সাদা কলারের চাকরিতে আভিজাত্য থাকলেও ভেতরের চিত্রটা এখন বেশ ধূসর। উচ্চশিক্ষা ও সম্মানজনক পেশা থাকার পরও জীবনযাত্রার ব্যয় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে মধ্যবিত্ত। আয় ও ব্যয়ের অসম লড়াইয়ে শিক্ষিত এই শ্রেণির সঞ্চয় এখন ঋণের বোঝায় পরিণত হয়েছে।
বিবিসির সাম্প্রতিক এক রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে মধ্যবিত্তের স্থিতিশীল আয় চাপের মুখে পড়েছে। যার প্রভাব পড়েছে, তাদের সামগ্রিক জীবনযাত্রায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দাপট ছাড়াও সরকারি নীতিগত ব্যর্থতাকে এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করা হয়েছে। ‘ব্রেকপয়েন্ট: দ্য ক্রাইসিস অব দ্য মিডল ইস্ট অ্যান্ড ফিউচার অব ওয়ার্ক’ নামের একটি গবেষণাধর্মী বইয়ে উঠে এসেছে এসব তথ্য।
গবেষণার তথ্যমতে, একদিকে ভারতের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয়ের পথ সংকুচিত হয়েছে, অন্যদিকে বৃদ্ধি পেয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়। ফলে বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা খরচের মতো দৈনন্দিন খরচ মেটাতেও ঋণ করছেন অনেকে।
একই বাস্তবতার মুখোমুখি বাংলাদেশও। শিক্ষিত ও চাকরিজীবী হওয়া সত্ত্বেও জীবনমান হুমকিতে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির, যারা মোট জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশ। ভারতের মতো আমাদের দেশেও ব্যয়ের সঙ্গে আয়ের সমন্বয় করতে পারছেন না এই শ্রেণির বড় অংশ।
অস্থিতিশীল আয়, দুর্বল কর্মসংস্থান
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশে স্নাতক ডিগ্রিধারী বেকারের সংখ্যা ৮ লাখ ৮৫ হাজার, যা মোট বেকারের প্রায় ৪০ শতাংশ। তাঁরা একেবারে চাকরি পাচ্ছেন না কিংবা পছন্দমতো চাকরি পাচ্ছেন না। ফলে তুলনামূলক কম বেতনের চাকরিতে প্রবেশ করেন তাঁরা। অনেকে জড়িত হন খণ্ডকালীন বা চুক্তিভিত্তিক চাকরিতে, যেখানে আয় অনিয়মিত।
এ ছাড়া অটোমেশন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবও অনুভূত হচ্ছে, বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি ও সেবা খাতে। এসব খাতে নতুন স্নাতকদের জন্য চাকরির সুযোগ কমছে। যেসব চাকরি আছে, সেগুলোর বেতনও স্থির বা কম। কিন্তু দ্রব্যমূল্যসহ অন্যান্য খাতে খরচ বাড়তে থাকায় হিমশিম খেতে হচ্ছে মধ্যবিত্তকে।
সীমিত আয়, বাড়তে থাকা ব্যয়
ঢাকার মিরপুরে বসবাসরত তুষার ও সালমা দম্পতির গল্পটি অনেকেরই চেনা। দুজনেই বেসরকারি চাকরিজীবী। পাঁচ বছর আগেও মাস শেষে তাঁদের কিছু সঞ্চয় থাকত। কিন্তু বাড়িভাড়া, গ্যাস-বিদ্যুতের দাম এবং নিত্যপণ্যের আকাশছোঁয়া মূল্যের সঙ্গে তাঁদের বেতন বাড়েনি একচুলও। তুষার বলেন, ‘আগে সঞ্চয় করতাম ভবিষ্যতের জন্য, এখন মাস শেষে ঋণ করতে হয় টিকে থাকার জন্য।’
এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে শিক্ষিত চাকরিজীবীরা এখন অফিসের পর রাইড শেয়ারিং বা ফ্রিল্যান্সিং করতে বাধ্য হচ্ছেন। আইটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রাকিব আহমেদের মাসিক বেতন ৩৫ হাজার টাকা হলেও সপ্তাহে ৪ রাত তিনি অ্যাপে বাইক চালান। রাকিবের আক্ষেপ, ‘বাবা অবসরে গেছেন, পরিবারের খরচ জোগাতে হিমশিম খাচ্ছি। এই অনিশ্চয়তায় বিয়ে করতেও ভয় হচ্ছে।’
ডিগ্রি থাকলেই মিলছে না চাকরি
দেশে বেকারদের মধ্যে ২৮ শতাংশই উচ্চশিক্ষিত। আবার প্রতিবছর চাকরির বাজারে প্রায় সাত লাখ গ্র্যাজুয়েট প্রবেশ করছেন। তাঁদের অধিকাংশই অনানুষ্ঠানিক পেশায় জড়িত হচ্ছেন। এসব পেশার আয়ে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়ায় অনেকেই অর্ধবেকার হিসেবে থাকতে বাধ্য হন।
আবার স্নাতকেরা তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী পেশাও খুঁজে পেতে লড়াই করেন। ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০২৩ সালে ইংরেজিতে স্নাতক সম্পন্ন করা একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘প্রায় এক বছর একটি প্রতিষ্ঠানের কল সেন্টারে কাজ করেছি। এরপর কাজ করেছি একটি ব্যাংকের রিসিপসনিস্ট হিসেবে। কিন্তু এই আয় দিয়ে নিজের চলাই কষ্ট, পরিবার চালানো তো অসম্ভব। ফলে এখন চাকরি ছেড়ে দিয়ে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি নিচ্ছি।’
ভারতের চিত্রও একই। দেশটির টেকনোলজি ইনস্টিটিউটগুলোর মধ্যে মোট ২১ হাজার ৫০০ স্নাতকের মধ্যে প্রায় ৮ হাজার এখনো বেকার। একসময় ভারতের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সনদ হিসেবে বিবেচিত আইআইটি ডিগ্রিও এখন আর নিশ্চিত সাফল্যের প্রতীক নয়। যেখানে কেউ সফল হচ্ছে, আবার অনেকেই পিছিয়ে পড়ছে।
নীতিগত পরিবর্তন প্রয়োজন
মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থীদের একটি অংশ ঋণ নিয়ে বিদেশে পড়াশোনা করতে যান। তাঁদের লক্ষ্য থাকে বিদেশেই স্থায়ী হওয়া। সরকারি নীতিগত ব্যর্থতার কারণে এসব শিক্ষার্থী ঋণ নিয়ে হলেও দেশ ছাড়তে চান। শিক্ষিত তরুণদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমাদের ব্যর্থতার নির্দেশক এটি।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক শরমিন্দ নীলোর্মি বলেন, ‘দেশ ও বিদেশের জন্য উপযোগী দক্ষ জনবল আমরা তৈরি করতে পারছি না। ফলে উচ্চশিক্ষা থাকা সত্ত্বেও চাকরির বাজারে প্রবেশ করে তারা নিরাপদ হচ্ছে না। এ ছাড়া বেশ কয়েক বছর ধরে বিনিয়োগে স্থবিরতা চলছে। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে অনেক কম। দক্ষ জনবল তৈরিতে আমাদের মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন।’
বিবিসি অবলম্বনে ফাইজার মো. শাওলীন