গুগল
গুগল

ইউরোপে গুগলের ১০০ কোটি ডলার জরিমানা, অভিযোগ কী

বিশ্বের সবচেয়ে বড় সার্চ ইঞ্জিন গুগলকে ১০০ কোটি ডলার জরিমানা করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো। সার্চ ইঞ্জিনে নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে প্রতিযোগিতা বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগে আজ বৃহস্পতিবার এ জরিমানা করা হয়।

আশঙ্কা করা হচ্ছে, ইইউয়ের এই সিদ্ধান্তে আটলান্টিকের দুই পাড়ের, অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগেও অভিযোগ করেছিলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন অন্যায্যভাবে মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে জরিমানা করছে। গুগলের বিরুদ্ধে এ সিদ্ধান্ত এমন সময়ে নেওয়া হলো, যখন ট্রাম্প ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ প্রধান কয়েকটি বাণিজ্য অংশীদারের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করছেন।

ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে গুগল তাদের প্রভাব খাটিয়ে কেনাকাটা, ভ্রমণ, গেমস ও অনুবাদের মতো সেবায় অন্যায্যভাবে নিজেদের অগ্রাধিকার দিয়েছে। বিপরীতে প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানিগুলোর সেবা নিচের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এটা প্রতিযোগিতার পরিপন্থী।

তদন্ত শেষে কমিশন আরও বলেছে, গুগল প্লে অ্যাপ স্টোরে এমন কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল, যার ফলে অ্যাপ নির্মাতারা ব্যবহারকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে বা এমনকি লেনদেন করতে পারেননি। গুগলের কমিশন যেন কমে না যায়, সে জন্য এই ব্যবস্থা করে রাখা হয়েছিল।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের নির্বাহী সংস্থা ইউরোপীয় কমিশনের ভাষ্য, ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্ট (ডিএমএ) লঙ্ঘন করেছে গুগল। ২০২২ সালে প্রণীত এ আইনের লক্ষ্য হলো বড় প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলো যেন নিজেদের একাধিক সেবা ব্যবহার করে ব্যবহারকারীদের আটকে রাখতে বা প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাজার থেকে সরিয়ে দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করা।

ইইউয়ের মতে, সার্চ, স্মার্টফোন, ই-কমার্স ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো খাতে বড় কোম্পানিগুলো এতটাই প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে যে তারা কার্যত বাজারের ‘রক্ষক’ হিসেবে কাজ করছে। এর মধ্য দিয়ে তারা অন্য ব্যবসার ভাগ্য নির্ধারণ করছে।

ইউরোপীয় কমিশনের প্রতিযোগিতা নীতিবিষয়ক নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট তেরেসা রিবেরা বিবৃতিতে বলেন, বাজারের সেরা পণ্য নিজগুণে সফল হবে, সার্চ ইঞ্জিন পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের মালিকানায় থাকার কারণে নয়। ডিএমএর লক্ষ্যই হলো ডিজিটাল বাজারে ন্যায্যতা, ভোক্তার পছন্দের সুযোগ ও উদ্ভাবন নিশ্চিত করা।

কমিশনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে গুগলকে ৬০ দিনের সময় দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বী অনলাইন সেবাগুলোকে সার্চের ফলাফলে আরও দৃশ্যমান করতে হবে। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক আয়ের সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত জরিমানা আরোপ করা হতে পারে।

গত এক দশকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিয়ন্ত্রকদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল গুগল। ২০১৭ সালের পর থেকে বিভিন্ন মামলায় কোম্পানিটির ১০০ কোটি ইউরোর বেশি জরিমানা করা হয়েছে।

গুগলের প্রধান আইন কর্মকর্তা কেন্ট ওয়াকার বলেছেন, এ সিদ্ধান্তের ফলে পণ্যের নকশায় পরিবর্তন আনতে হবে। এতে ইউরোপের ক্ষেত্রে সেবার মান কমে যাবে। তিনি বলেন, এটি ন্যায্য প্রতিযোগিতা নয়, বরং পণ্যের মান নষ্ট করা। নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত পণ্যের মান উন্নত করা, খারাপ করা নয়।

গুগলের আর্থিক সক্ষমতার তুলনায় এ জরিমানার অঙ্ক সামান্য। গতকাল বুধবার গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেট জানিয়েছে, স্পেসএক্স ও অ্যানথ্রোপিকে বিনিয়োগের সুফল হিসেবে তাদের ত্রৈমাসিক মুনাফা বেড়ে ১১২ দশমিক ১ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ২১০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে।

ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায়

ট্রাম্প প্রশাসন এ সিদ্ধান্তের কী প্রতিক্রিয়া জানায়, এখন ব্রাসেলসের কর্মকর্তারা সেদিকে নজর রাখছেন। আগামীকাল শুক্রবার হোয়াইট হাউস ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কয়েকটি দেশের পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক ঘোষণা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইইউয়ের এক কর্মকর্তা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য পরিস্থিতির বিবেচনায় নয়, বরং তদন্ত শেষ হওয়ায় আজই জরিমানার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে এ সিদ্ধান্ত অপ্রত্যাশিত হওয়ার কথা নয়।

হোয়াইট হাউসে ফিরে আসার পর থেকেই ট্রাম্প সতর্ক করে আসছেন, মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর বিদেশি নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের জবাবে তিনি প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা নেবেন।

গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের ওপর ডিজিটাল সেবা কর আরোপকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপেরও হুমকি দেন ট্রাম্প। এর আগে গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) জানায়, সুইডেনের স্পটিফাই, জার্মানির সিমেন্স ও ফ্রান্সের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান মিস্ত্রালের মতো ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোর ওপর মাশুল বা নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হতে পারে।

শুধু ইউরোপ নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোও গুগলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। গত বছর একচেটিয়া ব্যবসাসংক্রান্ত ঐতিহাসিক মামলায় গুগলকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সার্চের ফলাফল ও কিছু তথ্য ভাগাভাগি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই মামলার সঙ্গে ব্রাসেলসের সর্বশেষ সিদ্ধান্তের কিছু মিল রয়েছে।

তথ্য সুরক্ষা, প্রতিযোগিতা ও ক্ষতিকর অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিধিনিষেধের দিক থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘদিন ধরেই বিশ্বে সবচেয়ে কঠোর হিসেবে পরিচিত। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অন্যান্য প্রযুক্তি খাতে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে কিছু বিধিনিষেধ শিথিলের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে তদন্ত ও জরিমানা করে যাচ্ছে তারা।

অন্যদের যা করছে ইউরোপ

চলতি মাসে ইউরোপীয় নিয়ন্ত্রকেরা গুগলকে অ্যান্ড্রয়েড স্মার্টফোনে প্রতিদ্বন্দ্বী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠানের সেবা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে যে বিদ্যমান বিধিনিষেধ আছে, সেগুলো তুলে নিতে নির্দেশ দিয়েছেন।

একই সময়ে মেটাকেও ইনস্টাগ্রাম ও ফেসবুকের নকশায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে বলা হয়েছে। উদ্দেশ্য হলো ব্যবহারকারীদের কাছে এসব প্ল্যাটফর্ম যেন বেশি আসক্তিকর না হয়, তা নিশ্চিত করা।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন চীনা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিচ্ছে। গত সপ্তাহে অবৈধ, অনিরাপদ ও নকল পণ্য বিক্রির অভিযোগে আলিবাবার আলিএক্সপ্রেসকে ৬২ কোটি ৯০ লাখ ডলার জরিমানা করা হয়। ফেব্রুয়ারিতে ব্যবহারকারীদের আসক্তি কমাতে বাইটড্যান্সের মালিকানাধীন টিকটককেও পরিবর্তন আনার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ ছাড়া অপ্রাপ্তবয়স্কদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার সীমিত করতে নতুন আইন প্রণয়নের বিষয়েও বিবেচনা করছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।