
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা আর জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্তমান বিশ্ব অনেক বেশি সচেতন। প্লাস্টিক বর্জ্যের ক্রমবর্ধমান পাহাড় যখন পৃথিবীর অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তখন সেই সচেতনতার ঢেউ লেগেছে অর্থায়নের চিরাচরিত প্রথাগুলোতেও।
১৯৯০ সালে ‘গ্রিন ব্যাংকিং’ ধারণা নিয়ে প্রথম কাজ শুরু করে নেদারল্যান্ডস। এরপর উন্নত দেশের ব্যাংকগুলোও গ্রাহকদের জন্য এই সেবা দিতে শুরু করে। বাংলাদেশে গ্রিন ব্যাংকিং সেবার প্রচলন খুব বেশি দিনের না হলেও এর প্রভাব এখন বেশ স্পষ্ট। ২০১১ সালে বিশ্বের প্রথম কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক পূর্ণাঙ্গ গ্রিন ব্যাংকিং নীতিমালা তৈরি করে অনন্য নজির স্থাপন করেছিল। সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে দেশের প্রতিটি তফসিলি ব্যাংক এখন নিজস্ব নীতিমালার আলোকে তাদের কার্যক্রমকে পরিবেশবান্ধব করে তুলছে।
প্রযুক্তির বিবর্তনে ব্যাংক কার্ডের ব্যবহার আগের চেয়ে বহুগুণ বাড়লেও এর স্থায়িত্ব এবং বর্জ্য–ব্যবস্থাপনা নিয়ে এত দিন খুব একটা ভাবা হয়নি। সাধারণত একটি প্লাস্টিক কার্ড তৈরিতে যে পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ হয়, তা পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। তবে এই দৌড়ে বাংলাদেশে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে মেঘনা ব্যাংক পিএলসি। দেশে প্রথমবারের মতো পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা রিসাইকেলড প্লাস্টিকের তৈরি কার্ড সেবা চালু করে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংক খাতের প্রচলিত ধারণা বদলে দিয়েছে।
এই বিশেষ উদ্যোগের মূলে রয়েছে টেকসই ভবিষ্যৎ বা সাসটেইনেবিলিটি। গত বছর মেঘনা ব্যাংক বাজারে এনেছে দুই ধরনের বিশেষ ভিসা প্লাটিনাম কার্ড—‘গ্রিন প্লাটিনাম ক্রেডিট কার্ড’ এবং ‘উইমেন প্লাটিনাম ক্রেডিট কার্ড’। এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে পরিবেশ সুরক্ষার এক নিখুঁত গাণিতিক হিসাব। এনভায়রনমেন্টাল ক্যালকুলেটরের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ কার্ডের তুলনায় রিসাইকেলড কার্ড উৎপাদনে শক্তির অপচয় প্রায় ৪১ শতাংশ কম হয়।
আশার কথা হলো, রিসাইকেলড প্লাস্টিকের কার্ডগুলো এমন এক প্রযুক্তিতে তৈরি, যেখানে বর্জ্যের পরিমাণ প্রায় শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। কার্ড তৈরির প্রক্রিয়ায় যে পরিমাণ অতিরিক্ত প্লাস্টিক বা বর্জ্য তৈরি হয়, তা পরিবেশে ফেলে না দিয়ে বৈজ্ঞানিক উপায়ে পুনরায় কার্ড তৈরির কাজেই ব্যবহার করা হচ্ছে। শুধু তা–ই নয়, পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হ্যালোজেন উপাদানের ব্যবহার এসব কার্ডে ৫০ শতাংশের বেশি কমিয়ে আনা হয়েছে। ফলে আপনার মানিব্যাগে থাকা প্লাস্টিকের ছোট এই টুকরা এখন কেবল খরচের মাধ্যম নয়, বরং পরিবেশ রক্ষায় সচেতনতারও একটি ‘ডিজিটাল প্রতীক’ হয়ে উঠছে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রিন ব্যাংকিং কেবল কার্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন অনলাইন ব্যাংকিং, ভিডিও–ভিত্তিক গ্রাহক শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া (ভি–কেওয়াইসি) এবং ডিজিটাল স্টেটমেন্টের মাধ্যমে কাগজের ব্যবহার কমিয়ে আনার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। একটি গ্রিন কার্ড ব্যবহার করা মানে পরোক্ষভাবে গাছ কাটা রোধ করা এবং প্লাস্টিক দূষণ কমানোর মিছিলে শামিল হওয়া। ব্যাংকিং খাতের এই রূপান্তর বলে দিচ্ছে, আমাদের জীবনযাত্রার প্রতিটি কেনাকাটা ও লেনদেন এখন থেকে আরও বেশি দায়িত্বশীল ও পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠছে। আপনার মানিব্যাগে থাকা ব্যাংক কার্ডটি যদি রিসাইকেলড উপাদানে তৈরি হয়, তবে আপনিও পরোক্ষভাবে এই ধরিত্রী রক্ষায় অবদান রাখছেন।