বিশ্বের শীর্ষ ধনীদের মধ্যে ইলন মাস্কের সম্পদ যে হারে বাড়ছে, তাতে শিগগিরই ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে মাস্কের সম্পদমূল্য এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি ডলার হয়ে যাবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকেরা। সেই পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন তিনি।
ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ৮০০ বিলিয়ন ডলার সম্পদের মালিক হওয়ার একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছেন ইলন মাস্ক। এখন তাঁর সম্পদমূল্য প্রায় ৭৮০ বিলিয়ন বা ৭৮ হাজার কোটি ডলার। খবর ফোর্বসের
ফোর্বস ম্যাগাজিন নিশ্চিত করেছে, চলতি মাসের শুরুতে মাস্কের প্রতিষ্ঠান এক্সএআই হোল্ডিংস বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ২০ বিলিয়ন বা ২ হাজার কোটি ডলার তহবিল সংগ্রহ করেছে। কোম্পানির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫০ বিলিয়ন বা ২৫ হাজার কোটি ডলার।
গত মার্চে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা স্টার্টআপ এক্সএআইকে নিজের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানি এক্সের (সাবেক টুইটার) সঙ্গে একীভূত করার সময় মাস্ক বলেছিলেন, এই কোম্পানির মূল্য হবে ১১৩ বিলিয়ন বা ১১ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই কোম্পানির মূল্য তার চেয়ে অনেক বেশি।
ফোর্বসের হিসাবে, এই চুক্তির ফলে এক্সএআই হোল্ডিংসে মাস্কের ৪৯ শতাংশ শেয়ারের মূল্য ৬২ বিলিয়ন ডলার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২২ বিলিয়ন বা ১২ হাজার ২০০ কোটি ডলার।
এই পরিস্থিতিতে এক্সএআইয়ে বিনিয়োগ করা অন্য বিনিয়োগকারীরাও বড় ধরনের লাভের মুখ দেখেছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন টুইটারের অন্যতম প্রাথমিক বিনিয়োগকারী সৌদি আরবের প্রিন্স আলওয়ালিদ বিন তালাল আল সৌদ, টুইটারের সহপ্রতিষ্ঠাতা জ্যাক ডরসি ও ওরাকলের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসন। এলিসন ২০২২ সালে মাস্কের টুইটার অধিগ্রহণের (মোট মূল্য ছিল ৪৪ বিলিয়ন ডলার) সময় ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন।
ফোর্বসের হিসাব অনুযায়ী, প্রিন্স আলওয়ালিদের কাছে এক্সএআই হোল্ডিংসে আনুমানিক ১ দশমিক ৬ শতাংশ শেয়ার রয়েছে, যার মূল্য প্রায় চার বিলিয়ন ডলার (এ হিসাবের বাইরে তাঁর তালিকাভুক্ত কোম্পানি কিংডম হোল্ডিং কোম্পানির মাধ্যমে রাখা বড় অংশটি ধরা হয়নি।) এর ফলে তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
অন্যদিকে জ্যাক ডরসি ও ল্যারি এলিসনের প্রত্যেকের কাছেই এখন এক্সএআই হোল্ডিংসে আনুমানিক শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ শেয়ার রয়েছে, যার মূল্য প্রায় ২১০ কোটি ডলার। এতে ডরসির মোট সম্পদ বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার। এলিসনের সম্পদ বেড়ে হয়েছে প্রায় ২৪১ বিলিয়ন বা ২৪ হাজার ১০০ কোটি ডলার।
গত এক বছরে ইলন মাস্ক একের পর এক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ইতিহাসের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে মাস্ক ৫০০ বিলিয়ন বা ৫০ হাজার কোটি ডলার সম্পদের মালিক হন। টেসলার শেয়ারদর প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার কল্যাণে মাস্কের সম্পদের এই ঊর্ধ্বগতি। রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ায় ২০২৫ সালের প্রথম দিকে মাস্কের কিছুটা খারাপ সময় গেছে ঠিক; কিন্তু একসময় তিনি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সির (ডজ) প্রধানের পদ ছেড়ে বৈদ্যুতিক গাড়ি কোম্পানি টেসলায় আরও বেশি সময় দিতে শুরু করেন। ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর এ সিদ্ধান্ত।
এরপর গত ১৫ ডিসেম্বর মাস্ক ৬০০ বিলিয়ন বা ৬০ হাজার কোটি ডলার সম্পদের মালিক হয়ে নতুন ইতিহাস গড়েন। সে সময় তাঁর রকেট কোম্পানি স্পেসএক্সের মূল্যায়ন করা হয় ৮০০ বিলিয়ন ডলার—আগস্ট মাসে যা ছিল ৪০০ বিলিয়ন বা ৪০ হাজার কোটি ডলার।
এর মাত্র চার দিন পরেই মাস্ক আরেক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে যান। ডেলাওয়্যার সুপ্রিম কোর্ট নিম্ন আদালতের রায় বাতিল করে দিলে ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে তিনি ৭০০ বিলিয়ন বা ৭০ হাজার কোটি ডলার সম্পদের মালিক হন।
সেই সঙ্গে বিভিন্ন শর্ত সাপেক্ষে ইলন মাস্কের যে রেকর্ড বেতন–ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এক লাখ কোটি ডলারের মাইলফলক অর্জন করা এখন মাস্কের জন্য কেবল সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
বিশ্বের শীর্ষ ধনী হিসেবে মাস্কের সম্পদের সঙ্গে পরের ধনীদের সম্পদের ব্যবধান বাড়ছেই। এই প্রতিবেদন লেখার সময় আজ রোববার সকালে মাস্কের সম্পদের পরিমাণ ছিল ৭৭৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। অথচ দ্বিতীয় স্থানে যিনি আছেন, সেই ল্যারি পেইজের সম্পদমূল্য মাত্র ২৭০ বিলিয়ন বা ২৭ হাজার কোটি ডলার।
ফোর্বসের তালিকায় তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে আছেন যথাক্রমে জেফ বেজোস, সের্জেই ব্রিন ও ল্যারি এলিসনের—তাঁদের সম্পদ মূল্য যথাক্রমে ২৪৯ দশমিক ৮, ২৪৯ দশমিক ১ ও ২৪০ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার বা ২৪ হাজার ৯৮০ কোটি, ২৪ হাজার ৯১০ কোটি ও ২৪ হাজার ৬০ কোটি ডলার।
বৈদ্যুতিক গাড়ির জগতে প্রধান নাম মাস্কের টেসলা। এই কোম্পানি তাঁর সম্পদের মূল ভিত্তি। সেই সঙ্গে তাঁর রকেট কোম্পানি আছে—কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতেও তাঁর বিচরণ শুরু হলো। সামগ্রিকভাবে মাস্ক যেভাবে ব্যবসা–বাণিজ্যের সম্প্রসারণ করছেন, তা অন্যদের পক্ষে সেভাবে সম্ভব হচ্ছে না, বা অন্যরা সেভাবে করছেন না। বিষয়টি মাস্ককে এগিয়ে রাখছে।
বাস্তবতা হলো, একসময় জেফ বেজোসের সঙ্গে মাস্কের জোর লড়াই হতো। কিন্তু এখন তাঁদের মধ্যে যোজন যোজন ব্যবধান, যে ব্যবধান অতিক্রম করা বেজোসের পক্ষে হয়তো আর সম্ভব হবে না। নিজের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও সৃজনশীলতার কল্যাণে মাস্ক প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছেন।