বিশ্বের শীর্ষ ১০ তেল কোম্পানি, মধ্যপ্রাচ্যের মাত্র ১টি

আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি হচ্ছে জ্বালানি তেল। পরিবহন থেকে উৎপাদন—প্রায় প্রতিটি খাতে এই জ্বালানি–নির্ভরতা স্পষ্ট। ব্যক্তিগত গাড়ি চালানো হোক বা ভারী শিল্পকারখানার চাকা ঘোরানো—তেল ছাড়া কিছুই চলে না।

যেসব দেশের হাতে বিপুল তেলসম্পদ রয়েছে, তাদের অনেকেই দ্রুত সমৃদ্ধ হয়েছে। এ কারণে তেলের উৎস ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা দীর্ঘদিনের। দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে তেলের প্রধান উৎস হলেও বাজার মূলধনের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ ১০টি তেল কোম্পানির মধ্যে এখন একটি মাত্র মধ্যপ্রাচ্যের। এই ব্যবসায়ও যথারীতি পশ্চিমাদের দাপট।

কোনো অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রেও জ্বালানি তেলের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। প্রবৃদ্ধির পালে হাওয়া লাগলে তেলের চাহিদা বাড়ে। আবার গতি কমে গেলে তেলের চাহিদা কমে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নানা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও তেলের দামে নিম্নমুখী প্রবণতার পেছনে বড় কারণ বৈশ্বিক অর্থনীতির শ্লথগতি। বিশেষ করে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের মন্থরতা।

তবু বাস্তবতা হলো, বৈশ্বিক করপোরেট পরিমণ্ডলে তেল কোম্পানিগুলো এখনো প্রভাবশালী। এবার দেখা যাক, বিশ্বের শীর্ষ তেল কোম্পানিগুলোর তালিকায় কারা রয়েছে।

সিনোপেক, দেশ: চীন, বাজার মূলধন: ১১৩.৯৬ বিলিয়ন ডলার

বিশ্বের দশম বৃহত্তম এই কোম্পানির সামগ্রিক অবস্থান ২০০তম। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত এই জ্বালানি কোম্পানি তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান থেকে পরিশোধন ও পেট্রোকেমিক্যাল উৎপাদন করে। বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান ধরে রেখে প্রতিষ্ঠানটি চীনের জ্বালানি নিরাপত্তায় ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি হাইড্রোজেন ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে ভবিষ্যৎ জ্বালানি রূপান্তরের দিকেও কৌশলগতভাবে অগ্রসর হচ্ছে।

তবে কার্বন নিঃসরণজনিত পরিবেশদূষণের কারণে বিশ্বের অনেক দেশ এখন জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। সৌরশক্তির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে বিদ্যুৎচালিত গাড়ির ব্যবহার। এই বাস্তবতায় জ্বালানি তেল কোম্পানিগুলোর বৃদ্ধির হার হয়তো কমে আসবে, এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে।

এনব্রিজ, দেশ: কানাডা, বাজার মূলধন: ১১৫.৯৪ বিলিয়ন ডলার

বিশ্বের নবম বৃহত্তম এই তেল কোম্পানি এবং সামগ্রিকভাবে ১৯৪তম বৃহৎ কোম্পানি। কানাডার এই কোম্পানি কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে বিশ্বের বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল ও তরল গ্যাসের পাইপলাইন পরিচালনা করে। চলতি ২০২৫ সালে কোম্পানিটির বাজার মূলধন বেড়েছে ১৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ। আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে কোম্পানিটির বাজার মূলধন বেড়েছে ১৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত কোম্পানিটির সমন্বিত সম্পদ ছিল ১৫৫ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন বা ১৫ হাজার ৫৮৩ কোটি ডলার।

কনোকো ফিলিপস, দেশ: যুক্তরাষ্ট্র, বাজার মূলধন: ১৩৮.৬৮ বিলিয়ন ডলার

বাজার মূলধনের দিক থেকে বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম এই কোম্পানি। সামগ্রিকভাবে এটি বিশ্বের ১৪৮তম কোম্পানি। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম তেল কোম্পানি। বিশ্বের ১৫টি দেশে এই কোম্পানির কার্যক্রম বিস্তৃত। তারা স্বল্প খরচে তেল ও গ্যাস উত্তোলনের জন্য বিখ্যাত। তাদের দৈনিক তেল উৎপাদনসক্ষমতা ১৫ লাখ থেকে ১৬ লাখ মিলিয়ন ব্যারেল। সেই সঙ্গে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের মাধ্যমে তারা কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের চেষ্টা করছে। এই কোম্পানি ২০১১ সালে বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রের দুটি ব্লকে গ্যাস উত্তোলনের কাজ পায়। তারা দ্বিমাত্রিক জরিপ চালালেও পরে গ্যাসের দাম বাড়ানোর দাবি পূরণ না হওয়ায় কাজ ছেড়ে চলে যায়।

সিনুক, দেশ: চীন, বাজার মূলধন: ১৫৯.৭৫ বিলিয়ন

বাজার মূলধনের দিক থেকে বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম কোম্পানি সিনুক, যা সামগ্রিকভাবে বিশ্বের ১২৫তম বৃহৎ কোম্পানি। এটি চীনের বৃহত্তম অফশোর তেল ও গ্যাস কোম্পানি। ১৯৮২ সালের প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানির বিশেষত্ব হলো অফশোর উৎপাদন। বোহাই উপসাগর ও দক্ষিণ চীন সাগরে তাদের তেলের খনি আছে। এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তাদের বিনিয়োগ আছে। তাদের কর্মীসংখ্যা ৯৮ হাজার।

টোটাল এনার্জি, দেশ: ফ্রান্স, বাজার মূলধন: ১৭২.০৯ বিলিয়ন

বাজার মূলধনের দিক থেকে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম এই তেল কোম্পানি এবং সামগ্রিকভাবে বিশ্বের ১০৮তম কোম্পানি। ২০২৫ সালে এই কোম্পানির বাজার মূলধন বেড়েছে ১৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ, যদিও ২০২৪ সালে তা কমেছিল ২৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ। ১৯২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানির প্রথম নাম ছিল টোটাল। তেল-গ্যাস উত্তোলন, পরিশোধন, রাসায়নিক ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে এই কোম্পানির ব্যবসা আছে। বিশ্বের ১৩০টি দেশে এই কোম্পানির কার্যক্রম বিস্তৃত। তাদের দৈনিক উৎপাদনসক্ষমতা ২৮ লাখ ব্যারেল।

শেল, দেশ: যুক্তরাজ্য, বাজার মূলধন: ২৩৬.১৬ বিলিয়ন

জ্বালানি তেল খাতে বাজার মূলধনের দিক থেকে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম এই কোম্পানি সামগ্রিকভাবে বিশ্বের ৬৮তম বৃহৎ কোম্পানি। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রাসায়নিক তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি। বিশ্বের ১৪০টি দেশে এই কোম্পানি সক্রিয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের কার্যক্রম আছে—মোট কর্মীসংখ্যা ৮৩ হাজার। চলতি বছর এই কোম্পানির বাজার মূলধন বেড়েছে ১০ দশমিক ৬৩ শতাংশ। যেখানে গত বছর তাদের বাজার মূলধন কমেছিল ১২ দশমিক ১৯ শতাংশ। ব্রিটিশ ও ডাচ বহুজাতিক এই কোম্পানি তেল-গ্যাস অনুসন্ধান, এলএনজি পরিশোধন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিশ্বের ৭০টির বেশি দেশে বিনিয়োগ করেছে।

পেট্রো চায়না, দেশ: চীন, বাজার মূলধন: ২৯৯.৪২ বিলিয়ন ডলার

বিশ্বের শীর্ষ তেল কোম্পানিগুলোর মধ্যে ৪ নম্বরে আছে চীনের এই কোম্পানি। বাজার মূলধনের দিক থেকে সামগ্রিকভাবে এটি বিশ্বের ৪৯তম শীর্ষ কোম্পানি। এটি চীনের বৃহত্তম তেল কোম্পানি। চীনসহ বিভিন্ন দেশে তাদের ১৮ হাজার ফিলিং স্টেশন আছে। ফলে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর মধ্যে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ কোম্পানি। এটি চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সাবসিডিয়ারি কোম্পানি। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানির প্রধান কার্যালয় চীনের রাজধানী বেইজিং। তেল উত্তোলন, পরিশোধন, পেট্রোকেমিক্যালসহ বিভিন্ন খাতে তাদের কার্যক্রম। এ ছাড়া অপ্রচলিত গ্যাস, শেল অয়েল ও বিভিন্ন বিদেশি উদ্যোগে তাদের বিনিয়োগ আছে।

শেভরন, দেশ: যুক্তরাষ্ট্র, বাজার মূলধন: ৩৭৩.৩৯ বিলিয়ন ডলার

বাজার মূলধনের দিক থেকে তৃতীয় বৃহত্তম এই তেল কোম্পানি সামগ্রিকভাবে বিশ্বের ৩১তম বৃহৎ কোম্পানি। ১৮৭৯ সালের প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানির প্রধান কার্যালয় যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের হিউস্টনে। তেল অনুসন্ধান, উৎপাদন, পরিশোধন—সব ক্ষেত্রেই শেভরনের বিনিয়োগ আছে। সেই সঙ্গে বিশ্বের ১৮০টি দেশে নিম্ন কার্বন নিঃসরণকারী প্রযুক্তিতেও বিনিয়োগ করেছে তারা। তাদের কর্মীসংখ্যা ৪৫ হাজার। বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে শেভরনের দৈনিক উৎপাদনসক্ষমতা ছিল ৪ দশমিক ০৯ মিলিয়ন বা ৪০ লাখ ৯ হাজার ব্যারেল।

এক্সন মবিল, দেশ: যুক্তরাষ্ট্র, বাজার মূলধন: ৬৩৫.৪৩ বিলিয়ন ডলার

তেল ব্যবসায় বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই কোম্পানি বহুল পরিচিত। এক্সন ও মবিল করপোরেশন একীভূত হয়ে ১৯৯৯ সালে এই কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। তেল উত্তোলন থেকে পরিশোধন—অনেক কিছুই করে থাকে এই কোম্পানি। বৈশ্বিক তেল উৎপাদনের ৩ শতাংশ এবং জ্বালানির ২ শতাংশ সরবরাহ করে এই কোম্পানি। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে এই কোম্পানি দৈনিক ৪৮ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করেছে। জ্বালানি কোম্পানি হিসেবে কার্বন নিঃসরণ হ্রাসেও ভূমিকা পালন করছে এই কোম্পানি। ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে তারা ১৫ বিলিয়ন বা ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে।

সৌদি আরামকো, দেশ: সৌদি আরব, বাজার মূলধন: ১.৬০ ট্রিলিয়ন ডলার

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি সৌদি আরামকো বিশ্বের বৃহত্তম তেল ও রাসায়নিক কোম্পানি। একই সঙ্গে বাজার মূলধনের দিক থেকে এটি বিশ্বের অষ্টম বৃহত্তম কোম্পানি। ১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানির প্রধান কার্যালয় সৌদি আরবের দাহরানে। রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন কোম্পানি হিসেবে ১০০টি তেল ও গ্যাসক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করে এই কোম্পানি। আরামকোর তেলের রিজার্ভ ২৭০ বিলিয়ন ব্যারেল। তাদের দৈনিক উৎপাদনসক্ষমতা ১২ দশমিক ৭ মিলিয়ন বা ১ কোটি ২৭ লাখ ব্যারেল। ২০২৪ সালে কোম্পানিটি ৬০৫ বিলিয়ন বা ৬০ হাজার ৫০০ কোটি ডলার আয় করেছে। এই সময় তারা মুনাফা করেছে ১৬১ বিলিয়ন বা ১৬ হাজার ১০০ কোটি ডলার। ২০২৫ সালের হিসাব এখনো প্রকাশ করেনি তারা।