ভেনেজুয়েলায় চীনের কয়েকটি কোম্পানি ও এক রুশ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকা কিছু তেলক্ষেত্রের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে মার্কিন তেল কোম্পানি নর্থ আমেরিকান ব্লু এনার্জি পার্টনার্স (এনএবিএপি)। সোমবার দুই মার্কিন কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।
সেই দুই কর্মকর্তা জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যে বড় ধরনের তেল উৎপাদন চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন, তার আওতায় এসব তেলক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ পাবে এনএবিএপি।
মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ভেনেজুয়েলা সরকার সম্প্রতি এনএবিএপিকে ১৪টি নতুন প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে। কোম্পানিটির মালিকানা আগে মার্কিন তেল ব্যবসায়ী হ্যারি সার্জেন্টের হাতে ছিল। এখন এর নিয়ন্ত্রণে আছেন ভেনেজুয়েলার ব্যবসায়ী আলেহান্দ্রো বেতানকুর্ট।
এক বিবৃতিতে চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করে বেতানকুর্ট বলেন, ‘প্রাকৃতিক সম্পদ, পরিশ্রমী মানুষ, বিপুল সম্ভাবনাময়—এসব কারণে ভেনেজুয়েলা সমৃদ্ধ। এই লেনদেন সেই সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে। বিষয়টি ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্র—দুই দেশের মানুষের জন্যই বড় সুফল বয়ে আনবে।’
এনএবিএপি জানিয়েছে, ব্যবসা পরিচালনার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে তাদের হাতে। তবে কোম্পানির ৩৫ শতাংশ মালিকানার ওপর অধিকার থাকবে মার্কিন সরকারের। একই সঙ্গে কোম্পানির মোট উৎপাদনের ২০ শতাংশ তেল উৎপাদন খরচে কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অগ্রাধিকার পাবে।
হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, বাকি ৮০ শতাংশ তেল কেনার ক্ষেত্রেও মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরকে প্রথম অধিকার দেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে ট্রাম্প ঘোষণা দেন, বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারত্বের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার প্রমাণিত প্রায় ৬৪ বিলিয়ন ব্যারেল তেলসম্পদ ব্যবহারের সুযোগ পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
এ চুক্তির ফলে ভেনেজুয়েলার গুরুত্বপূর্ণ কিছু তেলসম্পদে মার্কিন কোম্পানিগুলোর সরাসরি প্রবেশাধিকার তৈরি হচ্ছে। বিপরীতে দেশটির জ্বালানি খাতে দীর্ঘদিনের চীনা ও রুশ প্রভাব কমে আসবে। ভেনেজুয়েলার তেল কে উৎপাদন করবে এবং কোথায় বিক্রি হবে, সে বিষয়েও ওয়াশিংটনের প্রভাব বাড়বে।
ট্রাম্প প্রশাসন ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প নতুন করে সাজিয়ে দেশটির এই বিপুল সম্পদ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করতে চাইছে।
হোয়াইট হাউস আরও জানিয়েছে, এনএবিএপির পরিচালনা পর্ষদ ও পরিচালকদের সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা থাকবে। পর্ষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যকেও মার্কিন নাগরিক হতে হবে।
এনএবিএপি ভেনেজুয়েলায় মোট ১৭টি প্রকল্পের নিয়ন্ত্রণ পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এসব ক্ষেত্র থেকে উৎপাদিত তেল যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর পরিকল্পনা আছে তাদের। এর মধ্যে ১৪টি প্রকল্প ভেনেজুয়েলা সরকার নতুন করে এনএবিএপিকে দেবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
এই ১৪টি প্রকল্পের ৫টি এত দিন চীনা কোম্পানিগুলো পরিচালনা করত। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর আমলে যে ব্যবস্থা চালু হয়, তার অধীনে এসব তেলক্ষেত্র পরিচালিত হচ্ছিল। একটি প্রকল্পের দায়িত্বে ছিল রুশ কোম্পানি।
মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, দুটি প্রকল্প পরিচালনা করত চায়না কনকর্ড রিসোর্সেস। ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কের অভিযোগে ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র কোম্পানিটির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। আরেকটি প্রকল্প পরিচালনা করত চীনের তেল কোম্পানি সিনোপেক ও চায়না ন্যাশনাল পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (সিএনপিসি)।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘এতে শুধু মার্কিন সরকার ও মার্কিন কোম্পানিগুলোর জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে না, এই তেলের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বাজারও খুলে যাচ্ছে। আগে যে তেল চীনে পাঠানো হতো, এখন তা যুক্তরাষ্ট্রে যাবে।’
মার্কিন কর্মকর্তারা আরও জানান, দুটি প্রকল্প পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ছিল আলেক্স সাবের সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো। সাব ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হেফাজতে আছেন।
আরেকটি তেলক্ষেত্রের সঙ্গে মাদুরোর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসের এক ভাতিজার সংশ্লিষ্টতা ছিল বলেও জানান কর্মকর্তারা।
সোমবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ভেনেজুয়েলা থেকে ‘লাখ লাখ ব্যারেল তেল’ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে আনা হচ্ছে। এসব তেল টেক্সাস, লুইজিয়ানাসহ বিভিন্ন এলাকার শোধনাগারে পাঠানো হচ্ছে। মঙ্গলবার তেল ও গ্যাসের খুচরা বিক্রেতা ও শোধনাগারের মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করার কথা আছে তাঁর।
এদিকে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষ ও ২০১৫ সালের জাতীয় পরিষদের প্রতিনিধিদের মধ্যে আলোচনা চলছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, এ আলোচনার লক্ষ্য দেশটিতে সাংবিধানিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। পাশাপাশি ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে তৈরি আইনি প্রশ্নগুলোরও সমাধান করা।
ট্রাম্প প্রশাসনের মতে, ২০১৫ সালের জাতীয় পরিষদই ভেনেজুয়েলার সংবিধানের অধীনে নির্বাচিত ও কার্যকর সর্বশেষ আইনসভা। যদিও বর্তমানে এ পরিষদের আনুষ্ঠানিক শাসনক্ষমতা নেই।
এক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ২০১৫ সালের জাতীয় পরিষদের সঙ্গে সমঝোতা হলে ভেনেজুয়েলায় ক্ষমতা হস্তান্তরের বৃহত্তর প্রক্রিয়ার জন্য সাংবিধানিক ও আইনি ভিত্তি তৈরি হতে পারে। ফলে দেশটির তেলশিল্প পুনরুজ্জীবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথও খুলে যাবে।