
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে কাতার তীব্র অর্থনৈতিক চাপে পড়ে। উচ্চ ঋণ ও স্বল্প রাজস্ব আয় দেশটির আর্থিক ব্যবস্থার জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। পরিস্থিতি বদলাতে ছোট এই উপসাগরীয় দেশটি প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর বড় ধরনের বাজি ধরে।
কাতারের সমুদ্র উপকূলবর্তী অঞ্চলে যেসব গ্যাসক্ষেত্র আছে, সেগুলো উন্নয়নের সিদ্ধান্ত নেয় তারা। একই সঙ্গে জাহাজে করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর জন্য তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নেয়।
এই সিদ্ধান্ত থেকেই উপকূলীয় শিল্পনগরী রাস লাফানের জন্ম হয়। রাজধানী দোহা থেকে গাড়িতে প্রায় এক ঘণ্টার দূরত্বে গড়ে ওঠা এই শিল্পনগরী পরবর্তী তিন দশকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানি কেন্দ্রে পরিণত হয়। এর মধ্য দিয়ে কাতার এখন বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ।
কিন্তু গত ১৮ মার্চ সেই সাফল্যের গল্প বড় হোঁচট খায়। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রাস লাফানের প্রধান গ্যাস কমপ্লেক্সে আঘাত করে। এতে বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় ১৭ শতাংশ বন্ধ হয়ে যায়।
এই ক্ষয়ক্ষতির কারণে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কাতার এনার্জির বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার রাজস্ব হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে চীনসহ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো মেরামতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক ক্যারেন ইয়াং বলেন, এই হামলা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের জন্য যেমন বড় ধাক্কা, তেমনি উপসাগরীয় দেশগুলোর কাছেও আতঙ্কের বিষয়। এসব দেশ মনে করছে, এই যুদ্ধের কারণে তারা বড় ঝুঁকির মধ্যে আছে।
কাতার এনার্জির প্রধান নির্বাহী সাদ আল-কাবি বলেন, এবার যে ক্ষয়ক্ষতি হলো, তাতে এই অঞ্চল ১০ থেকে ২০ বছর পিছিয়ে যাবে।
ইসরায়েল ইরানের সাউথ পার্স গ্যাসক্ষেত্রে বোমা হামলা চালানোর পরই ইরান পাল্টা হামলা চালায়। গ্যাসক্ষেত্রটি কাতারের নর্থ ডোম ক্ষেত্রের সীমান্তবর্তী। এই দুটি গ্যাসক্ষেত্রে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুত আছে।
চলমান সংঘাতে এখন পর্যন্ত পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলের প্রায় ৫ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে বলে এক হিসাবে উল্লেখ করা হয়।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরুর পর থেকে ৮০টির বেশি স্থাপনায় আঘাত লাগে। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশের বেশি স্থাপনা গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কাতারের পাশাপাশি বাহরাইন, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়। ফলে পুরো অঞ্চল বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
বিশ্বব্যাংক ইতিমধ্যে এই যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের চলতি বছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে ১ দশমিক ৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। এর আগে ২০২৬ সালে ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ক্ষতের আশঙ্কার কথাও জানিয়েছে তারা।
বিশ্বব্যাংক আরও জানিয়েছে, সবচেয়ে বড় সংকোচনের মুখে পড়তে পারে কাতার ও কুয়েত। অন্যদিকে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল। কেননা তেল রপ্তানির জন্য তারা হরমুজ প্রণালির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল নয়।
আঞ্চলিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান খালিজ ইকোনমিকসের পরিচালক জাস্টিন আলেকজান্ডার বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর এই যুদ্ধের গুরুতর প্রভাব পড়ছে। তবে সংঘাত এখনো চলমান থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র মূল্যায়ন করা কঠিন।
জাস্টিন আরও বলেন, যুদ্ধ আজ থেমে গেলেও স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে অনেক সময় লেগে যাবে। অর্থাৎ দীর্ঘ সময় ধরে এই যুদ্ধের ফল ভোগ করে যেতে হবে। শুধু জ্বালানি অবকাঠামোর ক্ষতি হলেই অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বিষয়টি সে রকম নয়।
হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেল ও গ্যাস রপ্তানি অনেকটা কমে গেছে। এতে সংকট আরও গভীর হয়। সাধারণত বৈশ্বিক তেল ও এলএনজির প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ দিয়ে পরিবাহিত হয়।
এই হরমুজ প্রণালি উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতির প্রাণ। সৌদি আরব বাধ্য হয়ে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন ব্যবহার করে ইয়ানবু বন্দরে তেল পাঠাচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত ফুজাইরাহ পাইপলাইন ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে স্বাভাবিক সময়ে হরমুজ দিয়ে যে পরিমাণ জ্বালানি পরিবাহিত হয়, এই বিকল্প ব্যবস্থায় তার অর্ধেকেরও কম পরিবহন করা সম্ভব হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান এই পরিস্থিতিকে ‘ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জ্বালানিসংকট’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। অন্যদিকে কাতারের অর্থমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, ইরান যুদ্ধের পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক অভিঘাত এখনো টের পাওয়া যায়নি।
কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং চ্যাটহ্যাম হাউসের ফেলো বাদের আল সাইফ বলেন, এই সংকটের কারণে কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো দেশগুলো ট্যাংকার জাহাজের বিকল্প হিসেবে পাইপলাইন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে উৎসাহিত হতে পারে।
আল সাইফ আরও বলেন, তেল ও গ্যাস পরিবহনের জন্য তারা শুধু একটি পথের ওপর নির্ভর করতে পারে না। আজ ইরান হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভবিষ্যতে অন্য কোনো বহিরাগত হুমকিও আসতে পারে।
আরও যেসব খাতে অভিঘাত
এই অর্থনৈতিক অভিঘাত শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ভ্রমণ ও পর্যটন খাতেও বড় ধাক্কা লেগেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের বেশ কয়েকটি দেশের অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের প্রধান স্তম্ভ এই খাত।
ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল গত মার্চ মাসে জানায়, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে মধ্যপ্রাচ্য প্রতিদিন প্রায় ৬০ কোটি ডলার পর্যটন আয় হারিয়েছে।
এদিকে গত কয়েক দশকে সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্ব পর্যটনের কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে বিপুল অর্থ ও সময় ব্যয় করেছে। এই যুদ্ধে যেসব উপসাগরীয় দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার তাদের মধ্যে অন্যতম। দুবাইয়ে হোটেল কক্খসের আগাম সংরক্ষণ কমে যাওয়া, ব্যাপক হারে কক্ষ বাতিল, ক্রেতা কমে যাওয়া—এসব লক্ষণ থেকে বোঝা যায়, পরিস্থিতি সুবিধার নয়। ফলে অনেকে চাকরি হারাচ্ছে, বা তাদের বেতনহীন ছুটিতে পাঠানো হচ্ছে।
আর্থিক ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের চাপের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। গত মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ডলারসংকট মোকাবিলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় মিত্রদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কারেন্সি সোয়াপ বা মুদ্রা বিনিময়ের সুবিধা বাড়ানোর কথা বিবেচনা করছে।
এ ধরনের ব্যবস্থার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সহজে মার্কিন ডলার পেতে পারে, যদিও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেয় না। যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির রাষ্ট্রদূত ইউসুফ আল ওতাইবা বলেন, তাদের আর্থিক সহায়তা প্রয়োজন—এমন ধারণা বাস্তবতার ভুল উপস্থাপন।
সংযুক্ত আরব আমিরাত একই সঙ্গে ওপেক ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছে। ফলে দেশটি তেল রপ্তানি বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরও স্বাধীনতা পেয়েছে। বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৩৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী এই জোটে আমিরাত চতুর্থ বৃহত্তম উৎপাদক।
বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার অর্থনীতি পুনর্গঠনে তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোর আর্থিক সহায়তার জরুরি। কিন্তু সেই দেশগুলো এখন নিজেরাই ক্ষয়ক্ষতির মুখে।
জাস্টিন আলেকজান্ডার বলেন, এই পরিস্থিতিতে লেবানন ও সিরিয়ার মতো দেশের পক্ষে হয়তো বিপুল সহায়তা ও বিনিয়োগ পাওয়া সহজ হবে না।
অর্থনৈতিক কাঠামোতে প্রভাব
এই সংঘাতের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ কর্মসূচিতেও প্রভাব পড়তে পারে। তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্রীড়া ও বিনোদন খাতে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির নিজেদের আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। এর লক্ষ্য—দক্ষ জনশক্তি আকর্ষণ করা।
কিছু বিশ্লেষকের মনে প্রশ্ন, এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ কমাতে পারে কি না। বাদের আল সাইফ বলেন, হতে পারে, উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রে যে ট্রিলিয়ন ও বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি ইতিমধ্যে দিয়ে রেখেছে, তা নিয়ে কিছু দেশ নতুন করে ভাববে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরানের সঙ্গে সংঘাত নিরসনে স্থায়ী চুক্তি না হলে এবং হরমুজ প্রণালি খোলা রাখার নিশ্চয়তা না মিললে অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়তে পারে।
তাঁরা মনে করেন, এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। সমঝোতা না হলে এই অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে সংঘাত চলতে পারে, সে তার মাত্রা যতই কম হোক না কেন।