তেহরানের একটি আবাসিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়ে ব্যাগ হাতে হেঁটে যাচ্ছেন এক ইরানি নাগরিক। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
তেহরানের একটি আবাসিক এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ধ্বংসস্তূপের পাশ দিয়ে ব্যাগ হাতে হেঁটে যাচ্ছেন এক ইরানি নাগরিক। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলা, বিশ্ববাজারে যে প্রভাব পড়তে পারে

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলায় ইতিমধ্যে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা নিহত হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই এই আঘাত মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন অস্থিরতার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলেইআশঙ্কা।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে তাঁদের যে নিরাপত্তাজনিত হুমকি ছিল, এর মধ্য দিয়ে তার অবসান হবে। সেই সঙ্গে ইরানের জনগণ যে দীর্ঘদিন ধরে সরকার পরিবর্তনের আন্দোলন করছেন, তাঁদের সামনে সেই রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হবে।খবর রয়টার্সের

হামলার পর তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোয়উদ্বেগ বেড়েছে। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা জোরালো হয়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় তেহরান ইসরায়েলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলা করেছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে, তা দেখা যাক।

তেলের দাম

মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো সংকট তৈরি হলে প্রথম যে শঙ্কা মানুষের মনে উঁকি দেয় সেটা হলো, তেলের দামের কী হবে। ইরান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর একটি। হরমুজ প্রণালির ওপারে তেলসমৃদ্ধ আরব উপদ্বীপের মুখোমুখি অবস্থান এর। এই সরু জলপথ দিয়ে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হয়। সংঘাত তীব্র হলে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে, তাতে অবধারিতভাবেই তেলের দাম বাড়বে।

আজ রোববার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দর ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭৩ ডলার, চলতি বছরে যা ইতিমধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। বিভিন্ন বাণিজ্যসূত্রের তথ্য অনুযায়ী, হামলার পর কয়েকটি বড় তেল কোম্পানি ও শীর্ষ ট্রেডিং হাউস হরমুজ হয়ে অপরিশোধিত তেল ও জ্বালানি পরিবহন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে।

ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের উন্নয়নশীল বাজারবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক উইলিয়াম জ্যাকসনের মতে, সংঘাত সীমিত পরিসরে থাকলেও ব্রেন্টের দাম ৮০ ডলার ছুঁতে পারে। গত বছরের জুন মাসে ১২ দিনের ইসরায়েল-ইরান সংঘাতের সময় তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি সর্বোচ্চ ৮০ ডলার স্পর্শ করেছিল। তবে দীর্ঘ সময়ের জন্য সরবরাহ ব্যাহত হলে দাম ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এতে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি শূন্য দশমিক ৬ থেকে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট যোগ হতে পারে।

বিশ্ববাজারে অস্থিরতার ঢেউ

ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে সাধারণত আর্থিক বাজারে অনিশ্চয়তা ছড়িয়ে পড়ে। চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতি ও প্রযুক্তি খাতে শেয়ার বিক্রির ধুম পড়ায় ইতিমধ্যে ওয়ালস্ট্রেটে সূচকের ওঠানামা দেখা গেছে। এই হামলা গতকাল শনিবার শুরু হওয়ায় এখন পর্যন্ত বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে তার প্রভাব দেখা যায়নি। কেননা শনি ও রোববার পশ্চিমা পৃথিবীতে বাজার বন্ধ থাকে।

ভিআইএক্স ভোলিটিলিটি ইনডেক্স বা অস্থিরতা সূচক এ বছর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বেড়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ড বাজারের অস্থিরতার সূচক বেড়েছে প্রায় ১৫ শতাংশ।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, মুদ্রাবাজারও চাপমুক্ত থাকবে না। কমনওয়েলথ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার হিসাবে, গত জুনের সংঘাতের সময় ডলার সূচক প্রায় ১ শতাংশ পড়ে গিয়েছিল, যদিও সেই পতন ছিল স্বল্পমেয়াদি।

বর্তমান পটভূমিতেডলারের দাম নির্ভর করবে সংঘাতের ব্যাপ্তি ও স্থায়িত্বের ওপর। সংঘাত দীর্ঘ হলে এবং তেল সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে অধিকাংশ মুদ্রার বিপরীতে মার্কিন ডলার শক্তিশালী হতে পারে। তবে জাপানি ইয়েন ও সুইস ফ্রাঁ তুলনামূলকভাবে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে টিকে থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এখন জ্বালানির নিট রপ্তানিকারক হওয়ায় তেলের দাম বাড়লে তারা কিছুটা সুবিধা পায়।

ইসরায়েলের মুদ্রা শেকেলও অস্থিরতার মুখে পড়তে পারে। অতীতে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার বিভিন্ন পর্যায়ে শেকেল সাময়িকভাবে দুর্বল হলেও দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তবে বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মর্গ্যান চেজ সতর্ক করেছে, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এবং বাজারে ঝুঁকির স্থায়ী প্রভাব পড়লে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে।

বিষয়টি হলো, ইরানের সঙ্গে এই সংঘাতে যদি তার আঞ্চলিক মিত্র ও প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো জড়িয়ে পড়ে, অর্থাৎ এই সামরিক অভিযান আরও বিস্তৃত হয়, তাহলে বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে অস্থিরতা ও চাপ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা বাড়বে।