ছবি: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট
ছবি: দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট

ট্রাম্পের ছবিসহ ২৫০ ডলারের নোট চালুর জন্য চাপ, অসম্মতির কারণে চাকরিচ্যুতি

যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা ছাপানোর দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ছবিসংবলিত ২৫০ ডলারের নোটের নকশা তৈরি করতে চাপ দিয়েছেন ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক কর্মকর্তারা। দেশটির ইতিহাসে ১৫০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে মার্কিন মুদ্রায় কোনো জীবিত ব্যক্তির ছবি দেওয়ার এমন উদ্যোগ এই প্রথম।

এই রাজনৈতিক চাপের বিরোধিতা করায় খেসারত দিতে হয়েছে ব্যুরো অব এনগ্রেভিং অ্যান্ড প্রিন্টিংয়ের (বিইপি) প্রথম নারী পরিচালক প্যাট্রিসিয়া ‘প্যাটি’ সোলিমেনকে। আইনি ও পদ্ধতিগত আপত্তির কথা তোলায় গত মাসে তাঁকে আকস্মিকভাবে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। বিদায়বেলায় সহকর্মীদের পাঠানো এক ই–মেইলে সোলিমেন লিখেছেন, ‘দ্য বাক স্টপড হেয়ার’ (অর্থাৎ সব আইনি জবাবদিহির শেষ আশ্রয়স্থলটি এখানেই ছিল এবং আমি নীতিতে অটল ছিলাম)।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের (অর্থ মন্ত্রণালয়) দুজন রাজনৈতিক মনোনীত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা—ইউএস ট্রেজারার ব্র্যান্ডন বিচ এবং তাঁর সিনিয়র উপদেষ্টা মাইক ব্রাউন গত বছর থেকে এই নোটের খসড়া তৈরি করতে কর্মীদের ওপর বারবার চাপ সৃষ্টি করেন। বিষয়টি নিয়ে বিইপির কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মচারী জানান, বর্তমান ফেডারেল আইন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রায় কোনো জীবিত ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করা সম্পূর্ণ অবৈধ। ১৮৬৬ সালের পর থেকে মার্কিন মুদ্রায় কোনো জীবিত মানুষের ছবি দেওয়া হয়নি। সে সময় এক সরকারি কর্মকর্তার ছবি ৫ সেন্টের নোটে আসার পর আইন করে এটি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

ট্রাম্পের পছন্দের ব্রিটিশ শিল্পী

অভিযোগ উঠেছে, গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ট্রেজারার ব্র্যান্ডন বিচ ব্যুরোর কর্মীদের কিছু নমুনা নকশা সরবরাহ করেন। এর একটিতে ২৫০ ডলারের নোটের ঠিক মাঝখানে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখচ্ছবি দেখা গেছে। আর এই মুখচ্ছবির দুই পাশে রয়েছে ট্রাম্প এবং বর্তমান অর্থসচিব স্কট বেসেন্টের স্বাক্ষর।

যুক্তরাজ্যের চিত্রশিল্পী ইয়ান আলেকজান্ডার এই নকশা তৈরি করেছেন বলে স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, খোদ ডোনাল্ড ট্রাম্প এই নকশায় কিছু পরিবর্তন এনেছেন। ট্রাম্পের পরামর্শেই নকশায় মার্কিন পতাকার রং এবং দেশের ও ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর লোগো যুক্ত করা হয়। আলেকজান্ডার বলেন, ‘ট্রাম্প আমাকে তাঁর প্রিয় ব্রিটিশ শিল্পী বলে ডাকতে পছন্দ করেন।’

নোটের অপর পিঠে আমেরিকার বিপ্লবকালীন পতাকা তৈরিকারক নারী বেটসি রসের ছবি দিয়ে ‘নারী মুক্তি’ থিম রাখার প্রস্তাব করা হয়েছিল, যা ট্রাম্প অত্যন্ত পছন্দ করেছেন বলেও জানান এই ব্রিটিশ শিল্পী।

‘রাতারাতি মুদ্রা ছাপা সম্ভব নয়’

মুদ্রণ ব্যুরোর সদ্য অপসারিত পরিচালক সোলিমেন ও তাঁর অধীনস্থ বিশেষজ্ঞরা প্রশাসনকে বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে একটি নতুন নোটের নকশা ও নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত করতে সাধারণত ৬ থেকে ৮ বছর সময় লাগে। জালিয়াতি রোধে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে এই নোট তৈরি করা দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।

একজন কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই রাজনৈতিক কর্তারা মনে করেন, রাতারাতি একটা নোট ছেপে ফেললেই হলো। আর সেটা এটিএম মেশিনে কাজ করা শুরু করবে! এটা পুরোপুরি পাগলামি।’

সোলিমেন আইনি বাধার কথা বলে কাজ এগোতে অস্বীকৃতি জানালে গত ২৭ এপ্রিল তাঁকে আকস্মিকভাবে বদলি করা হয়। তাঁর জায়গায় ভারপ্রাপ্ত পরিচালক করা হয়েছে ট্রাম্পেরই আরেক অনুগত কর্মকর্তা মাইক ব্রাউনকে।

১০০ ডলারের নোটে ট্রাম্পের স্বাক্ষর

২৫০ ডলারের নোটে ট্রাম্পের ছবির বিষয়ে আইনি জটিলতা থাকলেও, মার্কিন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো বর্তমান প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর–সংবলিত ১০০ ডলারের নোট ছাপানোর কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। ওয়াশিংটনের ডাউনটাউন কার্যালয়ে এই নোটগুলো ছাপা হচ্ছে। মুদ্রা বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, নোটে স্বাক্ষর দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা নেই।

চলতি বছরের জুলাই মাস থেকে আমেরিকার স্বাধীনতার ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্‌যাপন শুরু করতে যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই উৎসবকে কেন্দ্র করেই ২৫০ ডলারের বিশেষ স্মারক নোটটি চালুর মরিয়া চেষ্টা চলছে।

কংগ্রেসে এ–সংক্রান্ত একটি বিল উত্থাপন করা হলেও তা এখনো ঝুলে আছে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কংগ্রেস যদি বিলটি পাস করে, তবে ২৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে স্মরণীয় রাখতে তারা অগ্রিম প্রস্তুতি হিসেবে এই কাজ করছে।

এদিকে গত মাসে কোনো আইনি অনুমোদন ছাড়াই স্টেট ডিপার্টমেন্ট ঘোষণা করেছে যে তারা ট্রাম্পের ছবি ও স্বাক্ষর–সংবলিত বিশেষ পাসপোর্ট ইস্যু করা শুরু করবে।