অন্তর্বর্তী বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে বৈঠক শুরু করেছে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র। গতকাল সোমবার থেকে নয়াদিল্লিতে দুই দেশের শীর্ষ বাণিজ্য প্রতিনিধিদের মধ্যে চার দিনের বৈঠক শুরু হয়েছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ফেব্রুয়ারিতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তির কাঠামো নিয়ে যে প্রাথমিক সমঝোতা হয়েছিল, তার আইনি ও কারিগরি দিক চূড়ান্ত করা হবে এই বৈঠকে। সেই সঙ্গে বিভিন্ন ঝুলন্ত বিষয়ে আলোচনা হবে এই বৈঠকে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সংবাদে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটনের ‘৩০১ নম্বর ধারায় তদন্ত’ ও সম্ভাব্য শুল্কসংক্রান্ত পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করবে ভারত। বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে দুই দেশ এই সংলাপে বসছে বলে ভারত সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ প্রাথমিক বাণিজ্য সমঝোতায় পৌঁছালেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত পারস্পরিক শুল্ক যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে বাতিল হওয়ার পর আলোচনার গতি কিছুটা কমে যায়।
আদালতের ওই রায়ের পর ট্রাম্প প্রশাসন ‘ট্রেড অ্যাক্ট ১৯৭৪’-এর ৩০১ নম্বর ধারা অনুযায়ী বিভিন্ন বাণিজ্য অংশীদারের বিরুদ্ধে ‘অন্যায্য বাণিজ্য’বিষয়ক তদন্ত শুরু করে, যার মধ্যে ভারতও আছে। একই সঙ্গে সব দেশের ওপর গড়ে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়।
ভারতীয় বাণিজ্য-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, লিঞ্চ ও তাঁর দলের সঙ্গে আলোচনায় নয়াদিল্লি এই তদন্তসংক্রান্ত শুল্কের প্রভাব থেকে ছাড় চাইবে। তবে গোপনীয়তার কারণে সূত্রটির নাম প্রকাশ করা হয়নি।
সূত্রের ভাষ্য, শুল্কহার, ৩০১ নম্বর ধারায় তদন্তের প্রভাব ও প্রতিযোগীদের তুলনায় সুবিধাজনক শুল্কহার নিয়ে আলোচনা করবে ভারত। যদি শর্তগুলো ন্যায্য, সমতাপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ হয়, তাহলে চুক্তি সম্ভব।
ভারতের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক মন্তব্য করেনি। সূত্র আরও জানায়, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতিযোগী উৎপাদনকেন্দ্রগুলোর তুলনায় সুবিধাজনক শুল্কহার আদায় করতে চায় নয়াদিল্লি। বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করাই ভারতের মূল লক্ষ্য।
ভারত আশা করছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় তারা অনুকূল শর্তে চুক্তি করতে পারবে, অর্থাৎ এই দেশগুলোর তুলনায় তাদের শুল্ক কম থাকবে।
বাণিজ্যচুক্তির মূল কাঠামো চূড়ান্ত হলে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার ভারতে সফর করতে পারেন বলেও সূত্রটি ইঙ্গিত দিয়েছে। গত সপ্তাহে ভারতে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত সের্জিও গোর বলেন, আগামী কয়েক সপ্তাহ বা মাসের মধ্যেই নয়াদিল্লির সঙ্গে চুক্তি চূড়ান্ত হতে পারে।
চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি ভারত ও আমেরিকা যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যচুক্তির প্রথম পর্যায়ের রূপরেখা ঘোষণা করা হয়। সেই কাঠামো অনুযায়ী, ভারতীয় পণ্যে আমেরিকার শুল্কের হার ৫০ থেকে কমিয়ে ১৮ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল কেনার কারণে ভারতীয় পণ্যে রোপিত অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। খবর ইকোনমিক টাইমস।
পরবর্তী কালে পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়। গত ২০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরোপিত পারস্পরিক শুল্কের বিরুদ্ধে রায় দেয়। এরপরই ট্রাম্প প্রশাসন ২৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৫০ দিনের জন্য বিশ্বের সব দেশের ওপর একক-১০ শতাংশ শুল্ক চাপানোর কথা ঘোষণা করে।
এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের বৈঠক স্থগিত হয়ে যায়। পরে এপ্রিলে ওয়াশিংটনে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা হয়। সেই আলোচনার সূত্র ধরেই এবার মার্কিন প্রতিনিধিদল ভারত সফরে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে, এমন সব দেশই ১০ শতাংশ শুল্কের আওতায় থাকায় ফেব্রুয়ারির সমঝোতা কাঠামো নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন সৃষ্টি হয়েছে।