
২০২৩ সালের নভেম্বর মাসে চীনের দুটি কোম্পানির প্রতিনিধি রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে একটি চুক্তি সই করেন। চুক্তির উদ্দেশ্য ছিল নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য পাথর ভাঙার যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা।
কিন্তু চুক্তিটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সঙ্গে নয়; এটি করা হয়েছিল এমন এক সত্তার সঙ্গে, যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই। চুক্তির বিষয়টি ঘোষণা করেন ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে রাশিয়া-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীদের গঠিত তথাকথিত ‘দোনেৎস্ক গণপ্রজাতন্ত্রের’ তৎকালীন ‘প্রধানমন্ত্রী’ এভগেনি সলন্তসেভ।
যুদ্ধবিধ্বস্ত এ অঞ্চল সম্পদসমৃদ্ধ। কিন্তু ২০১৪ সালে রাশিয়ার সমর্থনে ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা কার্যত আধা রাষ্ট্রিক কাঠামোয় পর্যবসিত হয়।
সলন্তসেভ টেলিগ্রামে লিখেছিলেন, ‘আমাদের সহযোগিতার সম্ভাবনা বিশাল এবং আমরা এখনই তা বাস্তবায়ন শুরু করেছি।’ তাঁর পোস্টে চারজন চীনা প্রতিনিধি ও বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকর্তার পাশাপাশি চীন, রাশিয়া ও দোনেৎস্ক ‘গণপ্রজাতন্ত্রের’ পতাকার ছবি ছিল।
চীনের যেসব কোম্পানি এ প্রকল্পে যুক্ত ছিল, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে ঝোংশিন হেভি ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেশিনারি ও আম্মা কনস্ট্রাকশন মেশিনারি। তারা দক্ষিণ দোনেৎস্ক অঞ্চলের কারানস্কি খনিতে পাথর ভাঙার যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে। এই ভাঙা পাথর পরে ইউক্রেনের রুশ অধিকৃত অঞ্চলের বিভিন্ন নির্মাণকাজে ব্যবহার করা হয়েছে।
মারিউপোলে নির্মাণ, গণকবরের বিতর্ক
চলমান নির্মাণকাজগুলোর একটি চলছে আজভ সাগরের তীরবর্তী মারিউপোল বন্দরে। ২০২২ সালের শুরুর দিকে শহরটির অবরোধে নিহত হাজারো বেসামরিক মানুষের গণকবরের ওপরই সেখানে বহু ভবন নির্মাণ করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঝোংশিন হেভি ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেশিনারি অবশ্য আল–জাজিরার মন্তব্যের অনুরোধের জবাব দেয়নি।
অন্যদিকে আম্মা কনস্ট্রাকশন মেশিনারি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া তুলনামূলকভাবে কঠিন। তাদের ওয়েবসাইটে রাশিয়ার সাইবেরিয়ার ইরকুতস্ক শহরের একটি ফোন নম্বর এবং ‘বার্ক’ নামের একটি কোম্পানির ওয়েবসাইটের লিংক রয়েছে।
‘স্বাধীনতা’র ছদ্মরূপ, নিয়ন্ত্রণ মস্কোর হাতে
আন্তর্জাতিকভাবে কেবল উত্তর কোরিয়া ও সিরিয়া (বাশার আল-আসাদের শাসনামলে) দোনেৎস্ক ও পাশের লুহানস্ক অঞ্চল স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। পরবর্তীকালে ২০২২ সালে মস্কো এই অঞ্চলসহ ইউক্রেনের আরও দুটি এলাকা নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করার ঘোষণা দেয়; যদিও বাস্তবে এসব অঞ্চলের কোনো অংশই সম্পূর্ণভাবে রাশিয়ার সামরিক নিয়ন্ত্রণে নেই।
ডোনেৎস্ক ও লুহানস্ক এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ছদ্মরূপ ধরে রেখেছে, যেমন মন্ত্রিসভা বা সীমান্তের চেকপয়েন্ট। তবে বাস্তব ক্ষমতা পুরোপুরি মস্কোর হাতে।
এ দুই অঞ্চলে রাশিয়া-সমর্থিত কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রো-ইউক্রেনীয় কর্মী ও ব্যবসায়ীদের ওপর নির্যাতন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগও আছে, বিশেষ করে যারা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সম্পদের ভাগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
দনবাসে ‘ইউয়াননির্ভর’ অর্থনীতি
ইস্টার্ন হিউম্যান রাইটস গ্রুপের (ইএইচআরজি) তথ্যানুসারে, বর্তমানে অন্তত ১৭টি চীনা কোম্পানি এই অধিকৃত অঞ্চলে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এ ছাড়া সেখানে চীনে তৈরি প্রায় ছয় হাজার মোবাইল নেটওয়ার্ক রিলে স্টেশন বসানো হয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, চীনা কোম্পানিগুলো খনি, নির্মাণ, টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম সরবরাহ, আর্থিক সেবাসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায় জড়িত। তবে তারা অনেক ক্ষেত্রেই নীরবে কাজ করছে। তাদের উপস্থিতির তথ্য মূলত বিচ্ছিন্নতাবাদী বা রুশ নিয়োজিত কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকেই জানা যায়।
ইএইচআরজির ম্যাকসিম বুতচেঙ্কো আল–জাজিরাকে বলেন, রাশিয়া যেমন এসব অঞ্চলের রাজনৈতিক কাঠামো ধীরে ধীরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিচ্ছে, তেমনি অর্থনীতিতেও বিকল্প গড়ে উঠছে। চীনা কোম্পানিগুলো এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
ম্যাকসিমের মতে, ২০১৪ সালের আগে দনবাস অঞ্চলে থাকা ৯৪টি কয়লাখনির মধ্যে এখন মাত্র ৫টি চালু রয়েছে। বাকি খনিগুলো এখন কার্যত নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত অর্থনৈতিক কাঠামোর দিকে ঝুঁকেছে।
ম্যাকসিম আরও বলেন, এ অঞ্চলের অর্থনীতি কার্যত ‘ইউয়াননির্ভর’ হয়ে পড়েছে। স্থানীয় ব্যবসাগুলো চীনা ইলেকট্রনিক পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করছে, টেলিগ্রাম চ্যানেলের মাধ্যমে মুদ্রা বিনিময় ও লেনদেন চলছে। এমনকি অধিকৃত এলাকায় ৭৯টি ব্যাংকে ইউয়ানও বিক্রি হচ্ছে।
ইএইচআরজি বলছে, সেখানে যা ঘটছে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আইনের দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগজনক; কেননা, এসব আন্তর্জাতিক চুক্তির পরিপন্থী। তারা এই প্রক্রিয়াকে ‘শ্যাডো ইন্টিগ্রেশন’ বা ছায়া একীকরণ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
নিরপেক্ষতার দাবি, বাস্তবে চীনা প্রভাব
চীনের ভূমিকা সম্পর্কে বলা হচ্ছে, বেইজিং এ যুদ্ধকে ‘সংকট’ হিসেবে অভিহিত করলেও অধিকৃত অঞ্চলকে রাশিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি; বরং তারা বারবার ইউক্রেনের ‘ভৌগোলিক অখণ্ডতার’ প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
তবে বাস্তবে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহৃত ড্রোনের বিপুলসংখ্যক যন্ত্রাংশ চীনা কারখানা থেকেই সরবরাহ হচ্ছে—এসব আবার দুই পক্ষই ব্যবহার করছে। বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখলেও বাস্তবে চীনা কোম্পানিগুলো অধিকৃত অঞ্চলের বাজারে প্রায় একচ্ছত্র অবস্থান তৈরি করেছে বলে দাবি করেন বুতচেঙ্কো।
কিয়েভভিত্তিক বিশ্লেষক ভলোদিমির ফেসেনকো আল–জাজিরাকে বলেন, এসব কোম্পানি কার্যত স্বাধীনভাবে কাজ করছে এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি জেনেও তারা এই বাজারে প্রবেশ করেছে।
ফেসেনকোর ভাষায়, ‘চীন সরাসরি নিষেধ করে না, আবার পুরোপুরি বাধাও দেয় না—অনেক ক্ষেত্রে চোখ বন্ধ করে থাকে। কোনো কোম্পানির যদি স্বার্থ থাকে, তারা নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিও নিতে প্রস্তুত।’
নিষেধাজ্ঞা, প্রযুক্তি ও চীনের বিকল্পহীনতা
ইউক্রেন সরকার এসব কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং পশ্চিমা দেশগুলোকেও একই পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানাচ্ছে। তাদের নিষিদ্ধের তালিকায় আছে আলিবাবা, চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনসহ বড় বড় প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রাংশ যারা বানায়, তারাও এই নিশানায় আছে।
তবে কিছু ক্ষেত্রে চীনা কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ কার্যত কঠিন হয়ে পড়ে; কেননা, তাদের প্রযুক্তি ও সেবার বিকল্প ব্যবস্থা করা ব্যয়বহুল। উদাহরণ হিসেবে হুয়াওয়ের কথা বলা হয়—চীনের প্রধান এই প্রযুক্তি কোম্পানির যন্ত্রপাতি যেমন অধিকৃত অঞ্চলে ব্যবহৃত হচ্ছে, তেমনই ইউক্রেনেও তাদের কার্যক্রম আছে।
একজন টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাদের দাম প্রতিযোগীদের তুলনায় অনেক কম। একবার আমাদের এক প্রযুক্তিগত সমস্যা সমাধানে তাদের প্রকৌশলীরা সারা রাত কোডিং করেছে, সকালে সমস্যা সমাধান হয়ে যায়।
অধিকৃত অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা জানান, অনেক ক্ষেত্রেই তাদের কাছে চীনা পণ্যের বিকল্প নেই। কেননা, অন্য কোম্পানিগুলো সেখানে পণ্য সরবরাহ করতে রাজি নয়।
দোনেৎস্কের এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘চীন এখানে স্থায়ীভাবে আছে। নতুন যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে ভেন্টিলেটর—সবই এখন চীনা।’
অধিকৃত অঞ্চলে ইরানের অর্থনৈতিক সংযোগ
এই পুরো বাস্তবতায় আরেকটি দিক হিসেবে উঠে আসছে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক। প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, মস্কো অধিকৃত অঞ্চলগুলোকে ইরানের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। ইরান এসব অঞ্চল থেকে শস্য ও কয়লা কিনছে এবং দনবাসের অর্থনীতিকে নিজেদের লজিস্টিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত করছে।
দোনেৎস্ক ও লুহানস্কের জাতীয়করণ করা খনি পরিচালনাকারী রুশ কোম্পানি দনিয়েস্কিয়ে উগলি এই কয়লা ইরানে রপ্তানি করছে বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া লুহানস্কের উপপ্রধানমন্ত্রী পাভেল কোভালেভ বলেন, স্থানীয় খামারিরা দুধ থেকে তৈরি কেজিন নামের প্রোটিন ইরানে সরবরাহ করতে প্রস্তুত।
বিশ্লেষক বুতচেঙ্কোর মতে, ইরানের সম্পৃক্ততা থেকে প্রমাণিত হয়, এ অঞ্চলে বিদেশি কোম্পানিগুলোর প্রবেশ কেবল বাণিজ্যিক নয়, বরং রাশিয়ার কৌশলগত বিষয়।
বুতচেঙ্কার ভাষায়, ক্রেমলিন শুধু অনুমতি দেয় না, বরং ইরানি কোম্পানিগুলোকে এই বাজারে ঢুকতে সক্রিয়ভাবে উৎসাহিতও করছে।