
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি হয়েছে, তা ভঙ্গুর আখ্যা দিয়ে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, তেল ও গ্যাসের দাম যুদ্ধের আগের পর্যায়ে ফিরতে এখনো অনেক সময় লাগবে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল করে দেয়। পারস্য উপসাগরের সঙ্গে ওমান উপসাগরকে যুক্ত করা এই সরু জলপথ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয়। এই তেলের বড় অংশ যায় এশিয়ায়, কিছু ইউরোপে।
এ সময় ইরান উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের জ্বালানি অবকাঠামোতেও হামলা চালায়। ফলে শুধু জ্বালানির দামই নয়, হিলিয়ামের মতো সহায়ক পণ্যের দামও বেড়ে যায়। ঘরের টাইলস থেকে সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্রপাতি তৈরিতে হিলিয়াম ব্যবহার হয়। ফলে এসব উপাদানের ওপর নির্ভরশীল সার উৎপাদনও ব্যাহত হয়েছে, যার প্রভাব ফসল উৎপাদনেও পড়বে।
স্বাভাবিকভাবেই এই যুদ্ধের প্রভাব বিশ্বজুড়েই পড়েছে, বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোয়। এসব অঞ্চলের ভোক্তারা জ্বালানির ঘাটতি ও উচ্চমূল্যের চাপ সবচেয়ে বেশি টের পাচ্ছেন। এখন প্রশ্ন হলো, যুদ্ধবিরতির পর কত দ্রুত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের টাফটস বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্লেচার স্কুলের অধ্যাপক রকফোর্ড ওয়েইৎজ বলেন, এখনই সে প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়। তাঁর ভাষায়, ‘স্বাভাবিক অবস্থায় কখন ফেরা যাবে, তা বলার সময় এখনো আসেনি।’
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বাজার স্থিতিশীল হতে হলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে হবে। সেই সঙ্গে আগে থেকেই অনুমান করার মতো পরিস্থিতি থাকতে হবে যে জাহাজ স্বাভাবিকভাবে চলাচল করবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।
যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১২০ থেকে ১৪০টি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে চলাচল করত। যুদ্ধবিরতির পর বুধবার সেখানে মাত্র পাঁচটি এবং বৃহস্পতিবার সাতটি জাহাজ পার হয়েছে। এতে বোঝা যায়, সরবরাহব্যবস্থা এখনো বড় ধরনের চাপে আছে।
ওয়েইৎজের ভাষায়, পৃথিবীর তেলবাজারে এযাবৎকাল যত বড় সংকট হয়েছে, বর্তমান সংকট তার মধ্যে অন্যতম। তিনি মনে করেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়ার মতো বড় শক্তির পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ভারত ও পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক শক্তির সমন্বয় দরকার। কিন্তু বিষয়টি সহজ নয়।
এদিকে হরমুজে চলাচলকারী জাহাজে টোল আরোপ করা হবে এবং সেই সঙ্গে বিমা খরচ বেড়ে যাবে, এমন আশঙ্কা থেকেও তেলের দামে চাপ পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি জাহাজে প্রায় ২০ লাখ ডলার টোল নেওয়ার গুঞ্জন থাকলেও তা বড় সমস্যা নয়; বরং বড় সমস্যা হচ্ছে, ট্যাংকার চলাচলের সীমাবদ্ধতা।
উইচিটা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক উষা হ্যালি বলেন, যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পাল্টাপাল্টি হামলা শুরু হওয়ায় প্রণালি পুরোপুরি চালু হচ্ছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি সমস্যা। সেটা হলো, ইরাকসহ কিছু দেশ সংরক্ষণ সক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। ফলে সরবরাহ আরও কমে গেছে।
হ্যালির মতে, এসব উৎপাদন পুরোপুরি চালু হতে সপ্তাহ নয়, মাসও লেগে যেতে পারে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) খাতে ভারসাম্য ফিরতে তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগতে পারে, যদি পরিস্থিতির আর অবনতি না হয়।
বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়ছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভা জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমানো হতে পারে। আইএমএফের বর্তমান পূর্বাভাস, চলতি বছর বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হবে ৩ দশমিক ৩ শতাংশ। তাঁর মতে, যুদ্ধবরিতি টেকসই হলে বা শান্তি এলেও প্রবৃদ্ধির গতি কমই থাকবে।
যুদ্ধের প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়লেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান দুই লক্ষ্য, অর্থাৎ রাশিয়া ও চীন, তেমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বিশ্লেষকেরা মনে করেন, রাশিয়া বরং এ পরিস্থিতি থেকে বড় ধরনের লাভ ঘরে তুলেছে, চীনা জাহাজ চলাচলেও বড় বাধা দেয়নি ইরান।
ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর একাধিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর মধ্যে তেলের দামের ওপর সীমা নির্ধারণসহ দেশটির আয়ের উৎস সংকুচিত করার চেষ্টা ছিল। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে চীনের ওপর শুল্ক আরোপ এবং উচ্চ প্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানিতে নিয়ন্ত্রণ জারি করা হয়। পরবর্তী সময়ে জো বাইডেন প্রশাসন সেই নীতি অব্যাহত রাখে। পরবর্তীকালে ট্রাম্প আবার ক্ষমতায় আসার পর চীনের পণ্যে শুল্ক বৃদ্ধি করেন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সরবরাহে ঝুঁকি থাকায় তেলের দামে ‘ঝুঁকি প্রিমিয়াম’ যুক্ত হয়েছে। পরে তেলের দাম আগের তুলনায় বেশিই থাকবে। যদিও এখন যে তেল আটকে আছে, তা দ্রুত দ্রুত বাজারে এলে স্বল্প মেয়াদে সরবরাহ বাড়তে পারে, সমাধান হিসেবে তা স্থায়ী নয়।
এ মুহূর্তে বিশ্লেষকেরা ইরাকের দিকে নজর রাখছেন, দেশটি ইরানের সঙ্গে পার্শ্বচুক্তি করে কি না, তা দেখার জন্য। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রক্সি সংঘাতের ক্ষেত্র ছিল এই ইরাক। দেশটি প্রতিদিন অন্তত ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদনে সক্ষম। তবে সীমিত সংরক্ষণ সক্ষমতার কারণে তারা এই উৎপাদন বন্ধ রেখেছিল।
ইরাকের তেল উৎপাদন আবার চালু হলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ বাড়বে এবং ধীরে ধীরে দামের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। তবে যুদ্ধবিরতির অনিশ্চয়তা এবং ইরাকে অতীত হামলার ইতিহাসের কারণে দেশটির তেল উৎপাদনের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, এমন পরিস্থিতিতে উৎপাদন বাড়াতে কে নতুন বিনিয়োগ করবে।