সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) ওপেক থেকে বেরিয়ে যাওয়া আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যে এই পদক্ষেপ স্বাগত জানিয়েছে তার কারণ হলো, এই ঘটনায় তেল উৎপাদনকারী জোটের মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা কিছুটা হলেও কমতে পারে। তাতে লাভবান হবে যুক্তরাষ্ট্র।
যদিও ইউএইর এই সিদ্ধান্ত অনেক দিন ধরেই আলোচনায় ছিল, তা কার্যকর হওয়ার সময়টি ছিল অপ্রত্যাশিত। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির অ্যাডজাংক্ট সিনিয়র ফেলো র্যাচেল জিয়েম্বা লিখেছেন, ‘সময়ের দিক থেকে এই সিদ্ধান্ত কিছুটা বিস্ময়কর হলেও এই প্রেক্ষাপট অনেক দিন ধরেই তৈরি হচ্ছিল।’
জিয়েম্বা আরও বলেন, এ ঘটনায় বড় একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। সেটা হলো, এই অঞ্চলে ভবিষ্যতে সহযোগিতার বদলে প্রতিযোগিতা বাড়বে কি না, এবং সেই সঙ্গে জ্বালানিবাজারের পরিচালনব্যবস্থা কেমন হবে।
ইউএই দীর্ঘদিন ধরেই ওপেকের উৎপাদন কোটার বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে। এই কোটার কারণে সদস্যদেশগুলোর তেল উৎপাদনের পরিমাণ সীমা নির্ধারিত থাকে। গত কয়েক বছরে ইউএই উৎপাদন বাড়াতে বিনিয়োগ করলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে সরবরাহ করতে পারেনি।
এদিকে বিশ্ববাজারে যখন নতুন তেল সরবরাহের চাপ তৈরি হচ্ছে, ঠিক তখনই এ সিদ্ধান্ত নিল আরব আমিরাত। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি এখনো অবরুদ্ধ। এ কারণে তেলের দাম বেড়ে গেছে।
চাহিদা বাড়তে থাকায় ইউএই এখন সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়ে তুলনামূলক কম দামে বাজারে তেল ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের জ্যেষ্ঠ ফেলো আদনান মাজারেই আল–জাজিরাকে বলেন, হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অতিরিক্ত তেল উৎপাদন সম্ভব হবে। এতে চাহিদা ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে দামের চাপ কিছুটা কমতে পারে।
মাজারেই আরও বলেন, ওপেক ও ওপেক প্লাস দুর্বল হলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিষয়টি ভালোই হবে, কেননা, এসব জোট বিশ্ববাজারের তেলের দাম নির্ধারণে এখনো কিছুটা হলেও প্রভাব বিস্তার করে। তাদের সেই প্রভাব আরও কমলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক হবে।
গত বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ দশমিক ৪১ ডলারে উঠেছিল, যদিও আজ শনিবার তা ১০৮ ডলারে নেমে এসেছে। বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম দাঁড়ায় ৪ দশমিক ৩৩ ডলার, ইরানে হামলা শুরুর আগের দিনের তুলনায় যা প্রায় দ্বিগুণ।
এদিকে যুদ্ধ তৃতীয় মাসে গড়ালেও ভোক্তাদের জীবনে স্বস্তি ফেরেনি। জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়চ্ছে, বেড়ে যাচ্ছে মানুষের ব্যয়ভার। নভেম্বরে আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে বিষয়টি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রয়টার্স/ইপসোসের এক জরিপে দেখা গেছে, হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের কর্মদক্ষতার বিষয়ে মানুষের সমর্থন কমে গেছে। আগের জরিপে যা ছিল ৩৬ শতাংশ, এখন তা কমে ৩৪ শতাংশে নেমেছে।
তবে ট্রাম্প মনে করেন, যুদ্ধ শেষ হলেই জ্বালানির দাম দ্রুত কমে যাবে। তিনি বলেন, ‘যুদ্ধ শেষ হলেই গ্যাসের দাম হঠাৎই নেমে যাবে।’
যুক্তরাষ্ট্রের লাভ
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি যারা লাভবান হচ্ছে, তাদের মধ্যে আছে যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস উৎপাদকেরা; তারা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ‘অস্বাভাবিক মুনাফা’ করেছে। তবে ইউএইর অতিরিক্ত সরবরাহ বাজারে এলে সেই মুনাফা কিছুটা কমতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রোকেমিক্যাল খাতও লাভবান হতে পারে। সার, সৌর প্যানেল, পোশাক, প্রসাধনী, বৈদ্যুতিক গাড়ি, ইলেকট্রনিকস, ওষুধ—সব ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত পেট্রোকেমিক্যালের ব্যবহার হয়। ফলে সরাসরি তেল ব্যবহারের চাহিদা কমলেও পেট্রোকেমিক্যালের কারণে তেলের চাহিদা থাকবে।
পিটারসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিকসের (পিআইআইই) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পেট্রোকেমিক্যাল এখন তেলের চাহিদার সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল উৎসে পরিণত হয়েছে।
ইরান যুদ্ধের কারণে তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্বের বৃহত্তম উৎপাদক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হয়েছে। মাজারেই বলেন, ভেনেজুয়েলার তেল যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এলে তাদের অবস্থান আরও শক্ত হবে।
র্যাচেল জিয়েম্বার মতে, ইউএইর এ পদক্ষেপ ভবিষ্যতের জন্য ইঙ্গিতবাহী। সেটা হলো আরব আমিরাত বাণিজ্যে আরও উন্মুক্ত হতে এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখতে আগ্রহী।
এ ছাড়া গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মুদ্রা অদলবদল (কারেন্সি সোয়াপ) চুক্তির অনুরোধের পরপরই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে আরব আমিরাত। বিশেষজ্ঞদের মতে, আমিরাতের ওভাবে ওপেক ছেড়ে যাওয়া মূলত রাজনৈতিক পদক্ষেপ। মাজারেই বলেন, ‘এ ঘটনায় বোঝা যায়, এটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইউএইর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ঘনিষ্ঠতার ইঙ্গিত।’
ইউএইর এভাবে ওপেক ত্যাগ জোটের অন্য সদস্যদের জন্যও দৃষ্টান্ত তৈরি করতে পারে। বিষয়টি হলো, এখন আরও দেশ একই পথে হাঁটলে তেলের দাম কমতে পারে। তবে মাজারেইর মতে, ‘ওপেক টিকে থাকবে, তবে আগের তুলনায় দুর্বল হবে, তার কার্যকারিতা কমবে।’
ইরানে চলমান যুদ্ধের বদৌলতে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি-বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে গঠিত আঞ্চলিক জোট) কীভাবে পুনর্গঠিত হয়, এখন সেদিকে নজরে রাখছেন মাজারেই। তিনি বলেন, ‘প্রশ্ন হচ্ছে, জিসিসি আদৌ টিকে থাকবে কি না।’
চলমান সংঘাতের পর আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়বে, নাকি প্রতিযোগিতা তীব্র হবে, জিয়েম্বাও সেদিকে নজর রাখছেন।
জিয়েম্বা বলেন, ওপেক থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বেরিয়ে যাওয়ার অর্থ হলো, বিভিন্ন দেশ যে চলমান পরিস্থিতিতে নানাভাবে ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা করছে, তার একটি উপায়। চলমান যে অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাব্যবস্থা, তার মধ্যে নিজেদের জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে মানানসই সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা।’
জিয়েম্বার আরও প্রত্যাশা, নিজেদের ও আঞ্চলিক স্বার্থে আমিরাত ‘গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়’ হয়েই থাকবে।