এক দশকে অ-কৃষি খাতে কর্মে মানুষ বেড়েছে ২৫ শতাংশ, বদলাচ্ছে কি কর্মসংস্থানের কাঠামো

বাংলাদেশে এক দশকে অ-কৃষি অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোতে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ২৫ শতাংশ বেড়েছে। তবে এই প্রবৃদ্ধি সব খাতে সমান নয়। কিছু খাতে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে, আবার দেশের অন্যতম বড় খাত পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যে এই সংখ্যা কমেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪ (ভলিউম-২)’ প্রতিবেদনের হিসাবে, ২০১৩ সালে অ-কৃষি অর্থনৈতিক ইউনিটগুলোতে মোট কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৪৫ লাখ ৮৫০। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬ লাখ ৩২ হাজার ৬৬১। অর্থাৎ এক দশকে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৫ দশমিক শূন্য ৩ শতাংশ।

তবে খাতভেদে চিত্র বেশ ভিন্ন। ২০২৪ সালে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যায় সবচেয়ে বড় খাত উৎপাদন। বিপরীতে ২০১৩ সালে সবচেয়ে বড় খাতগুলোর একটি পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যে ২০২৪ সালে এসে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।

অ-কৃষি খাত কী—

বিবিএসের অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এর সংজ্ঞা অনুযায়ী, অ-কৃষি খাত বলতে কৃষির বাইরে পরিচালিত বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বোঝানো হয়েছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাসিফিকেশন (বিএসআইসি)-২০২০ অনুযায়ী, কৃষি ছাড়া অন্যান্য অর্থনৈতিক কার্যক্রমের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক ইউনিটগুলো এই শুমারির অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে উৎপাদন, বাণিজ্য, পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নির্মাণ, আর্থিক সেবা, তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন খাত রয়েছে।

কর্মে নিয়োজিত মানুষের সবচেয়ে বড় খাত উৎপাদন—

২০২৪ সালে অ-কৃষি অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি মানুষ কর্মে নিয়োজিত ছিলেন উৎপাদন খাতে। এ খাতে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ৯০ লাখ ২৮ হাজার ৬৫৬। ২০১৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৭১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৪৬। এক দশকে উৎপাদন খাতে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ১৮ লাখ ৪৫ হাজারের বেশি, অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৫ দশমিক ৭ শতাংশ।

এরপরের বড় খাত পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য। ২০১৩ সালে এ খাতে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ছিল ৮৩ লাখ ৯৮ হাজার ৮১০। ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮১ লাখ ৭৯ হাজার ৮০৭। অর্থাৎ এক দশকে এ খাতে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ১৯ হাজার কমেছে।

দ্রুত বেড়েছে প্রশাসনিক ও নির্মাণ খাতে—

শতকরা প্রবৃদ্ধির হিসাবে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন হয়েছে প্রশাসনিক ও সহায়ক সেবা খাতে। ২০১৩ সালে এ খাতে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৫১ হাজার ৬৫৩। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫১৬। অর্থাৎ এক দশকে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৫৫ দশমিক ১ শতাংশ।

নির্মাণ খাতে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ২০১৩ সালের ৪৬ হাজার ৫৫২ থেকে ২০২৪ সালে বেড়ে হয়েছে ১ লাখ ৬২ হাজার ৬২। এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৪৮ দশমিক ১ শতাংশ। শিল্প, বিনোদন ও অবকাশ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ।

এ ছাড়া বিদ্যুৎ, গ্যাস ও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ খাতে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা বেড়েছে ১৪৮ দশমিক ৭ শতাংশ। পেশাগত, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি সেবা খাতে বেড়েছে ১০১ দশমিক ৮ শতাংশ।

শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও আইসিটিতেও উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি—

শিক্ষা খাতে ২০১৩ সালে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ছিল ১৪ লাখ ৮৩ হাজার ৪৪১। ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২৪ লাখ ৫৪ হাজার ৯৩০। এক দশকে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ।

মানব স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাতে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ৪ লাখ ১৮ হাজার ৫৪৮ থেকে বেড়ে হয়েছে ৭ লাখ ১১ হাজার ২৮৯, প্রবৃদ্ধি ৬৯ দশমিক ৯ শতাংশ।

তথ্য ও যোগাযোগ খাতে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ১ লাখ ৬ হাজার ৩ থেকে বেড়ে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৯১৬ হয়েছে। এ খাতে প্রবৃদ্ধি ৬৩ দশমিক ৯ শতাংশ।

কয়েকটি খাতে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা কমেছে—

সব খাতে অবশ্য কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা বাড়েনি। পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য খাতে এক দশকে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ২ দশমিক ৬ শতাংশ কমেছে।

খনি ও খনিজ উত্তোলন খাতে এই পতন আরও বড়। ২০১৩ সালে এ খাতে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ছিল ৬৪ হাজার ৪৪৪। ২০২৪ সালে তা কমে হয়েছে ১৭ হাজার ৪২৬। অর্থাৎ এক দশকে ৭৩ শতাংশ কমেছে।

অন্যদিকে অন্যান্য সেবা খাতে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ২১ লাখ ৯৩ হাজার ১৮৪ থেকে বেড়ে ২৬ লাখ ৩ হাজার ৮০১ হয়েছে। আবাসন খাতে ৪৩ হাজার ২৯৬ থেকে বেড়ে ৫২ হাজার ৩৯৯ হয়েছে।

অ-কৃষি অর্থনীতিতে বদলাচ্ছে কর্মসংস্থানের কাঠামো—

বিবিএসের তথ্য বলছে, মোট কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও খাতভেদে পরিবর্তনের ধরন এক নয়। উৎপাদন ও পরিবহন খাতে বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্ত হয়েছে। একই সময়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইসিটি, পেশাগত ও প্রশাসনিক সেবার মতো খাতে প্রবৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি। অন্যদিকে পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্য এবং খনি ও খনিজ উত্তোলনের মতো কয়েকটি খাতে কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা কমেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর অধ্যাপক মো. রিদওয়ানুল হক বলেন, এক দশকে ২৫ শতাংশ জনবল প্রবৃদ্ধি হতে পারে। তবে বিবিএস কী উপায়ে সার্ভে বা গবেষণা করে, সেটা দেখতে হবে। এ ছাড়া প্রশাসনিক খাতে কত লোক প্রয়োজন এবং সেই তুলনায় নিয়োগ কম নাকি বেশি হলো, তা দেখা প্রয়োজন। দেশে খনি ও খনিজ উত্তোলন কমেছে, ফলে এই খাতে মানুষও কমেছে। আবার দক্ষ জনবল না থাকায় এই শিল্পে জড়িত ব্যক্তিদের দেশের বাইরেও পাঠানো যাচ্ছে না।

পেশাগত ও বৈজ্ঞানিক খাতে কর্মে নিয়োজিত মানুষ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে এই অধ্যাপক বলেন, কোন ধরনের বৈজ্ঞানিক বৃদ্ধি পাচ্ছে, সেটা বিবেচনা করতে হবে। সোসাইটিতে তাদের অবদান কী? এই বিষয়গুলো আমাদের গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।