দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এখনো চ্যালেঞ্জিং একটি বিষয়। চাকরি, উদ্যোক্তা হওয়া কিংবা নেতৃত্বের জায়গায় পৌঁছাতে নারীদের নানামুখী সামাজিক, কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক বাধার মুখোমুখি হতে হয়। তবু এ অঞ্চলের অনেক নারী সেই বাধা ভেঙে নতুন পথ তৈরি করছেন—নিজেদের জন্য, সমাজের জন্য এবং পরবর্তী প্রজন্মের জন্য।
বিশ্বব্যাংকের ক্লিয়ারহারপাথ (ClearHerPath)–এর তিন পর্বের বিশেষ সিরিজের দ্বিতীয় অংশে তুলে ধরা হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার এমনই কয়েকজন নারী পেশাজীবীর গল্প। তাঁরা কেউ নেত্রী, কেউ উদ্যোক্তা বা পরিবর্তন-নির্মাতা, যাঁরা প্রমাণ করছেন—একজন নারী যখন অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান হন, তখন সম্ভাবনার সীমা পেরিয়ে তিনি এগিয়ে যান।
১. নিধি পন্ত, ভারত
এস৪এস টেকনোলজিস-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা, সৌরশক্তিচালিত খাদ্য প্রক্রিয়াজাত প্রযুক্তির মাধ্যমে হাজারো নারী কৃষকের জন্য টেকসই জীবিকা নিশ্চিত করছেন নিধি পান্ত। তিনি বলেন, ‘একজন নারী যখন উদ্যোক্তা হন, তখন তাঁর পুরো কমিউনিটিই বদলে যায়—শিশুরা বেশি দিন স্কুলে থাকে, পরিবার ভালো খায়, আর স্বপ্ন বড় হয়।’
২. নাফিরা আহমাদ, বাংলাদেশ
মাত্র ১৬ বছর বয়সে সামাজিক সংগঠন অ্যামপ্লিটিউড প্রতিষ্ঠা করেন নাফিরা আহমাদ। সামাজিক কুসংস্কার দূরীকরণে কাজ করা এই সংগঠন ইতিমধ্যে ৯৮ হাজারের বেশি মানুষের কাছে পৌঁছেছে। নাফিরা বলেন, তরুণ নারীদের নেতৃত্ব দিতে বিশ্বাস করতে হবে। নারীদের বারবার নিজেকে প্রমাণ করতে বলা—এই মানসিকতা বদলানো জরুরি।
৩. জারিন মাহমুদ হোসেন, বাংলাদেশ
চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্সির মতো পুরুষপ্রধান পেশায় নেতৃত্ব দিচ্ছেন জারিন মাহমুদ হোসেন। তাঁর মতে, প্রকৃত পরিবর্তন আসে তখনই, যখন নমনীয় কর্মপরিবেশ, নিরাপদ যাতায়াত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়। তিনি প্রতি সপ্তাহে একজন তরুণীর সঙ্গে সময় কাটান—অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করাই তাঁর ‘পে-ইট-ফরওয়ার্ড’ নীতি।
৪. ফারিয়া ইয়াসমিন, বাংলাদেশ
২৩ বছরের কর্পোরেট অভিজ্ঞতায় নেতৃত্বের নতুন সংজ্ঞা গড়েছেন ফারিয়া ইয়াসমিন। তিনি বাটা বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ফারিয়া ইয়াসমিন বলেন, নারীরা যেন সন্তান ও ক্যারিয়ারের মধ্যে বেছে নিতে বাধ্য না হন—এমন কাঠামো তৈরি করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
৫. সোনম পেম, ভুটান
ভুটানের দুর্গম অঞ্চলে কাজ করতে গিয়ে তিন দিনের হাঁটাপথ পাড়ি দিয়েছেন তারায়ানা ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সোনম পেম। একজন মা হয়েও পেশাগত দায়িত্ব পালনে তিনি পেয়েছেন পরিবার ও সহকর্মীদের দৃঢ় সমর্থন। তাঁর মতে, সহায়ক নেতৃত্ব ও পরিবারভিত্তিক সহায়তা ছাড়া নারীর অগ্রযাত্রা অসম্ভব।
৬. আশ্লেষা কার্কি, নেপাল
নেপালে পর্যটন খাতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন হোটেল মেচি ক্রাউনের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর আশ্লেষা কার্কি। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে পরিবার থেকে। পরিবার যখন নারীর নেতৃত্বে বিশ্বাস করে, তখন পৃথিবীর দরজা খুলে যায়।
৭. সোনিকা মানন্ধর, নেপাল
ফিনটেক ও প্রযুক্তি খাতে নারীর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে কাজ করছেন নেপালের সোনিকা মানন্ধর। তিনি অ্যালোই গ্লোবালের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিটিও। তাঁর ভাষায়, প্রতিভা সর্বত্র আছে, সুযোগ নয়। মেয়েদের ‘বাস্তববাদী’ হতে বলা বন্ধ করতে হবে।
৮. লোনালি রদ্রিগো, শ্রীলঙ্কা
শ্রীলঙ্কার ফ্যাশন ডিজাইনার লোনালি রদ্রিগো টেক্সটাইল বর্জ্য পুনর্ব্যবহার করে গড়ে তুলেছেন ‘হাউস অব লোনালি’। তাঁর মতে, তরুণ নারীদের নিজের পথ খুঁজে নিতে সহায়তা করাই সবচেয়ে বড় ক্ষমতায়ন।
এই গল্পগুলো একটি সত্যই তুলে ধরে—নীতিগত সহায়তা, নিরাপদ পরিবেশ, অর্থায়ন, শিক্ষা ও বিশ্বাস—এই সবকিছু একত্রে কাজ করলেই নারীর পথ পরিষ্কার হয়। আর যখন সেই পথ পরিষ্কার হয়, তখন নারী শুধু অংশগ্রহণই করেন না—তিনি নেতৃত্ব দেন, গতি বাড়ান এবং ভবিষ্যৎ বদলে দেন।