
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) টানা পঞ্চমবার নীতি সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর ‘জাদুর কাঠি’ নেই বলে মন্তব্য করেছেন ফেড চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ। তাঁর ভাষ্য, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সময় লাগবে।
বুধবার ফেড সুদের হার ৩ দশমিক ৫ থেকে ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশের মধ্যে অপরিবর্তিত রাখে। বাজারও প্রত্যাশা করছিল, এমন সিদ্ধান্ত আসবে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে আগামী কয়েক মাসে মূল্যস্ফীতির চাপ আবার বাড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। খবর বিবিসির
কেভিন ওয়ার্শ বলেন, মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে—এ প্রতিশ্রুতি থেকে ফেড সরে আসেনি। তবে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ফেডের ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার ওপরে। ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সময় লাগবে।
ফেডের নীতিনির্ধারণী কমিটিতে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে ভোট দেন ৯ সদস্য। বিপক্ষে ছিলেন তিন সদস্য, তাঁরা সুদের হার সামান্য বাড়ানোর পক্ষে মত দেন।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এর প্রভাবে ভোক্তা মূল্যস্ফীতি আবার বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বুধবার ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৬ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৯ ডলারের ওপরে উঠে যায়।
জুন পর্যন্ত এক বছরে মূল্যস্ফীতির হার ৩ দশমিক ৫ শতাংশে নেমেছে। তবে এ হার এখনো ফেডের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি। অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, মূল্যস্ফীতির হার কমার অর্থ পণ্যের দাম কমছে না; বরং আগের তুলনায় ধীরগতিতে বাড়ছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সাধারণত নীতি সুদের হার বাড়িয়ে থাকে। এতে গৃহঋণ, ব্যক্তিগত ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদ বেড়ে যায়। ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়লে মানুষ কম খরচ করে, বাজারে চাহিদা কমে; শেষ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির চাপও হ্রাস পায়।
অন্যদিকে সুদের হার বেশি হলে সঞ্চয়কারীরাও আমানতের ওপর তুলনামূলক ভালো মুনাফা পান।
মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় বাজারে ধারণা ছিল, ফেড হয়তো আগাম সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে সুদের হার বাড়াবে। তবে ফেড সে পথে হাঁটেনি।
সুদের হার না বাড়ানোর কারণ জানতে চাইলে সদ্য দায়িত্ব নেওয়া চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যে অস্থিরতার মধ্যে আছে, সেটা তিনি বোঝেন। তবে তাঁর নেতৃত্বাধীন পর্ষদ দায়িত্ব নিয়েছে মাত্র সাড়ে আট সপ্তাহ আগে।
সংবাদ সম্মেলনে ওয়ার্শ বলেন, ‘আমরা দায়িত্বে আছি, তার ফলও মানুষ পাবে। মূল্যস্ফীতি হ্রাসের ক্ষেত্রে আমাদের পূর্ণাঙ্গ মনোযোগ আছে। তবে জাদুর কাঠি নেড়ে রাতারাতি সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব—এমন ধারণা থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে।’
ফেড এক বিবৃতিতে বলেছে, জ্বালানির দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি এখনো ‘উচ্চপর্যায়ে’ আছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির গতি ভালো।
ওয়ার্শ জানান, সুদের হার নিয়ে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে খোলামেলা বিতর্ক উৎসাহিত করা হয়েছে। তিনি ইচ্ছা করেই এ বিতর্ক উসকে দিয়েছেন।
ওয়ার্শের ভাষায়, ‘আমি চেয়েছিলাম, প্রাণবন্ত বিতর্ক হোক, যেমনটা পরিবারের মধ্যে হয়, সেটাই হয়েছে। এটাই এ প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য। তবে শেষ পর্যন্ত যে সিদ্ধান্ত হয়েছে, তার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন ছিল।’
ফেডের সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে দরপতন হয়েছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক এক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাক জুনের রেকর্ড উচ্চতার তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ নিচে নেমে গেছে। ডাও জোন্স সূচক দিন শেষে ২ দশমিক ১৯ শতাংশ পয়েন্ট হারায়।
সম্প্রতি এআই চিপ কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দরপতন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামোয় বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিপুল বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ ও তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে।
চার্লস শোয়াব ইউকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিচার্ড ফ্লিন বলেন, জ্বালানিবাজারের গতিপ্রকৃতি নিয়ে সামনে ফেডকে ভাবতে হবে। বিশেষ করে ইরানে যে সংঘাত চলছে, তা ভবিষ্যতের সুদের হার-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত মে মাসে কেভিন ওয়ার্শকে ফেড চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি দুবার সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছেন।
এর আগে কংগ্রেসে দেওয়া বক্তব্যে ওয়ার্শ বলেছিলেন, দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ফেড কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
ট্রাম্প অতীতে ওয়ার্শের পূর্বসূরি জেরোম পাওয়েলের ওপর সুদের হার কমানোর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। নতুন চেয়ারম্যানের কাছেও তাঁর প্রত্যাশা, ঋণের খরচ যেন কমানো হয়।
তবে ওয়ার্শ স্পষ্ট করে বলেছেন, ফেডের সিদ্ধান্তে রাজনীতির প্রভাব থাকা উচিত নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বজায় রাখাই তাঁর লক্ষ্য।
বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান কুইলটার শেভিয়টের গবেষণা বিভাগের প্রধান রিচার্ড কার্টার বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন আর ১০০ দিনও নেই। ফলে ট্রাম্প এ সময় ফেডের সিদ্ধান্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন।
রিচার্ড কার্টার আরও বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট অবশ্যই অর্থনীতি নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দিতে চাইবেন। তবে মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চপর্যায়ে। সেই সঙ্গে সুদের হার আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাও আছে। ফলে অর্থনীতি নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দেওয়া ট্রাম্পের জন্য সহজ হবে না।’
বিশ্ব অর্থনীতিতে যেসব দেশের নীতিগত সিদ্ধান্ত বিশেষ গুরুত্ব বহন করে, ফেডের নীতি সুদের হার এর মধ্যে অন্যতম। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক ঋণ ও বিনিয়োগের বড় অংশই মার্কিন ডলারে হয়ে থাকে। ফলে ফেড সুদের হার বাড়ালে বিশ্বজুড়ে ঋণের খরচ বেড়ে যায়, ডলার শক্তিশালী হয়।
এ বাস্তবতায় মার্কিন ট্রেজারি বিল ও বন্ডের আকর্ষণ বেড়ে যায়। ফলে সারা বিশ্বের পুঁজি যুক্তরাষ্ট্রমুখী হয়। এতে অনেক দেশের মুদ্রার ওপর চাপ তৈরি হয়, আমদানি ব্যয় বাড়ে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বেড়ে যায়।
অন্যদিকে ফেড সুদের হার কমালে শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, বিশ্ব অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে ঋণ সস্তা হওয়ায় বিশ্ববাজারে ডলারের তারল্য বেড়ে যায়। বিনিয়োগকারীরা উচ্চ মুনাফার আশায় উদীয়মান অর্থনীতিগুলোতে বিনিয়োগে আগ্রহী হন, বিষয়টি তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হলেও। তাই ফেডের প্রতিটি সুদহার-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের আর্থিক বাজার, সরকার ও বিনিয়োগকারীদের নজর থাকে।
ফেডের নীতি সুদহার অপরিবর্তিত থাকার অর্থ হলো, আপাতত উন্নয়নশীল বিশ্বে বিনিয়োগ হ্রাস-বৃদ্ধির সম্ভাবনা নেই। অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির পালে হাওয়া লাগার সম্ভাবনা কম।