফের সমালোচনার আরেকটি জায়গা হলো, সংস্থাটির সমন্বয় কর্মসূচি ঋণগ্রহীতা দেশগুলোর রাজনৈতিক-অর্থনীতির অন্তর্নিহিত সমস্যা আমলে নেয় না। অর্থাৎ মানুষের জীবনের উন্নতি না হলেও বা ক্ষেত্রবিশেষে অবনতি হলেও অতিধনী অনেকেই কর ফাঁকি দিয়ে বহাল তবিয়তে থাকেন, তাঁদের টিকিটিও স্পর্শ করা হয় না। অর্থাৎ বেসরকারীকরণের শর্ত না দিয়ে আইএমএফ যদি এই শর্ত দিত যে যাঁরা কর ফাঁকি দিচ্ছেন, তাঁদের আইনের আওতায় আনতে হবে, তাহলে বরং উন্নয়নশীল দেশের জনগণ উপকৃত হতো।
নোবেল বিজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ জোসেফ স্টিগলিৎস আইএমএফের মুদ্রানীতিগত মনোভাবের সমালোচনা করেছেন। এক প্রবন্ধে তিনি বলেন, আইএমএফ উন্নয়নশীল দেশের জন্য প্রয়োজনীয় নীতি প্রণয়নে ব্যর্থ হচ্ছে; সংস্থাটি ষড়যন্ত্র না করলেও পশ্চিমা আর্থিক খাতের আদর্শে পরিচালিত হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আইএমএফের এত সব অবাস্তব শর্ত সত্ত্বেও দুর্দশায় পড়লে দেশগুলো কেন সংস্থাটির দ্বারস্থ হয়? আইএমএফের ছোট এক ভিডিও বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যখন কোনো দেশ ভুল নীতি, অব্যবস্থাপনা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো কারণে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে এবং অন্য বাজার যখন তাকে ঋণ দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে, তখনই তারা সাধারণত আইএমএফের দ্বারস্থ হয়। এসব ক্ষেত্রে আইএমএফ স্বল্প সুদে ও স্বল্প মেয়াদে ঋণ দেয়। এমনকি তারা দরিদ্র দেশগুলোকে বিনা সুদেও ঋণ দেয়। সংস্থাটির দাবি, দ্রুততার সঙ্গে ঋণ ছাড় হওয়ার কারণে বিপদগ্রস্ত দেশগুলো স্বস্তির নিশ্বাস ফেলার সুযোগ পায়। আবার আইএমএফ কোনো বিপদগ্রস্ত দেশকে ঋণ দিয়েছে—এটা জানলে সেই দেশ সম্পর্কে বাজারও আশ্বস্ত হয়।
আগেও বলা হয়েছে, যেসব কারণে কোনো দেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, সেগুলো নিয়ে আইএমএফ কাজ করে। ফলে কখনো কখনো বিপদগ্রস্ত দেশগুলোর কাছে বাজারের ঋণের চেয়ে আইএমএফের ঋণ অধিক কার্যকর হতে পারে।