
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন চীন সফরে আছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্টদের চীন সফর বরাবরই কৌতূহলোদ্দীপক। তবে এবারের সফরের আরেকটি কৌতূহলের জায়গা হলো, ট্রাম্পের সফরসঙ্গী হিসেবে চীনে যাওয়া একঝাঁক শীর্ষ ব্যবসায়ী ও প্রযুক্তি খাতের নির্বাহীরা। বিশেষ করে দুই দেশের সম্পর্ক যখন তলানিতে।
বেইজিং সফরে ট্রাম্পের সরকারি প্রতিনিধিদলে আছেন সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানি এনভিডিয়ার জেনসেন হুয়াং, অ্যাপলের টিম কুক, টেসলা ও স্পেসএক্সের ইলন মাস্ক, ব্ল্যাকরকের ল্যারি ফিঙ্কসহ মেটা, ভিসা, জেপি মরগান, বোয়িং, কারগিলসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহীরা। খবর বিবিসি।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা যখন ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, তখন প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে ট্রাম্পের বৈঠকের বিশেষ গুরুত্ব আছে। সেই সঙ্গে ভূরাজনৈতিক নানা বিষয় তো আছেই।
এবারের সফরে যে বিষয়টি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, সেটা হলো শেষ মুহূর্তে জেনসেন হুয়াংয়ের প্রতিনিধিদলে যুক্ত হওয়া। এনভিডিয়ার উন্নত চিপ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতের প্রাণ। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-চীনের প্রতিযোগিতার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে এই চিপ। যুক্তরাষ্ট্র চীনের কাছে এই চিপ রপ্তানি সীমিত করেছে। ফলে চীন নিজেই এই প্রযুক্তি বিকাশের চেষ্টা করছে। অনেকটা সফলও হয়েছে তারা।
হুয়াং ট্রাম্পের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। এ পরিষদে মেটার মার্ক জাকারবার্গ, ওরাকলের প্রধান ল্যারি এলিসনসহ আরও কয়েকজন ব্যবসায়ী আছেন। হুয়াং, মাস্ক, কুক, ফিঙ্ক ছাড়াও ট্রাম্পের সরকারি প্রতিনিধিদলে আছেন—
* মেটার প্রেসিডেন্ট ও ভাইস চেয়ারম্যান ডিনা পাওয়েল ম্যাককরমিক
* বোয়িংয়ের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কেলি অর্টবার্গ
* ভিসার প্রধান নির্বাহী রায়ান ম্যাকইনার্নি
* ব্ল্যাকস্টোনের প্রধান নির্বাহী স্টিফেন শোয়ার্জম্যান
* কারগিলের প্রধান নির্বাহী ও চেয়ারম্যান ব্রায়ান সাইকস
* সিটির প্রধান নির্বাহী জেন ফ্রেজার
* কোহেরেন্টের প্রধান নির্বাহী জিম অ্যান্ডারসন
* জিই অ্যারোস্পেসের প্রধান নির্বাহী হেনরি লরেন্স কাল্প
* গোল্ডম্যান স্যাকসের প্রধান নির্বাহী ডেভিড সলোমন
* ইলুমিনার প্রধান নির্বাহী জ্যাকব থেইসেন
* মাস্টারকার্ডের প্রেসিডেন্ট মাইকেল মিবাখ
এ ছাড়া মাইক্রন টেকনোলজির প্রধান নির্বাহী সঞ্জয় মেহরোত্রাও ট্রাম্পের প্রতিনিধিদলে আছেন, বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে ২০২৩ সালে চীন গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো খাতে মাইক্রনের কিছু চিপ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেয়। প্রতিষ্ঠানটি বলেছিল, এতে চীনের বাজারে তাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রযুক্তি রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ও নানা উত্তেজনা সত্ত্বেও সেমিকন্ডাক্টর এখনো যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্কের অন্যতম প্রধান বিষয়।
সিসকোর প্রধান নির্বাহী ও চেয়ারম্যান চাক রবিনসকেও সফরে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে কোম্পানির একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে তিনি যেতে পারেননি।
প্রতিনিধিদলে থাকা নির্বাহীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভোক্তা প্রযুক্তি, কম্পিউটার চিপ থেকে শুরু করে ভারী শিল্প উৎপাদন পর্যন্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যবসা করছেন।
ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক বায়োটেক প্রতিষ্ঠান ইলুমিনার মুখপাত্র বলেন, প্রতিনিধিদলের অংশ হতে পেরে থেইসেন সম্মানিত বোধ করছেন। প্রতিষ্ঠানটি আশা করছে, এ সফরের মধ্য দিয়ে ‘সম্পর্ক জোরদার এবং নির্ভুল চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভবিষ্যৎ গঠনের সুযোগ’ তৈরি হবে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা তাৎক্ষণিকভাবে বিবিসির মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি।
প্রথম দিকে প্রকাশিত তালিকায় এনভিডিয়ার প্রধান জেনসেন হুয়াংয়ের নাম ছিল না। অথচ কম্পিউটার চিপ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু তাঁর প্রতিষ্ঠান। তবে নাটকীয়ভাবে আলাস্কার অ্যাংকারেজে জ্বালানি নেওয়ার সময় বেইজিংগামী এয়ার ফোর্স ওয়ানে ওঠেন হুয়াং।
এনভিডিয়ার এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, আমেরিকা ও প্রশাসনের লক্ষ্যের প্রতি সমর্থন জানাতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমন্ত্রণে চীনে গেছেন জেনসেন। বিবিসি জানতে পেরেছে, ট্রাম্প যখন জানতে পারেন যে হুয়াং সফরসঙ্গীদের তালিকায় নেই, তখন গত মঙ্গলবার সকালে তিনি নিজেই এনভিডিয়াপ্রধানকে ফোন করে আমন্ত্রণ জানান।
পরে এক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনের সমালোচনাও করেন ট্রাম্প। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি লেখেন, বাস্তবে জেনসেন এখন এয়ার ফোর্স ওয়ানে আছেন এবং আমি তাঁকে নামতে না বললে তিনি নামবেন না, যদিও সেই সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। ফলে সিএনবিসি যে প্রতিবেদন করেছে, অর্থাৎ হুয়াং সফরে যাচ্ছেন না—রাজনীতির ভাষায় বলতে গেলে এটা ভুয়া সংবাদ।
প্রায় এক দশক পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটাই প্রথম চীন সফর। শুল্কযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে চীন। যদিও তাদের মধ্যে একধরনের শুল্ক–সমঝোতা হয়েছে, তার ভিত্তিতে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে। এই সমঝোতার ভবিষ্যৎ কী হবে, তা–ও এই সফরে নির্ধারিত হতে পারে।
পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের বাণিজ্যযুদ্ধে দুই দেশই একসময় ১০০ শতাংশের বেশি শুল্ক আরোপ করেছিল। ২০২৫ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প ও সির শেষ বৈঠকে শুল্ক স্থগিত করা হয়।
ব্যবসায়ীরা কেন
অস্ট্রেলিয়ার এবিসি সংবাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ব্যবসায়ীরা সম্ভবত বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা ও ব্যবসায়িক চুক্তি সইয়ের চেষ্টা করবেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্টদের কূটনৈতিক সফরে ব্যবসায়িক নেতাদের সঙ্গে নেওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। চীন-যুক্তরাষ্ট্র শীর্ষ বৈঠকগুলোতে প্রায়ই বড় ধরনের ব্যবসায়িক চুক্তি বা ক্রয়চুক্তির ঘোষণা আসে।
২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে বেইজিং সফরের সময়ও করপোরেট নেতাদের একটি প্রতিনিধিদল সফরসঙ্গী ছিল। সে সময় দুই দেশের কোম্পানিগুলোর মধ্যে ২৫০ বিলিয়ন বা ২৫ হাজার কোটি ডলারের বেশি বাণিজ্য ও বিনিয়োগচুক্তি সই হয়েছিল।
এবিসির সংবাদে বলা হয়েছে, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলোকে চীনের বাজারে আরও বেশি প্রবেশাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানাবেন। তিনি চীনকে আরও ‘উন্মুক্ত’ হওয়ার আহ্বান জানাবেন। লক্ষ্য, এই মেধাবী মানুষেরা যেন তাঁদের দক্ষতার জাদু দেখাতে পারেন।
বেইজিংয়ে যাওয়ার পথে ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, ‘আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যখন আমরা একসঙ্গে বসব, এটিই হবে আমার প্রথম অনুরোধ।’ তিনি আরও লেখেন, দুই দেশের জন্য এর চেয়ে বেশি উপকারী কোনো ধারণা তিনি আর শোনেননি বা দেখেননি।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীন আগামী কয়েক বছরের জন্য অংশীদারত্ব এগিয়ে নিতে আনুষ্ঠানিক সংলাপকাঠামো গড়ে তুলেছে, বিষয়টি প্রত্যাশিতই ছিল। সি চিন পিং বলেছেন, ‘চীন-যুক্তরাষ্ট্র গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ প্রতিষ্ঠা করবে; এটি হবে সম্পর্কের নতুন ভিত্তি।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বিবরণ অনুযায়ী সি বলেন, এর মধ্য দিয়ে আগামী তিন বছর ও তার পরবর্তী সময়ের জন্য কৌশলগত দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে। তিনি বিশ্বাস করেন, দুই দেশের জনগণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও এ সিদ্ধান্ত স্বাগত জানাবে।