
সরকার–ঘোষিত ২২ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়নি, লোকসানে চাষিরা।
দামে ধসে এবার ৪,২৯১ হেক্টর জমিতে চাষ কমেছে।
মৌসুমে আলুর দাম এতটাই কম ছিল যে অনেক চাষির উৎপাদন খরচ উঠছিল না। তাই লোকসান এড়ানোর আশায় অনেক চাষি আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু পরে সরকার হিমাগার পর্যায়ে আলুর কেজি ২২ টাকা ঘোষণা করলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে হিমাগারে রাখা আলু বিক্রি করেও বিপাকে পড়ছেন চাষিরা। হিমাগারভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে তাঁদের এখন ঘর থেকে টাকা এনে দিতে হচ্ছে।
এদিকে গত মৌসুমের আলু বিক্রিতে লোকসানের কারণে এবার রাজশাহীতে প্রায় ৪ হাজার ২৯১ হেক্টর জমিতে আলু চাষ কমেছে। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মৌসুমে এই জেলায় যেখানে ৩৮ হাজার ৫৭১ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছিল, সেখানে এবার তা কমে ৩৪ হাজার ২৮০ হেক্টরে নেমেছে। জেলার সবচেয়ে বেশি ও ভালো জাতের আলু চাষ হয় তানোর উপজেলায়। সেখানকার চাষিরাও এবার আলু চাষ কমিয়েছেন। গত বছর তানোরে ১৩ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হলেও এবার হয়েছে ১২ হাজার ২৬৫ হেক্টরে।
চাষিদের সঙ্গে কথা বলে আলু নিয়ে শুধু হতাশার গল্পই শোনা গেল। তানোর উপজেলার চোরখৈর গ্রামের চাষি মো. মইদুল ইসলাম জানান, তিনি হিমাগারে ১২১ বস্তা আলু রেখেছিলেন। সেই আলু বিক্রি করে হিমাগারের ভাড়া ও অন্যান্য খরচ মেটাতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ঘর থেকে ১৬ হাজার ৬০০ টাকা দিতে হয়েছে।
একই উপজেলার তালন্দ গ্রামের আলুচাষি সাফায়েত হোসেন জানান, তিনি হিমাগারে দেড় হাজার বস্তা আলু রেখেছিলেন। সরকার দাম বেঁধে দেওয়ায় তিনি আশা করেছিলেন ডিসেম্বরের শেষে আলুর দাম বাড়বে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ৮ থেকে ১০ টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করতে হয়েছে। এতে হিমাগারের ঋণ শোধ করতে ঘর থেকে প্রায় তিন লাখ টাকা দিতে হয়েছে। গত বছর তিনি ২৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন, এবার সর্বস্বান্ত হওয়ায় মাত্র আট বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন।
তালন্দ গ্রামের আরেক চাষি আসাদুজ্জামান সুমন জানান, গত বছর তিনি ৬৪ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। এতে তাঁর খরচ হয়েছিল প্রায় ৫০ লাখ টাকা। আলু বিক্রি করে ১০ লাখ টাকা লোকসান হয়েছে। হিমাগারে রাখা তিন হাজার বস্তা আলু থেকে তিনি একটি টাকাও পাননি। আলু ছেড়ে দিয়ে খালি হাতে বাড়ি ফিরতে হয়েছে। এ অভিজ্ঞতার কারণে এবার তিনি মাত্র পাঁচ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন।
একই গ্রামের সৈকত কুমার দাস নিজের পাঁচ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। আলু বিক্রি করে তাঁর লোকসান হয়েছে ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা। তিনি এজেন্টের মাধ্যমে হিমাগারে ২৭৮ বস্তা আলু রেখেছিলেন। আলু বিক্রির পরও এজেন্টের কাছে তাঁর প্রায় ১৬ হাজার টাকা দেনা রয়েছে।
অতিরিক্ত আলু চাষের কারণে চাষিরা লোকসানে পড়েছেন। তাই সরকার ‘ক্রপ জোনিং’ পদ্ধতিতে চাষের একটি লক্ষ্য নির্ধারণের চেষ্টা করছে। পরীক্ষামূলকভাবে এটি শুরু করা হচ্ছে। বাস্তবায়ন হলে চাষিরা এ ধরনের লোকসান থেকে রক্ষা পেতে পারেনমোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, উপপরিচালক, রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
তানোরের চাষি মাহবুব আলম জানান, গত বছর তিনি ৩২ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। আলু বিক্রি শেষে তাঁর লোকসান দাঁড়িয়েছে ২৭ লাখ টাকা। হিমাগারে রাখা ১ হাজার ২০০ বস্তা আলু বিক্রি করার পরও হিমাগারের মালিকের কাছে তাঁর ৩৫ হাজার টাকা দেনা রয়েছে। এবার তিনি অর্ধেক জমিতে অর্থাৎ ১৭ বিঘায় আলু চাষ করেছেন।
তালন্দ গ্রামের চাষি কলিমুদ্দিন জানান, গত বছর ২০ বিঘা জমিতে আলু চাষ করে তাঁর ৯ লাখ টাকা লোকসান হয়। হিমাগারে রাখা এক হাজার বস্তা আলু বিক্রি করেও হিমাগারের কাছে তাঁর দেনা হয়েছে দেড় লাখ টাকা। নিজের ঘর থেকেই এই টাকা পরিশোধ করেছেন।
এই হতাশার মধ্যেও ব্যতিক্রমী এক চাষির দেখা মিলেছে। তিনি চোরখৈর গ্রামের রানা চৌধুরী, যিনি গত বছর ২৪ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছিলেন। হিমাগারে ১ হাজার ২০০ বস্তা আলু রেখে তাঁকে ঘর থেকে ২২ হাজার টাকা দিতে হয়েছিল। তবু তিনি এবার ৪৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। তাঁর ভাষায়, যেখানে টাকা হারিয়েছে সেখানেই খুঁজতে হবে—এই ভাবনা থেকেই তিনি এবার বেশি করে আলু চাষ করেছেন।
রহমান কোল্ডস্টোরেজের ব্যবস্থাপক আবদুল হালিম জানান, তাঁদের পাঁচটি হিমাগারে এখনো প্রায় ৪২ হাজার বস্তা আলু রয়ে গেছে। সরকারি দামে আলু বিক্রি না হওয়ায় ক্ষোভে তিনি ২২ টাকা কেজির ব্যানার ছিঁড়ে ফেলেছেন।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, অতিরিক্ত আলু চাষের কারণে চাষিরা লোকসানে পড়েছেন। তাই সরকার ‘ক্রপ জোনিং’ পদ্ধতিতে চাষের একটি লক্ষ্য নির্ধারণের চেষ্টা করছে। পরীক্ষামূলকভাবে এটি শুরু করা হচ্ছে। বাস্তবায়ন হলে চাষিরা এ ধরনের লোকসান থেকে রক্ষা পেতে পারেন।
প্রসঙ্গত, যে এলাকায় যে মাটিতে যে ফসল ভালো হয়, সেখানে সেটির আবাদ করাকেই ক্রপ জোনিং।